আদিত্য বলল, “প্রেসের কারও সঙ্গে কোনওরকম কথা বলার দরকার নেই। ওদের চাই ব্রেকিং নিউজ। কাউকে একটা ভিলেন খাড়া করে দিতে পারলেই হল। এই মুহূর্তে তোমাদের বাড়ি ভিলেন। মিডিয়ার ধারণা ঝুমকিকে তোমরাই লুকিয়ে রেখেছ।”
রুমকি কেঁদে ফেলল। আদিত্য বিরক্ত গলায় বলল, “সব কথায় যদি এভাবে কেঁদে ফ্যালো তাহলে তো কথা বলাই দায় হয়ে যায়।”
রুমকি কাঁদতে কাঁদতেই ঝাঁঝালো গলায় বলল, “তোমার আর কী! তোমার বোন তো পালায়নি! পালিয়েছে আমার বোন। আমরাই বুঝছি বাড়িতে কীসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। নিজে তো দিব্যি ঠিক সময়ে কেটে পড়লে।”
আদিত্য বলল, “শোনো, এই সময় যদি আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাও, তো করতেই পারো। তবে আমার মনে হয় না, এটা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করার খুব একটা ভালো সময়। কী করবে, তোমাদের বাড়িতে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে সেটা বলো।”
রুমকি বলল, “সিদ্ধান্তের কিছুই নেই। বাবা তো বলেই দিয়েছে ঝুমকি বাবার কাছে মরে গেছে। কোনওভাবেই বাকি জীবনটা বাবা আর ঝুমকিকে মেনে নিতে পারবে না।”
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ঠিক আছে।”
রুমকি বলল, “তোমার বন্ধুকে বলো পুলিশ দিয়ে মিডিয়া তাড়াতে।”
আদিত্য বলল, “সেটা বলা সম্ভব না। মিডিয়াকে পুলিশও ভয় পায়।”
রুমকি বলল, “সবকটা চ্যানেলে আমাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে বলছে যেন আমার বাবা বাঘ বা ভাল্লুক! পালানোর আগে আমরা জানতামও না ঝুমকি কার সঙ্গে পালিয়েছে, সে হিন্দু না মুসলিম। এখন কী হিসেবে বাবাকে ভিলেন করা হচ্ছে বলো তো?”
আদিত্য বলল, “দ্যাখো, মিডিয়া মানেই তাই। তিলকে তাল করা। এই মুহূর্তে টিভি না দেখে নিজেদের মধ্যে সময় কাটাও বরং।”
রুমকি ভেঙে পড়া গলায় বলল, “জানি না কী করব।”
আদিত্য উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল।
২৭
সুশোভনের উপরওয়ালা মিত্রসাহেব গম্ভীর মুখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। সুশোভনও কোনও কথা বলছিলেন না।
চুপ করে বসে ছিলেন।
খানিকক্ষণ পরে নীরবতা ভঙ্গ করে মিত্র বললেন, “ব্যাপারটা ছড়াচ্ছে সুশোভন। উপর থেকে ফোন এসে গেছে।”
সুশোভন বললেন, “কতটা উপর?”
মিত্র বললেন, “মাঝারি উপর। আরও উপরের ফোন যে-কোনো সময় আসতেই পারে। সেনসিটিভ কেস যখন।”
সুশোভন মিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “জামান সাহেব কেসটা পুরোটা জানেন স্যার।”
মিত্র বললেন, “জানি তো, সে তো আমিও জানি। সমস্যা সেখানে হবে না। সমস্যা বাধাবে মিডিয়া। ওদের কাজটাই তো তাই। তোমার বন্ধুর শ্বশুরবাড়িতে সিকিউরিটি দেওয়া নিয়েও ইস্যু তৈরি করে দিয়েছে।”
সুশোভন বললেন, “স্যার, প্রথমত ওঁরা কোনওরকম ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষ নন, দ্বিতীয়ত, ওঁদের বাড়িতে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমি আপনাকে জানিয়েই ব্যাপারটা করেছিলাম।”
মিত্র চিন্তিত মুখে মাথা নেড়ে বললেন, “মানবিকতার খাতিরে স্টেপটা নিতেই হত। কিন্তু সমস্যা হল, এক্ষেত্রে যখনই পলিটিক্যাল লোকজন ইনভলভ হবে, ব্যাপারটা একটু একটু করে উপরে যেতে যেতে একবারে উপরে চলে যাবে, তখন ঠিক কী হবে, সেটা নিয়েই আমার চিন্তা হচ্ছে। ওদের পাড়ার লোকেরা কী বলছে?”
সুশোভন বললেন, “ওদের ফরে আছে স্যার। কিন্তু যদি এই পার্টি, লরি ইত্যাদিতে আর্মস সহ লোক নিয়ে গিয়ে হামলা করে, তখন কী হবে, সেটা তো বলা যাচ্ছে না। শান্তিপ্রিয় লোকজন, অত দূর যে ব্যাপারটা গড়াতে পারে, সেসবের প্রিপারেশন ও পাড়ার লোকের থাকবে না।”
মিত্র খানিকটা চমকে গিয়ে বললেন, “করতেই পারে। ঝামেলা না করার কিছু নেই। এসব ব্যাপার অত্যন্ত সেনসিটিভ। শোনো সুশোভন, ওই এলাকার এক কিলোমিটার রেডিয়াসে টহলদারি বাড়িয়ে দাও। আমি ব্যাপারটা নিয়ে বেশ টেনশনে পড়লাম। কে জানে, কাল হয়তো এর জন্যই আমার মুন্ডু চাই বলে মিছিল বেরিয়ে গেল। সমস্যা হল, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া, মিডিয়া ইত্যাদিতে কোনওরকম যুক্তি প্রমাণ ছাড়াই মব জাস্টিস হয়ে যাচ্ছে। মানুষ নিজেরাই ঠিক করে নিচ্ছে কে ঠিক, আর কে ভুল। তিন-চারটে চ্যানেল থেকে ক্রমাগত আমাকে ফোন করে যাচ্ছে, আমি রেগেমেগে ফোন অফ করে দিয়েছি। তোমায় কেউ ফোন করেছিল?”
সুশোভন বললেন, “হ্যাঁ, মানালি করেছিলেন।”
মিত্র পেপারওয়েট হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, “ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াতে দেওয়া যাবে না। মেয়েটি, মানে তোমার বন্ধুর শালি, সেফ আছে তো?”
সুশোভন বললেন, “হ্যাঁ স্যার।”
মিত্র বললেন, “এই মুহূর্তে মেয়েটাকে জাস্টিস দেওয়া সম্ভব না হয়তো। কিন্তু সেফটি দেওয়াই যায়। তোমার বন্ধু, কী নাম বললে যেন…?”
সুশোভন বললেন, “আদিত্য, স্যার।”
মিত্র বললেন, “রাইট, আদিত্য। আদিত্যর সঙ্গে কন্টিনিউয়াস কন্ট্যাক্ট রেখে চলো। আর আমাকে আপডেট দিয়ে যেয়ো। যে-কোনো সময় উনি ফোন করতে পারেন, বুঝতেই পারছ।”
সুশোভন উঠলেন, “রাইট স্যার।”
মিত্র গম্ভীর মুখে বসে রইলেন।
মিত্রসাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে সুশোভন নিজের টেবিলে এসে বসলেন।
শহরে সন্ধে নেমেছে। যদিও কর্মব্যস্ততা বিন্দুমাত্র কমেনি তাঁর অফিসে।
মাথা ধরেছিল। সুশোভন চা আনালেন। বেশ সময় নিয়ে চা শেষ করছিলেন, দেখলেন আদিত্য ফোন করছে। ধরলেন তিনি, “বল। খানিক আগেই তো কথা হল। আবার কিছু হল নাকি?”
আদিত্য থমথমে গলায় বলল, “ফেসবুকে ঝুমকির ছবি দিয়ে একটা পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। ওর বাড়ির লোক ভিনধর্মে বিয়ে মানেনি বলে ঝুমকিকে লুকিয়ে রেখেছে। ব্যাপারটা তো পুরো উলটো ভাবে মানুষের কাছে পৌঁছোচ্ছে। আমরা কি কিছুই করতে পারি না?”
