সুশোভন একটু চুপ করে বলল, “বসের সঙ্গে এই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়েই কথা হচ্ছিল। এই ব্যাপারটা যখন ওরা ওদের মতো করে ভাইরাল করছে, তখন ঝুমকিকে দিয়েও একটা পোস্ট করানো যেতে পারে যা যা ঘটেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে। সমস্যা হল, এর ফলে তোর শ্বশুরবাড়িতে হামলাটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে যাবে। আমার মতে এই মুহূর্তে, কোনওরকম ইম্পালসিভ ডিসিশন নিস না। ধরে খেল। পাবলিক নিয়ে ভাবিস না, আজ এই কেসটা নিয়ে মাতবে, কাল ফুটবল বা ক্রিকেট নিয়ে লাফাতে শুরু করবে, এই কেসের দিকে ফিরেও তাকাবে না। আপাতত তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আর তোর বাড়ি, এই দুটো ঠিকঠাক আমাদের নজরে থাকুক। বাকিটা নিয়ে ভাবিস না বেশি।”
আদিত্য বলল, “বেশ। আমার হয়েছে জ্বালা। বউ এখানে থাকলে সমস্যা হত না। সে গিয়ে বসে আছে বাপের বাড়ি। কী যে করি!”
সুশোভন খুক খুক করে হাসতে হাসতে বললেন, “দেখ কেমন লাগে। খুব তো বলতি চিরকুমার থাকবি। কেন বিয়ে করতে গেলি। এবার কেস খা।”
আদিত্য রেগে গেল, “ইয়ার্কি মারিস না। পারলে বাড়ি ফেরার সময় এ বাড়ি হয়ে যাস।”
সুশোভন বললেন, “ঠিক আছে। আমি ঠিক যাব। চাপ নিস না। নিশ্চিন্তে থাক।
২৮
বৃষ্টি থামেনি। ঝুমকি চা নিয়ে এসেছে।
আদিত্য অন্যমনস্কভাবে বসে ছিল। ঝুমকি কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, “এ নাও। দিদি কী বলছে?”
আদিত্য চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, “তুই এই মালটাকে জোটালি কী করে বল তো?”
ঝুমকির মুখটা নিমেষে কালো হয়ে গেল।
বলল, “আগে তো বলেছি। আর বলতে ভাল্লাগছে না বিশ্বাস করো।”
আদিত্য একটু ইতস্তত করে বলল, “তুই কনসিভ করিসনি তো? সেক্ষেত্রে তো আর-এক প্রবলেম হবে।”
ঝুমকি ফ্যাকাশে মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা কী করে বোঝে?”
আদিত্য কড়া চোখে কয়েক সেকেন্ড ঝুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “ধরে নিলাম ছেলেটা তোর সাথে ভালোভাবেই বিহেভ করত। তারপরেও তুই কোনও দিন এসব সম্পর্কে ভাবিসনি?”
ঝুমকি বলল, “ব্যাপারগুলো এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেছিল, আমি ভাবিওনি কোনও দিন। তা ছাড়া রিন্টু বরাবরই নরম স্বভাবের। কোনও দিন গায়ে হাতও দিত না সেভাবে…”
চুপ করে গেল ঝুমকি।
আদিত্য বিরক্ত মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলল, “তোকে এখানে রেখে দিলে ব্যাপারটা থিতিয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু তুই যদি কনসিভ করে থাকিস, সেক্ষেত্রে আর-এক ক্যাচাল দেখা দেবে। তুই রেপ চার্জ আনতে পারিস, সেক্ষেত্রে অনেক হ্যাপা পোহাতে হবে। তোদের কনজারভেটিভ বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে সেটা করতে পারবি? জীবনে আর বিয়েও না হতে পারে।”
ঝুমকি বলল, “কনজারভেটিভ বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে নিউজ চ্যানেল তো খবরটা দেখিয়েই দিল। পাড়ার সবাই চেনে আমাকে। চেনাজানা সবাই জেনে গেছে। আর কী হবে? কিন্তু যদি জানোয়ারটা শাস্তি পায়, তার থেকে ভালো আর কিছু হয় না।”
আদিত্য চায়ের কাপে চুমুক দিল, “শুনতে ভালো লাগবে, দোষী শাস্তি পাবে। কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক কতটা পথ পেরিয়ে একজন ধর্ষক শাস্তি পায়, সে সম্পর্কে তো সবাই জানে। নতুন করে বলার কিছু নেই। দেখ, এই মুহূর্তে দুটো রাস্তা খোলা আছে।”
ঝুমকি আদিত্যর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
আদিত্য বলল, “এক, যেটা জামান সাহেব বললেন। অ্যাগ্রেসিভ অ্যাটিচিউড নেওয়া। তোকে প্রকাশ্যে এসে প্রেস কনফারেন্স করে এফআইআর দায়ের করা। সেক্ষেত্রে তোর লাইফ থ্রেট আসতে পারে, তোকে দুশ্চরিত্রা বলে দাগিয়ে দেওয়া হতে পারে, আরও অনেক কিছুই হতে পারে।
দুই, একেবারে লুকিয়ে থাকা। বাড়ির লোকদের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে চেন্নাই বা গুজরাটে তোদের যারা আত্মীয়স্বজন আছে তাদের বাড়ি গিয়ে ওদিকে কোনও প্রবাসী বাঙালি ছেলেকে সব লুকিয়ে বিয়ে করা। এবার তুই ঠিক কর কী করবি।”
ঝুমকি মাথা নিচু করে বলল, “আমি একটা বোঝা হয়ে গেছি সবার কাছে, তাই না?”
আদিত্য বলল, “তুই বাচ্চা মেয়ে, বোঝা হয়েছিস নাকি সেটা আমি বলার কেউ না, কিন্তু একটা কথা তুইও বুঝিস, এখন সময়টা মোটেও ভালো না আমাদের জন্য। তোর বাবা রক্ষণশীল লোক। ওদিকে ছেলেটার বাড়ির লোক মোটেও সুবিধের না। সব সামলে চলা খুব কঠিন, খুব।”
ঝুমকি গোঁজ হয়ে থেকে বলল, “ও যদি আগে আমাকে বলত ও মুসলিম, তাহলে আমি ভেবে দেখতাম।”
আদিত্য বলল, “সেটা কোনও কথা না। হিন্দু মুসলিম বা অন্য যে-কোনো ধর্মে ভালোবাসা হতেই পারে। সমস্যাটা হল ইচ্ছা করে সেটা লুকিয়ে রাখায়। এভাবে লুকিয়ে রাখার অর্থ হল কোনও দুরভিসন্ধি ছিল। সে যে কী ছিল, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। যাই হোক, যদি কনসিভ করিস, কী করবি?”
ঝুমকি বলল, “ওর বাচ্চা আমি নেব না। মরে গেলেও নেব না। তোমার প্রেসে কেউ চেনা আছে?”
আদিত্য বলল, “না। সুশোভনের থাকতে পারে। কেন?”
ঝুমকি বলল, “আমি ব্যাপারটা নিয়ে লড়তে চাই। আমি যদি পিছিয়ে যাই, তাহলে নিজেকে কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না। তাতে যদি মরি তো মরব। এমনিতেই তো জীবনে যা হবার হয়েই গেল। এর থেকে মরে যাওয়াই তো ভালো।”
আদিত্য ঝুমকির দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “আজ রাতটা ভাব। কাল সকালে বলবি আমায়। তোর বাড়ির লোকের, আমাদের, সবার নিরাপত্তা জড়িয়ে আছে।”
ঝুমকি চুপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
