আদিত্য বলল, “আগে খেয়ে নে। সকাল থেকে তো কিছুই খাসনি মনে হয়।”
ঝুমকি বলল, “বিস্কুট খেয়েছি। আচ্ছা খেয়ে নি। আর শুনতেও ইচ্ছা করছে না আমার।”
আদিত্য টেবিলে বসল। ঝুমকিই খাবার ভাগ করে দিল।
টিভি চালাল আদিত্য। কোথায় একটা ঝামেলা লেগেছে। র্যাফ নেমেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। চারদিকে ঝামেলা শুধু।
ঝুমকি কিছুটা খেয়ে বলল, “আমি আর পারছি না। খেতে ইচ্ছা করছে না।”
আদিত্য ধমকাল, “চুপচাপ খেয়ে নে। কষ্ট হলেও খা। খালি পেটে থাকবি না। তোর দিদিকে তো আনার চেষ্টা করলাম, বুঝে উঠতেই পারল না কেন আসতে বলছি। এল না।”
ঝুমকি বলল, “আমি কী করব? ফিরে যাব ও বাড়ি?”
আদিত্য বলল, “কোন বাড়ি? খিদিরপুর?”
ঝুমকি বলল, “না না, আমাদের বাড়ি।”
আদিত্য খেতে খেতে বলল, “আমাদের এই যে সমাজ না কী একটা জিনিস আছে না, এখানে একটা কথা বারবার বলা হয়। বিয়ে হয়ে যাবার পর মেয়েদের নাকি শ্বশুরবাড়িটাই আসল। একটা মেয়ের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ না করা এই সমাজ শ্বশুরবাড়িটাকেই তার নিজের বাড়ি বানিয়ে দেয়। তোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অবশ্য অন্য। তোর শ্বশুরবাড়ি তুই নিজেই পছন্দ করেছিলি। কিন্তু তাদের স্বরূপটা বোঝার চেষ্টা করিসনি। যখন জানতে পেরেছিস, তৎক্ষণাৎ পালিয়ে এসেছিস। এবারে তোর রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ বাবা তোকে ফিরিয়ে নেবেন কি না, বা তাঁর বাড়িটাকে তোর বাড়ি বলে আর স্বীকৃতি দেবেন কি না, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। আমি অনেক বিয়েই দেখেছি, মেয়ের সিঁদুর ধুইয়ে, শাঁখা ভেঙে বাবা অন্য জায়গায় পাচার করে দিয়েছে, বিয়ে মানেনি। কিন্তু তোর বাবা কী করবেন সে সম্পর্কে আমি একেবারেই অন্ধকারে।”
ঝুমকি বলল, “জানি। এ সব কিছুর জন্য আমি দায়ী। তিন দিন পিছিয়ে দেওয়া যেত যদি সময়টা, কী ভালোই না হত বলো?”
আদিত্য হাসল। ফোনটা পকেট থেকে বের করে রিন্টুর রেকর্ডেড কথাগুলো শোনাল। ঝুমকি সবটা মন দিয়ে শুনে বলল, “আমি এখনও ওকে মেলাতে পারছি না।”
আদিত্য বলল, “স্বাভাবিক। দুনিয়ায় যত মানুষের মুখ আর মুখোশ আলাদা, দুনিয়াটা তত জটিল। এই ছেলেটার মুখোশ আর মুখ দুটোই তুই দেখেছিস। কনভার্শন বা একটা ধর্ম চেঞ্জ করলেই কি সব হয়ে গেল? সব কিছু কি এতই সোজা?”
ঝুমকি বলল, “আমার আর ভাল্লাগছে না কিছু। কী করব তুমিই বলো।”
আদিত্য বলল, “এখানে থাক। দেখা যাক কী করা যায়।”
২১
সুশোভন যখন তার অফিসে ঢুকলেন, তখন বিকেল চারটে। আদিত্যর শ্বশুরবাড়িতে দুজন কনস্টেবল মোতায়েন করতে উপরমহল থেকে অনুমতি নিতে হয়েছে।
ডিউটির প্রতিটা দিনই আজকাল ঘটনাবহুল হয়। নিজের মানবিক সত্তাটাও কর্তব্যের খাতিরে হারিয়ে যেতে বসে। মাঝে মাঝে সুশোভনকে আবার সব কিছু নতুন করে ভাবতে হয়। পুলিশের চাকরির মতো ভয়াবহ চাকরি বোধহয় আর কিছু হয় না। হয় সব কিছু মেনে নিতে হবে, নয়তো একেবারে বিদ্রোহী হতে হবে। সব নৌকায় পা দিয়ে পুলিশের চাকরি করার জন্য এলেম থাকা দরকার, যেটা সবার থাকে না।
বেশ কয়েকটা কেস ফাইল টেবিলে এসেছিল ডাক ফাইলে, সুশোভন একটা করে ফাইল ছাড়ছিলেন, এমন সময় তাঁর মোবাইলটা বেজে উঠল।
সুশোভন নম্বরটা চিনতে পারলেন না, তবু ধরলেন, “হ্যালো।”
“আমি ইজাজ মল্লিক বলছি অফিসার। চিনতে পারছেন তো?”
কথাটা ভেসে আসতে একটু থমকে গেলেন সুশোভন। ইজাজ মল্লিক? তাঁকে ফোন করছে? কেন? তিনি খানিকটা সতর্ক গলাতেই বললেন, “পারছি। বলুন।”
“একটা মিসিং ডায়েরি করাতে হবে, বুঝলেন অফিসার। আমার এক ভাইপোর বউ গতকাল রাত থেকে মিসিং হয়েছে। আপনি এই ব্যাপারে কোনওরকম সাহায্য করতে পারবেন?”
সুশোভন অবাক গলায় বললেন, “নিশ্চয়ই পারব, তবে আপনাকে লোকাল থানায় এফআইআর করতে হবে, আপনি আমাকে ফোন করলেন কেন, বুঝতে পারলাম না তো!”
ইজাজ মল্লিক হেসে নিয়ে বলল, “আসলে ব্যাপারটা আপনিই হ্যান্ডেল করছেন শুনলাম। কাল আমার ভাইয়ের বাড়িতেও গেছিলেন খিদিরপুরে। তো আপনিই যখন দেখছেন, তখন আপনাকে ফোন করাটাই তো সমীচীন হবে, তাই না অফিসার?”
সুশোভন এবার বুঝলেন। একটু চুপ করে থেকে বললেন, “বুঝেছি। মেয়েটা মিসিং হয়েছে ধানবাদ থেকে। আপনারা ওখানে এফআইআর করার ব্যবস্থা করুন।”
“ধুস! কী যে বলেন! আমার কথা ধানবাদে কেউ শুনবে নাকি অফিসার? আমি কি ধানবাদের নেতা বলুন তো? আমি তো এখানকার নেতা। যে যেখানকার নেতা, সে তো সেখানেই ব্যবস্থা নেবে নাকি? শুনুন না, আপনি বরং এখান থেকেই ধানবাদে যোগাযোগ করে দেখুন। বাচ্চা মেয়ে, কোথায় হারিয়ে যাবে, কী থেকে কী হয়ে যাবে, কে দায়িত্ব নেবে বলুন তো?”
শেষের কথাগুলো অনেকটা হুমকির মতো শোনাল।
সুশোভন বললেন, “আপনাকে আমি বলেছি স্যার, আপনি ধানবাদ থানায় ডায়েরির ব্যবস্থা করুন। আমি এখন অন্য কাজে ব্যস্ত আছি। এ ব্যাপারে আপনাকে কোনওরকম সাহায্য করতে পারব না।”
“হা হা হা হা” ওপাশ থেকে জোরে হাসির শব্দ ভেসে এল, “আপনি কাকে কী বলছেন বুঝতে পারছেন তো?”
সুশোভন বললেন, “আমি বাজে কোনও কথা বলেছি বলে মনে তো হয় না।”
ইজাজ বললেন, “মেয়েটার বাড়িতে ভেড়ুয়া পুলিশ বসিয়েছেন কেন? কী ভাবছেন, ওই দুজন সব কিছু সামলে নিতে পারবে? আপনি জানেন ওদের ক্ষমতা? কিংবা ধরুন, ছেলেটা মেয়েটার দুঃখে, অপমানে সুইসাইড করে বসল, তখন কী করবেন বলুন তো? কিছু করার থাকবে? মোমবাতি মিছিলগুলো সব তো আপনার লাশ চাইবে অফিসার। পালিয়ে কোথায় যাবেন তখন?”
