হুমায়ুন বললেন, “বেশ। আর কিছু বলার আছে? না থাকলে আপনি যেতে পারেন।”
বৈরাম খাঁ খানিকটা নিরাশ হলেন। শের শাহ সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য সম্রাটকে দেবেন ঠিক করে এসেছিলেন। সম্রাটের মতিগতি দেখে বুঝতে পারলেন সেসব শুনতে সম্রাট একেবারেই আগ্রহী নন। তিনি নতজানু হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। হুমায়ুন নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে বাইরে এলেন, জলাশয়ের কাছে এসে বসে জলে হাত চুবালেন। গ্রীষ্মকালে জল নিয়ে খেলা সম্রাটের প্রিয় কাজগুলোর মধ্যে একটা।
খাস বাঁদি মেহজাবিন সম্রাটের কাছে এসে দাঁড়াল। মুখে খানিকটা উৎসুক ভাব। হুমায়ুন বললেন, “কী সংবাদ মেহজাবিন? কিছু বলবে তুমি?”
মেহজাবিন বলল, “জাহাঁপনা কি আজকে হারেমে যাবেন?”
হুমায়ুন অবাক হলেন, বললেন, “কেন বলো তো?”
মেহজাবিন বলল, “এক হিন্দু মেয়ে গত কাল হারেমে এসেছে জাহাঁপনা। সমস্যা হল আসা ইস্তক মেয়ে কেঁদেই যাচ্ছে। কিছুতেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছে না।”
হুমায়ুন বললেন, “হারেমে এসেছে? কী করে সম্ভব? বাদশাহী হারেমের আদৌ উপযুক্ত সে কন্যা?”
মেহজাবিন মাথা নিচু করে জানাল, মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য পালিয়ে নিয়ে এসেছিল তার এক আত্মীয়। ছেলেটির মা যখন বুঝতে পারেন মেয়েটি সুন্দরী এবং নিরাপত্তাহীন পথে কোথাও নিয়ে যাওয়া অসম্ভব, তখন ছেলেটিকে না জানিয়েই হিন্দু মেয়েটিকে বাদশাহি হারেমে পাঠিয়ে দেন মেহজাবিনের হাত দিয়ে। সমস্যা যদিও অন্য হয়েছে, মেয়েটি খাওয়া প্রায় ত্যাগ করেছে, সারাদিন ধরে কেঁদে চলেছে। এমন অবস্থায় যদি বাদশাহ একবার মেয়েটির সঙ্গে দেখা করেন, তাহলে হয়তো মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
হুমায়ুন মেহজাবিনের দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে বললেন, “বেশ। চলো। পরখ করে আসি, কোন কোহিনূর এত পরম যত্নে তুমি আগলে রেখেছ। চলো।”
১৭
সুশোভনরা চলে গেলে আদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে ড্রয়িংরুমে বসে রইল। ঝুমকি এসে বলল, “ওঁরা পুলিশ? আমার ব্যাপারে এসেছিলেন?”
আদিত্য ঝুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ। তোর ব্যাপারে।”
ঝুমকি বলল, “আমার জন্য সবার মাথা নিচু হল।”
আদিত্য বলল, “এখন এই কথাটা বলে লাভ আছে ঝুমকি? তোর এটা আগে ভাবা উচিত ছিল। হিন্দু মুসলিমটা বড়ো কথা না, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার কনসেপ্টটাই বা তুই এনকারেজ করলি কেন?”
ঝুমকি মাথা নিচু করে বসে থেকে বলল, “আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম।”
আদিত্য বলল, “সে কি আর আলাদা করে বলার দরকার পড়ে? কিন্তু দয়া করে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে টাইপ কমেন্ট করিস না এখন।”
ঝুমকি কিছু বলল না।
আদিত্যর ফোন বেজে উঠল। সে দেখল রুমকি ফোন করছে। ঝুমকিকে বলল, “তোর দিদি ফোন করছে। চুপ করে থাকিস।”
ঝুমকি মাথা নাড়ল।
আদিত্য ধরল, “হ্যালো।”
“এই তুমি তোমার বন্ধুকে ফোন করো একবার শিগগিরি।”
ওপাশ থেকে রুমকির কাঁদো কাঁদো গলা ভেসে এল।
আদিত্য অবাক গলায় বলল, “কেন? কী হয়েছে?”
রুমকি বলল, “আরে আমি ঘুমাচ্ছিলাম। বাবা সামনের ঘরে ছিল। পাঁচ-ছটা ছেলে এসে বাবাকে হুমকি দিয়ে গেছে। ঝুমকি নাকি পালিয়েছে ওখান থেকে। বাবার বুক ধড়ফড় করছে। আমি ডাক্তার আঙ্কেলকে ফোন করেছি। আসছে। তুমি এসো প্লিজ। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ঝুমকি কোথায় গেল?”
আদিত্য আঙুল দিয়ে মাথা টিপে কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে বলল, “আমি আসছি। সুশোভনকেও বলছি। আপাতত পাড়ার লোকজনকে বলে রাখো তারা যেন উটকো লোক দেখলে তাড়া করে। ছেলেগুলোকে সুবিধার মনে হচ্ছে না।”
রুমকি বলল, “প্লিজ এসো। আমি আর চাপ নিতে পারছি না।”
ফোন রেখে আদিত্য সুশোভনকে ফোন করল। সুশোভন ধরলেন, “বল রে।”
আদিত্য বলল যা হয়েছে।
সুশোভন অস্ফুটে বললেন, “আনএক্সপেক্টেড ছিল না ব্যাপারটা। বরং আগে থেকে আমারই অ্যালার্ট করে দেওয়া উচিত ছিল। চিন্তা করিস না, আমি লোকাল থানায় ইনফর্ম করে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করছি। তুই কি তোর শ্বশুরবাড়িতে এখনই ও যে ফিরে এসেছে সেটা বলে দিবি?”
আদিত্য বলল, “নাহ। ও বাড়িতে পরিস্থিতি ভালো না। এখন বললে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমি ঝুমকিকে এ বাড়িতে রেখে যাচ্ছি। গিয়ে দেখি কী হাল।”
সুশোভন বলল, “ঠিক আছে। তুই যা। আমি থানায় বলে দিচ্ছি।”
ফোন রাখল আদিত্য। ঝুমকি চিন্তিত মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে?”
আদিত্য বলল, “শুনতে পেলি তো। তোর পেয়ারের রিন্টু ওরফে রুবেল লোক পাঠিয়েছে তোদের বাড়িতে। রীতিমতো হুমকি দিয়ে গেছে। কত বড়ো গ্যাংস্টার ছেলেটা?”
ঝুমকি এবার কাঁদো কাঁদো হল, “ওর খুব রাগ। আমি আগে একবার বুঝেছিলাম।”
আদিত্য হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলল, “ওর রাগ খুব না কম, তাতে কারও যায় আসে না। এই যন্তরটাকে তুই এখন ভোলার চেষ্টা কর। দয়া করে সেন্টু খেয়ে আবার ওর কাছে ফিরে যাস না।”
ঝুমকি জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “কখনোই না। কোনও দিনও আমি আর ফিরে যাব না।”
আদিত্য বলল, “ঠিক আছে। শোন, তুই এখানেই থাক। আমি তোদের বাড়িতে যাচ্ছি। ওদিকটাও তো সামলাতে হবে। তোর জ্বালায় আমার অফিস মাথায় উঠল যা বুঝতে পারছি। চাকরিটা থাকলে হয়।”
ঝুমকি কেঁদে ফেলল।
আদিত্য এবার নরম হয়ে বলল, “কাঁদিস না। ফ্রিজে চকোলেট আছে। খেয়ে নিস। এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয় আর মেয়ে চললেন বাড়ি থেকে পালাতে। যত্তসব!”
