#
রাত তিনটে। আদিত্য ঘুমাচ্ছিল।
দরজা নকের শব্দে উঠে বসল।
দরজা খুলে দেখল ঝুমকি দাঁড়িয়ে আছে।
আদিত্য বলল, “কী হল?”
ঝুমকি বলল, “আমি ভেবে নিয়েছি। তোমার ফোনটা দেবে? যা যা হয়েছে, সেটা ফেসবুকে লিখব। কোথায় আছি সেটা বলব না। তাহলে তো আর কারও নিরাপত্তায় কোনও সমস্যা দেখা দেবে না?”
আদিত্য ঘুমচোখে ঝুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “কাল সকালে করিস।”
ঝুমকি বলল, “না, এখনই দাও। এখনই করব।”
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে দরজা ছেড়ে বলল, “টেবিলের ওপর আছে ফোনটা। পোস্ট করার আগে আমাকে দেখাবি।”
২৯
কাজ মিটিয়ে সুশোভনের পুলিশ কোয়ার্টারসে ফিরতে দেরি হয়ে গেছিল। ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দেড়টা।
ভোর সাড়ে চারটের দিকে ফোনের রিঙের শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। এরকম অভ্যাস আছে তাঁর। প্রায়শই এভাবে ঘুম ভেঙে যায়। অভ্যস্ত হাতে নম্বর না দেখেই ফোনটা কানে দিলেন তিনি, “হ্যালো।”
“কাজটা ভালো হল কি স্যার?”
গলাটা বুঝতে পারলেন না সুশোভন। অবাক গলায় বললেন, “কে বলছেন?”
“এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে হবে সাহেব? আমি ইজাজ মল্লিক বলছি। কাজটা কিন্তু আপনারা ভালো করলেন না। এর ফল ভালো হবে না।”
সুশোভন বললেন, “কোন কাজ? আমি কিছু জানি না।”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল, “যা বলেছেন। নেতা আর পুলিশের কাজই হল কিছু না জানা। যাই হোক, মেয়েটিকে দিয়ে ফেসবুকে বয়ান দেওয়ানো হয়েছে। ওকে নাকি রেপ আর জোর করে কনভার্ট করার চেষ্টা করানো হয়েছে। এই মিথ্যার উত্তর পাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে আপনাদের। চাকা জ্যাম করে দিলে সামলাতে পারবেন তো?”
সুশোভনের ঘুমটা ভেঙে গেল এবার পুরোপুরি। কড়া গলায় বললেন, “প্রথমত, মেয়েটি আমার কাস্টডিতে নেই। দ্বিতীয়ত, মেয়েটি যদি তার সঙ্গে যা ঘটেছে তার রিটেন কমপ্লেইন করে, তার ফলাফল যারা দোষী তাদের ভুগতেই হবে। আমি এই ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আর কোনও কথা বলতে রাজি নই।”
ইজাজ মল্লিক বলল, “তা তো জানি অফিসার, আপনাকে বলতেও হবে না। আপনার ভালোর জন্যই বলেছিলাম, ব্যাপারটা আমাদের লেভেলে মিটে গেলেই ভালো হত। এবার সামলাতে পারবেন কি না দেখুন বাউন্সারগুলো। সবকটা বাউন্সারই কিন্তু বুকের ওপর দিয়েই আসবে। পারবেন তো অফিসার?”
সুশোভন বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। লোকটা কিছুদিন আগেও পকেটমারি করে মার খেত। এখন বড়ো নেতা হয়ে গেছে। নেতা হওয়ার জন্য কোনওরকম পড়াশোনা লাগে না। কোয়ালিফিকেশন লাগে না। চিটিংবাজি, চুরিচামারি, খুন করতে জানতে পারলেও আজকাল নেতা হওয়া যায়।
তবে ইজাজ মল্লিকের গলার টোনটা তাঁর ভালো লাগল না। তিনি খাট থেকে নেমে খানিকটা পায়চারি করে আদিত্যকে ফোন করলেন। আদিত্যর ফোনটা একবার পুরো রিং হয়ে গেল। সুশোভন বুঝলেন আদিত্য ঘুমোচ্ছে। মোবাইলটা বন্ধ করতে যাবেন, এমন সময় দেখলেন আদিত্য কলব্যাক করছে। তিনি ফোন ধরতেই আদিত্য বলে উঠল, “খবরটা পেয়েছিস তবে?”
সুশোভন বললেন, “হ্যাঁ, রীতিমতো হুমকি আসা শুরু হয়েছে।”
আদিত্য বলল, “আজব! ঝুমকি তো এই জাস্ট কিছুক্ষণ আগে ফেসবুকে লিখল। এর মধ্যেই ওরা দেখে নিল? রাতে ঘুমায় না নাকি ওরা?”
সুশোভন বললেন, “যারা ক্রাইম করে, তারা কি অত সহজে রাত্তিরে ঘুমাতে পারে? আর ব্যাপারটা যেরকম স্পর্শকাতর হয়ে আছে, বুঝতেই পারছিস এত সহজে সব কিছু মিটে যাবে না। আচ্ছা, যেটা আমার জানার ছিল, মেয়েটা কি নিজে থেকেই ঠিক করল ঘটনাটা সোশ্যাল মিডিয়াতে দেবে বলে?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলল, ফোনটা দিতে। ছটফট করছে অ্যাকচুয়ালি। একটা পাপবোধ তো আছেই বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বলে, তার ওপর এভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনা আর মিডিয়াতে তার সম্পূর্ণ মিসইন্টারপ্রিটেশন নিতে পারছিল না আর কি। কাঁহাতক আর লুকিয়ে লুকিয়ে থাকবে বল তো!”
সুশোভন বললেন, “চাকা জ্যাম করার ভয় দিচ্ছে। সম্ভবত কালকের দিনটা আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না।”
আদিত্য বলল, “পুরো ব্যাপারটা হজম করে যাওয়াটাও তো কোনও কাজের কথা হবে না। তুই বললে আমি ঝুমকিকে দিয়ে স্ট্যাটাসটা সরিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে?”
সুশোভন বললেন, “না, সেটার দরকার নেই। এক কাজ করা যায়, স্ট্যাটাস দেওয়া মানে তো বয়ান দেওয়া। সেটা যে কারও কাস্টডিতে থেকেও দেওয়ানো যায়। তার থেকে ভালো হয় ঝুমকিকে বল সকালে ফেসবুক লাইভ করতে।”
আদিত্য বলল, “লাইভ করলে যদি লোকে বুঝে যায় ব্যাপারটা আমার বাড়ি থেকে হচ্ছে, তাহলে তো এখানেই হামলা হয়ে যাবে।”
সুশোভন একটু থমকে বললেন, “সেটা ঠিক। আচ্ছা, আপাতত স্ট্যাটাসটাই থাক। সেটার কী রিপার্কেশন হয় সেটা দেখে নি। তুই ঘুমিয়ে পড়। কাল দেখা যাবে যা হবে। গুড নাইট।”
আদিত্য “গুড নাইট” বলে ফোন রেখে দিল।
#
সুশোভন ফোন বন্ধ করে শুলেন। এপাশ ওপাশ করে ঘুম এল শেষরাতের (প্রথম ফোনের সময়ই ভোর সাড়ে চারটে বলা হয়েছে) দিকে। সকাল দশটা নাগাদ ফোন অন করে বাথরুমে গেছিলেন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন ফোন বেজে চলেছে।
দেখলেন অফিস থেকে ফোন আসছে, ধরলেন, “হ্যালো।”
“সুশোভন?”
সুশোভন গলাটা চিনলেন। ইন্সপেক্টর বিশ্বাস। বললেন, “হ্যাঁ, বলুন।”
