মেহজাবিন বলল, “গোঁসা করে চলে গেছে। তার মা তো রোজ কাঁদে, বলে ভুল হয়ে গেল রে মেহজাবিন। আমার ছেলেটা রাগ করে চলে গেল।”
রুকসানা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “তা রাগবেই তো। এ মেয়ে যার হাতছাড়া হয় সে রাগবে না?”
মেহজাবিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ও কথা বলে লাভ নেই। বাদশাহের কাছে এসে পড়েছে, বাদশাহই এখন এ মেয়ের সুখ দুঃখের সব কিছু ঠিক করে দেবেন।”
রুকসানা মুখ বাঁকাল, “আর পরের হপ্তায় নতুন মেয়ে এলে আমাদের মতো একেও দূর করে দেবেন। আশায় আশায় বসে থাকতে হবে কখন আসবেন হুজুর।”
মেহজাবিন বলল, “তোর ঘরে আসেন না, এমন কথা বলিস না। বাদশাহ তোকে যথেষ্ট পছন্দ করেন।”
রুকসানা মাথা নাড়ল, “করেন। অস্বীকার করব না। কিন্তু প্রথম যখন এসেছিলাম, তখন যা করতেন, এখন কি তাই করেন?”
মেহজাবিন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় এক মেয়ে এসে দরজায় দাঁড়াল।
মেহজাবিন বলল, “কী হয়েছে?”
মেয়েটা উত্তর দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
মেহজাবিন রুকসানার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই এর চুলে ধূপটা দে, আমি আসছি।”
রুকসানা অবাক হয়ে বলল, “কে গো বিবিজান ও? হারেমে আগে দেখিনি তো।”
মেহজাবিন বলল, “আমি দেখেছি। তুই ওকে দেখ।”
মেহজাবিন পালঙ্ক থেকে নেমে বেরোল। রুকসানা সন্দেহের চোখে সেদিকে তাকিয়ে রাধার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “আহা, কী সুন্দর গোছ। ওহ, তুই তো আমার ভাষা বুঝবি না। তোর সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ নেই। বিবিজানকে বলতে হবে বাদশাহকে বলে তোর পুস্তু শেখার ব্যবস্থা করতে।”
রাধা কথা বলল না কোনও। একইরকম ভাবে বসে রইল।
মেহজাবিন ঘরটা থেকে বেরিয়ে চুপচাপ হাঁটতে থাকল। মেয়েটা মেহজাবিনের পিছু ছাড়ল না। নিজের ঘরে মেয়েটাকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে মেহজাবিন সতর্ক চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইজান?”
মেয়েটা মাথা উপর নিচ করল।
মেহজাবিন হাত পেতে বলল, “দে।”
মেয়েটা একটা ছোট্ট বাক্স মেহজাবিনের হাতে দিল।
মেহজাবিন ত্রস্ত হাতে বাক্সটা নিয়ে দরজা খুলে দিল।
মেয়েটা চারদিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।
মেহজাবিন দরজা বন্ধ করে বাক্সটা খুলল।
কামরান মির্জা পত্র পাঠিয়েছেন।
২৬
বিকেল হতেই বৃষ্টি নেমেছে। জানলাগুলো বন্ধ করতে হল।
ঝুমকি ড্রয়িং রুমের সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ব্যালকনিতে চেয়ারে বসে পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেট খাচ্ছিল আদিত্য। বাড়ির সামনেটা বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে।
অনেক দিন পরের বৃষ্টি। শহরের উত্তাপ বেড়ে যাচ্ছিল। সংবাদপত্র আর চ্যানেলগুলো বৃষ্টি কবে আসবে, বৃষ্টি কবে আসবে বলে হেদিয়ে মরছিল। বৃষ্টি এসে সবাইকেই স্বস্তি দিল বলা বাহুল্য। ফোন বাজছিল। আদিত্য দেখল বাবা ফোন করছেন।
ধরল সে, “হ্যাঁ বলো।”
“কি রে বিল্টু, ওদিকে খবর কী রে?” বাবার উৎকণ্ঠিত গলা ভেসে এল।
আদিত্য অবাক হল, “কী খবর বলো তো?”
বাবা বললেন, “আরে ঝুমকিকে মনে হল টিভিতে দেখলাম। কী হচ্ছে এসব?”
আদিত্য মাথায় হাত দিল। সর্বশক্তিমান গণমাধ্যমের যুগে কোনও কিছুই আজকাল আর ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়। আলোর গতিতে সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সব খবর।
সে বলল, “হুঁ, দেখেছি। ওটা ঝুমকিই।”
“কী সর্বনাশ! এসব কী ঘটছে? জানাসনি কেন?”
আদিত্য বলল, “আমি নিজেই ঠিক করে জানি না বাবা। খোঁজ নিয়ে জানাব।”
“বেয়াইমশাইকে ফোন করব নাকি?”
আঁতকে উঠল আদিত্য, “না না, সেসবের কোনও প্রয়োজন নেই। ফোন করতে যেয়ো না আবার। ওঁরা এমনিতেই প্রচুর চিন্তায় আছেন। তোমার যদি কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে আমাকে কোরো, আমি খোঁজ নিয়ে রাখবখন।”
আদিত্যর বাবা আশ্বস্ত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ জানাস। কী যে হচ্ছে কিছুই বলার নেই। তুই অফিসে?”
আদিত্য মিথ্যা করে বলল, “হ্যাঁ, অফিসে আছি। তোমায় পরে ফোন করছি বাবা।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। রাখ এখন। কাজ কর।”
বাবা ব্যস্ত হয়ে ফোন কেটে দিলেন। আদিত্য ফোন রেখে বিরক্ত মুখে বাইরের দিকে তাকাল। আজকাল দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আর-এক নাম মিডিয়া। খবর সম্পূর্ণভাবে না জেনে, নিজেদের মতো করে পরিবেশন করা এক জিনিস, সবথেকে বাজে ব্যাপার হল এরা এভাবে ঝুমকির মুখ দেখিয়ে দিল কী হিসেবে? একদিকের খবর পেয়ে অর্ধসত্য খবর পরিবেশন করাটা যে অপরাধ, সে বোধটুকু এদের নেই।
“চা খাবে?”
ঝুমকি কখন চলে এসেছে দেখেনি আদিত্য। বলল, “হ্যাঁ। কর। বাইরের দিকে আসিস না। আবার কে দেখে নেবে। তুই এখন ফেমাস হয়ে গেছিস।”
ঝুমকি বলল, “হুঁ। চা করছি।”
ভেতরের ঘরে গেল ঝুমকি। সিগারেটটা ফেলে আদিত্য নিচের রাস্তাটা দেখে নিল। বৃষ্টিপাতের ফলে শুনশান রাস্তা। সন্দেহজনক কাউকে দেখা গেল না। রিন্টুদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী বোঝাই যাচ্ছে। এরা শুধুমাত্র মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়েই ক্ষান্ত হয় না। তারপরের সমস্ত ফলাফলগুলো নিয়েও যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করেই এগোয়, সেটা রিন্টুর ফোন থেকেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আদিত্য রুমকিকে ফোন করল। রুমকি ধরল। বলল, “বলো।”
আদিত্য বলল, “বাড়িতে বাবা মাকে টিভি দেখিয়ো না। সমস্যা হতে পারে।”
রুমকি ধরা গলায় বলল, “টিভির পরোয়া করে যেন সব। গোটা পাড়ার লোক ভেঙে আসছে আমাদের বাড়িতে মজা দেখতে। টিভির খবর নিয়ে সেখানে রসালো আলোচনা হচ্ছে। বাড়ির বাইরে প্রেসের দুটো ভ্যান এসে দাঁড়িয়ে। বাবা একসময় রেগেমেগে বাইরে যাচ্ছিল। বহু কষ্টে আটকে রেখে দিতে পেরেছি। জানি না পারব নাকি।”
