বাদশাহ এসে রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মেহজাবিনকে বললেন, “ওর কি শরীর খুব খারাপ? হাকিমকে দেখানোর দরকার আছে?”
মেহজাবিন হাসল, “না হুজুর, এ তো সব মেয়েরই হয় প্রথমবারে।”
বাদশাহ রাধার দিকে তাকিয়ে মেহজাবিনকে বললেন, “আমি বৈরাম খাঁকে বলেছি বঙ্গদেশ থেকে কোনও দোভাষীকে নিয়ে আসতে। এ মেয়ে কী বলছে তা জানতে চাই।”
মেহজাবিন আর রুকসানা পরম বিস্ময়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
২৩
দোভাষী খুঁজতে বঙ্গদেশে লোক পাঠাতে হয়নি। পাওয়া গেছে রাজধানীতেই।
সমস্যা হল বাদশাহর হারেমে বাদশাহ ব্যতীত অন্য কোনও পুরুষের প্রবেশ নিষেধ। মেহজাবিন ভেবেছিল বাদশাহ ভুলে যাবেন কথাটা বলে।
বাস্তবে দেখা গেল বাদশাহ ভোলেননি।
উজিরদের সঙ্গে বৈঠকের শেষেই ডেকে পাঠালেন মেহজাবিনকে।
মেহজাবিন বাদশাহকে অভিবাদন করে দাঁড়াল।
বাদশাহ বললেন, “কী ব্যবস্থা হল মেয়েটির?”
মেহজাবিন বলল, “জনাব, একজনকে পাওয়া গেছে। সমস্যা হল সে পুরুষমানুষ।”
বাদশাহ বললেন, “তাতে কী হয়েছে? মেয়েটির সঙ্গে ওর দেখা করার ব্যবস্থা করা হোক। মেয়েটি কী চায় দ্যাখো।”
মেহজাবিন শিউরে উঠে বলল, “সে কী জনাব, অচেনা অজানা একটা লোককে শাহি হারেমে নিয়ে যাব?”
বাদশাহ বললেন, “অচেনা অজানা লোক হারেমে যেতে পারবে না তো কী হয়েছে, মেয়েটিকে তো হারেমের বাইরে আনাই যায়, তাই না? তুমি ব্যবস্থা করো, আমিও থাকতে চাই।”
মেহজাবিন বাদশাহকে সালাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারেমের দিকে যেতে যেতে মনে মনে বলল, “অনেক কপাল করে এসেছিলি মেয়ে, তোর কথা শুনতে চান স্বয়ং বাদশাহ। আমাদের কথা শোনার সময় নেই যাঁর, তোর কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছেন তিনি।”
রাধা রুকসানার খাটে ঘুমিয়ে ছিল। মেহজাবিন সেখানে উপস্থিত হয়ে রুকসানাকে বলল বাদশাহের কথাগুলো।
রুকসানা গালে হাত দিয়ে বলল, “সত্যি কী নসিব করে এসেছে এই মেয়ে। ইস, আমাদের ভাষা কেন বাদশাহের ভাষার থেকে আলাদা হল না?”
মেহজাবিন রাধাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তুলল। রাধা চমকে উঠে বসল। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।
মেহজাবিন রুকসানাকে বলল, “ওকে বুরখা পরিয়ে নিয়ে চল। আমাদের কথা কিছুই তো বুঝবে না। বেরোতে হবে, এটুকু বুঝিয়ে দে।”
রুকসানা রাধার মুখের দিকে তাকিয়ে মেহজাবিনকে বলল, “বাদশাহ ওর কথা শুনে কী বলবেন? এই মেয়ের বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কোনও চাহিদা থাকতে পারে? আমাদেরও তো বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু বাড়ির লোক কি কোনও দিনও আমাদের আর ফিরিয়ে নেবে?”
মেহজাবিন উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কোনও অযোগ্য পুরুষের ফাইফরমাশ খাটার থেকে বাদশাহের হারেমের মেয়েছেলে হওয়া অনেক ভালো। অন্তত এ দেশের বাদশাহ তো কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমার শরীর আদরে স্পর্শ করেছেন। তুই ওকে তৈরি কর রুকসানা। এসব বেফুজুল কথা এখন আর বলে লাভ নেই।”
মেহজাবিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
#
দুর্গের একটি কক্ষে পর্দা টাঙানো হয়েছে। মেহজাবিন, রাধা এসে বসেছে পর্দার একপাশে। অন্য পাশে অনুবাদককে নিয়ে আসা হয়েছে।
হিন্দু পণ্ডিত। মেহজাবিন পণ্ডিতকে বলল, “মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করুন ও কী চায়।”
পণ্ডিত গলা তুলল, “কী চান আপনি?”
রাধা অনেক দিন পরে নিজের ভাষা শুনে কেঁদে ফেলল। প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, “আমি মার কাছে যাব।”
পণ্ডিত মেহজাবিনকে বলল। মেহজাবিন হেসে বলল, “আমিও এরকমই কিছু একটা ভেবেছিলাম। এই কথা শোনার জন্য আপনাকে না আনলেই হত।”
পণ্ডিত বলল, “আমি কি তবে এবার যেতে পারি?”
মেহজাবিন বলল, “না। স্বয়ং বাদশাহ আসবেন। আপনি প্রতীক্ষা করুন।”
পণ্ডিত চমকে উঠল।
মেহজাবিন বলল, “আপনি ওকে জিজ্ঞেস করুন ওর বাড়ি কোথায় ছিল?”
পণ্ডিত জিজ্ঞেস করল।
রাধা বলল, “জানি না। আমার বাবা গ্রামের মন্দিরের পূজারী ছিলেন।”
পণ্ডিত এবার ঈষৎ চমকে উঠে রাধাকে বলল, “তুমি ব্রাহ্মণকন্যা?”
রাধা বলল, “হ্যাঁ। আমাকে এক সেনা বলপূর্বক নিয়ে এসেছিল…” বাকি সব কথা রাধা পণ্ডিতকে বর্ণনা করে গেল।
পণ্ডিত বলল, “অত্যন্ত গর্হিত কাজ হয়েছে তোমার সঙ্গে। কিন্তু আমরা চাইলেই তো কিছু করতে পারব না মা। এ দেশ এখন এরাই চালাচ্ছে। আমাদের কোনও কথাই এরা শুনতে চাইবে না।”
মেহজাবিন অধৈর্য হয়ে বলল, “কী কথা বলছেন নিজেদের মধ্যে?”
পণ্ডিত চমকে উঠে বলল, “সেরকম কিছুই না। মেয়েটির বাড়ি কোথায় জানার চেষ্টা করছিলাম।”
মেহজাবিন বলল, “এত কথা বলার অনুমতি তো আপনাকে দেওয়া হয়নি। যেটুকু জানার সেটুকু জানুন। সবথেকে ভালো কথা, আপনি এখন এক্কেবারে চুপ করে থাকুন। সম্রাট আসুন, তারপর যা কথা বলার উনিই বলবেন।”
পণ্ডিত আতঙ্কিত হয়ে বলল, “যা বলবেন।”
মেহজাবিন আর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাদশাহের আগমনধ্বনি শোনা গেল।
২৪
বিকেল হয়েছে।
আদিত্য দুপুরে ঘুমাবার চেষ্টা করছিল। ঘুম এল না। ড্রয়িং রুমে ঝুমকি টিভি দেখছিল।
আদিত্য এসে বসল। ঝুমকি সোফায় আধশোয়া হয়ে হিন্দি সিনেমা দেখছিল।
আদিত্যকে দেখে বলল, “তুমি কিছু দেখবে?”
আদিত্য বলল, “না, তুই দেখ না। আমার ঘুম এল না। মাথায় একগাদা চিন্তা আসছে শুধু।”
ঝুমকি বলল, “খুব সমস্যা করে দিলাম বলো?”
আদিত্য বলল, “সমস্যা না ঠিক। দেখ আমার তো অফিস আছে। এখানে তোকে কদিন গার্ড দেব? আর তোর দিদির বুদ্ধিশুদ্ধি কোনও কালে হবে না। আমি যখন আসতে বলছি, নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। সেটা বুঝবে না।”
