ঝুমকি নিঃশব্দে কাঁদতে থাকল।
আদিত্য আর দাঁড়াল না। স্নান, বাথরুম সব সেরে বাড়ি থেকে বেরোল। ঝুমকিকে বলল, “আমার নাম্বার ল্যান্ডলাইনের পাশের ডায়েরিতে আছে। কোনও সমস্যা হলে ফোন করবি। তোর যত চিন্তাই হোক বাড়িতে এখন ফোন করবি না, বুঝেছিস?”
ঝুমকি মাথা নাড়ল, “বুঝেছি।”
১৮
আদিত্য গাড়ি চালাচ্ছিল।
রুবি পেরোতে ফোনটা বাজতে শুরু করল। আদিত্য বিরক্ত হল। এমনিতেই কাঁচা হাত, গাড়ি চালানোর সময় খুব অ্যালার্ট থাকতে হয়।
রুবির মোড় পেরিয়ে খানিকটা এগিয়ে গাড়িটা বাঁদিকে দাঁড় করাল সে। আননোন নাম্বার। কল ব্যাক করল সে। ওপাশে একটা রিং হতেই ধরল, “হ্যালো।”
আদিত্য বলল, “কে বলছেন?”
“দাদা ভালো আছেন?”
আদিত্য গলাটা চিনল না। অবাক গলায় বলল, “কে বলছেন?”
“আমি রিন্টু বলছি দাদা। ওই কী যেন বলে না, ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, আপনার ভায়রা ভাই।”
আদিত্য থমকাল। বলল, “আপনি আমার নাম্বার পেলেন কোত্থেকে?”
“কী যে বলেন দাদা, ঝুমকির মোবাইল থেকেই পেয়েছিলাম। আপনাদের সবার নাম্বারই আমার কাছে আছে।”
আদিত্য বলল, “ওহ, বেশ তো। তা আমাকে ফোন করলেন কেন?”
রিন্টু বলল, “অ্যাকচুয়ালি একটা বিপদে পড়ে আপনাকে ফোন করেছি দাদা।”
“কী বিপদ?”
“জানেন তো, ঝুমকির সঙ্গে আমার বেশ কিছুদিন ধরেই অ্যাফেয়ার চলছিল। আমি কিছু বলিনি জানেন তো, ও-ই ইনসিস্ট করত আমার সঙ্গে পালাবে বলে। ওর বাড়ি থেকে নাকি মানবে না। আমি ওকে বোঝাতাম যে দ্যাখো এগুলো ভাবা উচিত না, কিন্তু ও কিছুতেই মানতে চাইত না বুঝলেন তো দাদা। তারপর তো জানেনই কী ঘটে গেল।”
আদিত্য অবাক হল, ছেলেটার ভাষা অত্যন্ত মার্জিত।
সে বলল, “আচ্ছা, তো তারপর?”
“তারপর তো দাদা সবাই জানে। ঝুমকি পালিয়ে গেল। ও দেখল আমরা মুসলমান, মানতে পারল না। কিন্তু আপনিই বলুন দাদা, আজকালকার দিনে এসব কেউ দ্যাখে?”
আদিত্য বুঝল ঝুমকি যে তার ফ্ল্যাটে আছে সেটা রিন্টু জানে না। সে বলল, “আচ্ছা, আমি তো অতটা ওদের ব্যাপারে ঢুকি না, আমি দেখি কী হয়েছে, তারপর নাহয় আপনাকে ফোন করি?”
রিন্টু বলল, “শুনুন না, শুনুন না দাদা।”
আদিত্য বলল, “বলুন।”
রিন্টু বলল, “দেখুন দাদা, আমি ঝুমকিকে খুব ভালোবাসি। কথা দিচ্ছি বাকি জীবনে ওকে কোনওরকম কষ্ট দেব না। আপনি একটু দেখুন না, যদি সব কিছু ঠিকঠাক করে দিতে পারেন।”
আদিত্য বলল, “দেখুন ভাই, এটা তো আমার শ্বশুরবাড়ির ব্যাপার, এসব ব্যাপারে আমি খুব কম ঢুকি। যদি আমার কোনও ওপিনিয়ন নেয়, তখন নাহয় আমি দেখব, কেমন? এখন আমি শ্বশুরবাড়িই যাচ্ছিলাম, কোথাকার কিছু লাথখোর ছেলে নাকি ওদের বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেছে, আমার বন্ধু তো লালবাজারে আছে, দেখি যদি কিছু করা যায় নাকি।”
আদিত্যকে অবাক করে রিন্টু চেঁচিয়ে উঠল, “এই শুয়োরের বাচ্চা, মাদারচোদ, লাথখোর কাকে বলছিস বে? আমার ভাই হয় ওরা! খোঁজ নিতে গেছিল।”
আদিত্য হেসে ফেলল, “এই তো ভাই, আপনার আসল রূপ বেরিয়ে পড়ল। শুয়োরের খোঁয়াড়ে থাকা শুয়োরকে লাঠির বাড়ি মারলে তার যে আসল রূপ বেরোবে এ তো জানাই ছিল।”
রিন্টুর গলার নিমেষে পরিবর্তন হল, “সরি সরি দাদা, আমার মাথার ঠিক নেই তো, হঠাৎ এক্সাইটমেন্ট চলে এসেছিল। আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না দাদা।”
আদিত্য বলল, “আমি কিছু মনে করিনি, তবে আপনি যেটা করেছেন, সেটা ঠিক করেননি। আপনি ঝুমকিকে বলেননি আপনি অন্য ধর্মের মানুষ, তাই না?”
রিন্টু বলল, “সেটা আপনি কী করে জানলেন?”
আদিত্য সতর্ক হল, বলল, “অনুমান করাই যায়। আপনার কথা শুনে সেরকমই মনে হয়েছে আমার।”
রিন্টু বলল, “ধর্মটা কি ম্যাটার করে আজকাল? আপনিই বলুন?”
আদিত্য বলল, “ম্যাটার করে না। সত্যিই করে না। ধর্ম একটা ইউজলেস ব্যাপার। কিন্তু জোরজারি করে কিছু করাটাও ক্রিমিনাল অফেন্সের আন্ডারে পড়ে, এটা বোধহয় আপনি বা আপনারা জানেন না। শুনুন, ঝুমকি আমার বোনের মতো, ওর কোনও ক্ষতি হোক আমরা চাইব না। আমরা থানায় মিসিং ডায়েরি করছি, ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে, আপনি বরং এর ফলাফলের জন্য প্রস্তুত থাকুন। পুলিশকে সাহায্য করুন, দেখা যাক কী হয়।”
রিন্টু কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ফোনটা কেটে দিল।
১৯
কাঁদো কাঁদো মুখে রুমকি দরজা খুলল। আদিত্য ঘরে ঢুকে দেখল বিকাশ বসে আছেন। মুখটা বিরক্তিতে একটু কুঁচকেই ঠিক করে নিল সে। রুমকি এরকম মুখ দেখলে অশান্তি করে।
বিকাশ তাকে দেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “দেখলে বাবাজীবন? সেকুলার হওয়ার সমস্যা? যাদের ভয়ে বর্ডার পেরিয়ে এসেছিলাম, তারা শুধু মেয়েই তুলে নিয়ে যাচ্ছে না, সঙ্গে বাড়ি বয়ে এসে হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে।”
আদিত্য সোফায় বসে শ্বশুরের দিকে তাকাল। তপন খানিকটা ভেবলে গেছেন বোঝা যাচ্ছে। সামনের টেবিলে জলের বোতল রাখা। আদিত্য বোতল থেকে খানিকটা জল খেয়ে বলল, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সুশোভন ব্যবস্থা করছে বলেছে।”
রুমকি বলল, “ঝুমকির কী হবে? ও পালিয়ে কোথায় গেছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে…”
রুমকি কথা শেষ করতে পারল না। মুখে আঁচল দিল।
তপন বিরক্ত গলায় বললেন, “বাচ্চার কিছু নেই তো। পালিয়ে বিয়ে যখন করতে পেরেছে তখনই বড়ো হয়ে গেছে। এসব ফালতু কথা বলিস না।”
