বিকাশ উদগ্রীব গলায় বললেন, “ওরা আবার কনভার্ট করে বেচে দেয় জানো তো?”
আদিত্যর মুখে খিস্তি আসছিল। অনেক কষ্টে সেটা আটকে সে বলল, “আমরা তো এখনও কিছু জানি না। কিছু না জেনে বলাটা কি ঠিক হচ্ছে?”
তপন বললেন, “কিছু না জানলেও, যেসব ছেলেরা এ বাড়িতে এসেছিল, তাদের দেখে খানিকটা আন্দাজ করাই যায় আমার মেয়ে কোন বাড়িতে গেছে। লাথখোর, লুম্পেন টাইপ ছেলে একেবারে সবকটা। আর চোখ কী তাদের, বাপরে…।”
রুমকির মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপ করে। বোঝা যাচ্ছে ভয় পেয়েছেন। বিকাশ বললেন, “আমি পাড়ার ছেলেদের খবর দিয়েছি। পুলিশ কী করবে সেটা তো বুঝে উঠতে পারছি না, আপাতত পাড়ার লোকেরা একটু দেখুক।”
তপন মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ছি ছি ছি ছি। এত নিষ্ঠাসহকারে পুজো করি আমি, জ্ঞানত কোনও দিন কারও কোনও ক্ষতি করিনি, সেই আমার মেয়েই কিনা এত বড়ো… ভাবতেই পারছি না।”
রুমকি আদিত্যর দিকে তাকাল, “সুশোভনরা কোনওরকম কিছু জানতে পারল?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, ঝুমকিকে ওরা ধানবাদে নিয়ে গেছিল। ঝুমকি সম্ভবত জানত না ছেলেটা অন্য ধর্মের, ও ওখান থেকে পালাতে পেরেছে। এটুকু জানা গেছে।”
তপন বিকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলে? জানত না নাকি। যদি নিজের জাত ধর্মেরই হত, তাহলেই বা পালিয়ে তুই কী রাজকাজটি করতি? এদের প্রতিপালনেই সমস্যা ছিল আমার। আমারই ব্যর্থতা।” তপন দৃশ্যতই ভেঙে পড়লেন।
বিকাশ বললেন, “এই যে ছেলেগুলো এসেছিল, সব কোন ভাষায় কথা বলছিল?”
তপন বললেন, “উর্দু বা হিন্দু কিছু একটা হবে। একেবারেই অবাঙালি টানে কথা বলল।”
বিকাশ বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললেন, “হুঁ, বুঝেছি, এইসব ছেলেছোকরাই ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে। নিজেদের জায়গায় যতরকম ক্রাইম করে বেড়াবে। বলার কেউ নেই তো। গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা পয়দা করে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা আর হিন্দু ঘরের মেয়ে বিয়ে করা ছাড়া এদের কোনও কাজ নেই। নেহাত আমি ছিলাম না তাই, থাকলে দেখিয়ে দিতাম…”
আদিত্য আড়চোখে বিকাশের দিকে তাকাল। সামান্য হাওয়া দিলে উড়ে যাওয়া চেহারা। অতি কষ্টে হাসি চাপল সে।
কলিং বেল বাজল। রুমকি খানিকটা শিউরে উঠল। আদিত্য উঠে বলল, “আমি দেখছি।”
রুমকি বলল, “দাঁড়াও আগে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখে নি।”
বাইরের জানলা দিয়ে রাস্তা দেখে আশ্বস্ত হয়ে রুমকি দরজা খুলল। পাড়ার কয়েকজন লোক এসেছে। বোঝা যাচ্ছে ঘটনাটা পাড়ায় উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। আদিত্য রুমকিকে বলল, “তুমি একটু ভেতরের ঘরে এসো, কথা আছে।”
রুমকি বলল, “কী কথা?”
আদিত্য বলল, “চলো, বলছি।”
রুমকি আর আদিত্য ভেতরের ঘরে গেল। বাইরের ঘর থেকে উত্তেজিত লোকজনের কথোপকথন ভেসে আসছে। সবথেকে বেশি আসছে বিকাশের গলার স্বর।
রুমকি ঘরে ঢুকলে আদিত্য আড়চোখে একবার বাইরেটা দেখে নিয়ে বলল, “শোনো, এখানে তো যা হবার হয়ে গেছে, আমার অফিস যাওয়া হচ্ছে না, তুমি আপাতত আমার সঙ্গে চলো।”
রুমকি তার দিকে ভস্ম করে দেওয়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “মানে? তুমি চাইছ এই পরিস্থিতিতে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাই?”
আদিত্য বলল, “সেটা তো বলিনি, তুমি এসো, কিন্তু আমিও তো ওদিকে একা আছি। সমস্যা হচ্ছে…” আদিত্য বলতে পারছিল না ঝুমকি তাদের ফ্ল্যাটে এসেছে। জানলেই হয়তো রুমকি চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করবে।
রুমকি জোরে জোরে মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলল, “কখনও না। বাবা-মাকে এই অবস্থায় ফেলে আমি কোথাও যাব না। বরং তুমিও এখন এই বাড়ি থেকেই অফিস যাতায়াত করো।”
আদিত্য বলল, “সম্ভব না। নর্থের জ্যাম ঠেলে অফিস পৌঁছোতে হলে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।”
রুমকি রেগে গিয়ে বলল, “তা তো বলবেই। শুধু সব কিছু থেকে পালিয়ে পালিয়েই গেলে। যাও, যেখানে ইচ্ছে যাও, আমাদের দিকে তোমার না দেখলেও হবে। আর শুনে রাখো, যতদিন না ঝুমকি বাড়ি ফিরছে, আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
২০
সুশোভন দুজন কনস্টেবল পাঠিয়ে দিলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। আদিত্য আর বসল না। রুমকির থমথমে মুখের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
শ্বশুরবাড়িতে মেলা বসে গেছে এখন। বিভিন্ন লোক এসে মতামত দিয়ে যাচ্ছে। আদিত্যর বিরক্ত লাগছিল থাকতে। শাশুড়ি খেয়ে যেতে বললেও সে থাকল না। এত ঘেন্না সে আর নিতে পারছিল না। অসুস্থ লাগছিল।
চারদিকটা কীভাবে যেন ধর্ম ধর্ম করে খেপে উঠেছে। এই মানুষগুলোকে সে নতুন করে চিনছে। ধর্ম সম্পর্কে এত সজাগ কলকাতার মানুষ কি আগে কোনও কালে ছিল? মনে করতে পারল না সে।
বেশ খানিকটা রাস্তা যাবার পর তার ঝুমকির কথা মনে পড়ল। একটা রেস্তোরাঁয় গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন প্যাক করে নিল। দরজায় যখন বেল বাজাল তখন দুপুর হয়েছে। ঝুমকি বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে দরজা খুলল। চোখ মুখ ফোলা। আদিত্য বলল, “ঘুমাচ্ছিলি?”
ঝুমকি বলল, “হ্যাঁ, খুব টায়ার্ড লাগছিল। ও বাড়ির কী খবর?”
আদিত্য হাতের প্যাকেট ঝুমকির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভাগ কর। আমিও খেয়ে নি। ও বাড়ির খবর আর কী, পুলিশ মোতায়েন হয়েছে। আর তোর রোমিও আমাকে ফোন করেছিল তো!”
ঝুমকি অবাক হয়ে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “মানে? কখন?”
