সুশোভন বললেন, “দেখুন স্যার, আমি আমার কর্তব্য করেছি মাত্র। এই মুহূর্তে আমি আর কোনও কথা বলতে পারছি না। ধন্যবাদ।”
ইজাজ কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে দিলেন সুশোভন। ঠান্ডা মাথায় ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করলেন তিনি। ব্যাপারটা খুব একটা সাধারণ জায়গায় থাকছে না। রাজনৈতিক রং নিচ্ছে। একটা ইস্যু হয়ে যাবে। ব্যাপারটা পুরোটাই বসকে জানানো দরকার। ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় দেখলেন ফোনটা আবার বেজে উঠল। মানালি, সাংবাদিক। সুশোভন একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে ধরলেন, “বলুন।”
“স্যার, একটু কথা বলা যাবে?”
“বলুন।”
“এইমাত্র আমাদের কাছে খবর এল পুলিশ নাকি এক মুসলিম ছেলে এবং এক হিন্দু মেয়ের সম্পর্কে হস্তক্ষেপ করেছে। মেয়েটি নিখোঁজ, ছেলেটি পাগলের মতো হয়ে গেছে। এবং এই কেসটা আপনিই হ্যান্ডেল করছেন, খবরটা একটু এক্সপ্লেন করবেন প্লিজ?”
সুশোভন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যা ভয় পেয়েছিলেন, তাই হতে চলেছে।
২২ ।।পূর্ব কথা।।
রাধা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল।
মেহজাবিনকে ডেকে আনল এক বাঁদি। মেহজাবিন বাঁদির দিকে তাকিয়ে বলল, “কতক্ষণ হল এরকম করছে?”
বাঁদি বলল, “কাল রাতে বাদশাহ যাবার পর থেকেই।”
মেহজাবিন রাধার বিছানা দেখল। বিছানায় চাপ চাপ রক্ত। সে বাঁদিকে ধমক দিল, “পরিষ্কার করিসনি কেন?”
বাঁদি কাঁচুমাচু মুখে বলল, “দেখিনি।”
মেহজাবিন বাঁদিকে জোরে চড় মারল। বাঁদি চড় খেয়ে তড়িঘড়ি রাধার বিছানা পরিষ্কার করতে শুরু করল।
মেহজাবিন রাধাকে জোর করে তুলল। অস্ফুটে বলল, “এ মেয়ে তো আমাদের ভাষা বুঝবে না।”
রাধাকে ইশারায় বোঝাল তার সঙ্গে যেতে। রাধা উত্তর দিল না। মেহজাবিন রাধাকে হারেমের জলাশয়ে নিয়ে গেল। অন্যান্য মেয়েরা সেখানে হাসাহাসি করতে করতে স্নান করছিল। মেহজাবিনকে সবাই ভয় পায়। দেখা মাত্র চুপ করে গেল। মেহজাবিন রাধাকে যত্ন করে স্নান করিয়ে, গা মুছিয়ে হারেমের একটা ঘরে নিয়ে গেল।
এক ষোড়শী মেয়ে শুয়ে ছিল। মেহজাবিন রাধাকে সে মেয়ের পালঙ্কে শুইয়ে দিয়ে বলল, “ওকে দেখিস তো রুকসানা। কাল…” ইশারায় বোঝাল বাদশাহ কী করেছেন রাধাকে।
রুকসানা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে রাধাকে জিজ্ঞেস করল, “নাম কী? কোথা থেকে এসেছিস?”
রাধা অবুঝ চোখে একবার রুকসানা, একবার মেহজাবিনের দিকে তাকাল।
মেহজাবিন রুকসানাকে বলল, “অন্য মুলুক থেকে এসেছে রে। আমাদের ভাষা বোঝে না।”
রুকসানা কোনও কারণ ছাড়াই হি হি করে হাসল।
মেহজাবিন বলল, “আমি যাই, তুই একে দেখে রাখ। অন্য কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখ। প্রথম বার তো, এরপরে তো সেই আবার আমাদের মতো হাপিত্যেশ করে বাদশাহের জন্য বসে থাকবে।”
মেহজাবিন হাসল, রুকসানাও। রুকসানা বলল, “আচ্ছা, তুমি যাও। আমি ওর সঙ্গে আলাপ করি।”
মেহজাবিন বলল, “খাইয়ে দিস পারলে। হুজুরের যদি ওকে পছন্দ হয়ে থাকে তবে আবার আসবেন হয়তো।”
রুকসানা ছদ্ম শ্বাস ফেলে বলল, “অত সৌভাগ্য কি আর সবার হয়?”
মেহজাবিন বলল, “হতেই পারে। যে মেয়ের রহস্য যত বেশি, পুরুষমানুষ তত বেশি তার কাছে আসে। এ মেয়ের ভাষা তো বাদশাহ বোঝেননি, তাই এই মেয়ের আকর্ষণ বেশি হবে।”
রুকসানা বলল, “ঠিকই বলেছ। আমরাও সেরকম অভিনয় করতে পারলে ভালো হত বলো?”
রুকসানা আর মেহজাবিন খিলখিল করে হেসে উঠল।
মেহজাবিন বলল, “দেখিস একে। আমি যাই।”
মেহজাবিন চলে গেল।
রাধার গলায় একটা ঝকঝকে মুক্তোর মালা। রুকসানা সেটায় হাত বুলিয়ে বলল, “মাশাল্লাহ। বাদশাহ দিয়েছেন? আমাকেও দিয়েছিলেন প্রথমবার।”
রাধার তলপেটে ব্যথা করছিল।
গতকালের কথা সে আর মনে করতে চাইছিল না।
রুকসানা ইশারায় রাধার তলপেটের দিকে হাত দিয়ে বোঝাল তারও ব্যথা হয়েছিল প্রথমবারে।
রাধা তাকিয়ে রইল রুকসানার দিকে।
রুকসানা রুপোর পাত্রে জল এনে দিল। রাধার শরীর কাঁপছিল। কোনওমতে খানিকটা জল খেতে পারল।
রুকসানা রাধাকে শুইয়ে দিল আবার। ফিসফিস করে বলল, “তোর মতো আমারও হয়েছিল রে। এভাবেই।”
রাধা রুকসানার ভাষা না বুঝলেও বুঝতে পারল রুকসানা কী বলতে চাইছে।
সে ফুঁপিয়ে উঠল, “মার কাছে যাব।”
রুকসানা রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল পরম মমতায়।
রাধার দু চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে এল।
রুকসানা বলল, “আম্মির কথা মনে পড়ছে? আমার তো গোটা পরিবারকেই মেরে দিয়েছিল বাবর শাহের সেনা। এখানে যখন নিয়ে এসেছিল ওরা, আমিও তোর মতোই ছিলাম। কিছু বুঝতাম না। বাদশাহ হুমায়ুন কত আদর করলেন আমায়। তারপর সে কী ব্যথা! তোর তো আমি আছি। আমার কেউ ছিল না।”
রাধা কাঁদতে লাগল।
রুকসানা উঠে একটা বাক্স নিয়ে এল। বাক্সটা খুলে বেশ কয়েকটা গয়না বের করে রাধাকে দেখিয়ে ইশারায় বলল, “বাদশাহ দিয়েছেন। উনি খুশি হলে আমরা খুশি। বুঝেছিস?”
রাধা উঠে বসল কোনওভাবে।
মেহজাবিন প্রায় দৌড়ে রুকসানার ঘরে ঢুকল, “বাদশাহ স্বয়ং আসছেন এই মেয়েকে দেখার জন্য।”
রুকসানা অবাক হয়ে রাধার দিকে তাকিয়ে বলল, “মাশাল্লাহ! হুজুরকে কী জাদু করেছিস রে মেয়ে?”
বাদশাহ এলে হারেমে হইহই রব পড়ে যায়। বাদশাহ ব্যতীত অন্য কোনও পুরুষের হারেমে প্রবেশ নিষেধ।
বাদশাহ হুমায়ুন সরাসরি রুকসানার ঘরে প্রবেশ করলেন। মেহজাবিন আর রুকসানা বাদশাহকে সেলাম করে মাথা নিচু করল। রাধা শুয়ে ছিল।
