সে সুশোভনকে বলল, “তোরা বোস, আমি একটু চোখে মুখে জল দিয়ে আসি।”
সুশোভন বললেন, “বেশ।”
আদিত্য বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করে, চোখে মুখে জল দিয়ে ড্রয়িং রুমে এল। সুশোভন তাঁর সঙ্গে আসা ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করালেন, “আদিত্য, উনি জামান সাহেব। আমাদের সিনিয়র। তোর শালির ব্যাপারটা ওঁকে জানাতে উনি নিজেই কেসটার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।”
আদিত্য হাত জোড় করল।
জামান বললেন, “আমি সুশোভনের কাছে কাল রাতেই শুনলাম ব্যাপারটা। খুব আনফরচুনেট ব্যাপার ঘটেছে। এসব মানুষদের জন্যই কিন্তু কমিউনাল টেনশন তৈরি হয়।”
আদিত্য বলল, “আমারও তাই মনে হয়। ইন ফ্যাক্ট কাল আমি আর সুশোভন ছেলেটার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে ওদের অ্যাগ্রেসিভ চেহারা আমার অন্তত ভালো লাগেনি। সুশোভন যদিও ব্যাপারটা বেশ ঠান্ডা মাথায় সামলে নিয়েছিল। কিন্তু আমার রীতিমতো ভয় লাগছিল ওদের অ্যাটিচিউড দেখে।”
জামান বললেন, “আমি নিজে ব্যাপারটা দেখতে চাই। আমার জন্মও খিদিরপুরে। এরকম কেস আমি দেখিনি এমন নয়, কিন্তু ইদানীং যেন এই ফ্রিকোয়েন্সিটা বেড়ে গেছে। কিছু মানুষের জন্য গোটা ধর্মের লোকেদের দিকে তর্জনী উঠছে। আচ্ছা, মেয়েটিকে একটু ডাকা যাবে?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, যাবে, কিন্তু এখনই ওকে এসব ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ না করলেই ভালো হয়। একটা শকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ও।”
জামান হাত তুললেন, “তাহলে থাক। প্রথম স্টেপ হিসেবে আজকেই ছেলেটি এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটা এফআইআর করুন। মেয়েটিকে মেন্টাল সাপোর্ট দিন। এসব কেসে মেয়ের বাড়ির লোক লজ্জার ভয়ে পুরো ব্যাপারটাই চেপে গিয়ে অন্য কোনওখানে মেয়েটির বিয়ে ঠিক করে। সেটা করতে চাইলে আমার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এই ধরনের ক্রিমিনালদের খোলা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে এনকাউন্টার করে দেওয়া উচিত।”
সুশোভন বললেন, “স্যার, লাস্ট কয়েকটা বছরে স্টেটে কমিউনাল টেনশন বেড়েছে। এই ধরনের ঘটনা যদি সামনে আসে তবে স্বাভাবিকভাবেই…”
জামান বললেন, “সামনে আসার দরকার আছে। সমাজের স্বার্থেই সেটা দরকার আছে। এ ধরনের কাজকর্ম কোনওভাবেই সাপোর্ট করা যায় না।”
সুশোভন আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই কী বলিস? ব্যাপারটা নিয়ে তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনওরকম মুভমেন্ট হবে?”
আদিত্য ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, “আগে ওর বাবা ওকে ঘরে ফিরিয়ে নিক। আমার তো যথেষ্ট ডাউট আছে, সেই প্রসেসটা শান্তিপূর্ণভাবে হবে নাকি সে সম্পর্কে। তারপরে তো লড়াইয়ের প্রশ্ন আসছে।”
জামান বললেন, “মেয়ে পালিয়ে গেলে মেয়ের ওপর বাপের অভিমান হওয়া স্বাভাবিক। আমার নিজেরও মেয়ে আছে। একজন মেয়ের বাপ হিসেবে ব্যাপারটা আমি ফিল করতে পারি। যাই হোক, এফআইআর-টা করুন। লড়াইটা শুরু হোক।”
আদিত্য বলল, “আমি আজ ওদের বাড়িতে ওকে নিয়ে যাই। তারপর কী প্রতিক্রিয়া হয় সুশোভনকে জানাচ্ছি। সেটা দেখে নাহয় পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা যাবে?”
জামান উঠলেন, “বেশ, তাই হোক। আমাকে আপডেট দিতে থাকবেন।”
আদিত্য বলল, “নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ।”
১৬
সম্রাট হুমায়ুন একমনে কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি কিছু লিখতে পারছেন না। মন বড়োই বিক্ষিপ্ত।
এমন সময় এক দাসী এসে খবর দিল বৈরাম খাঁ দেখা করতে এসেছেন।
হুমায়ুন বিরক্ত হলেন। কিন্তু বৈরাম খাঁকে আসার অনুমতিও দিলেন।
বৈরাম খাঁ সম্রাটের কক্ষে প্রবেশ করলেন।
হুমায়ুন বললেন, “কী ব্যাপার খাঁ সাহেব? বড়ো উতলা মনে হচ্ছে?”
বৈরাম খাঁ বললেন, “জাহাঁপনা, খুশি হবার মতো একটা খবর ঘটেছে বটে। অবশ্য একইসঙ্গে চিন্তা বাড়ারও পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে।”
হুমায়ুন অবাক গলায় বললেন, “আমার খুশি হবার মতো ঘটনা? কী হয়েছে শুনি?”
বৈরাম খাঁ বললেন, “জাহাঁপনা, আপনার ভাই কামরান মির্জা আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে লোকলশকর জড়ো করছিল। সুখের কথা হল, শের শাহ সুরির সৈন্যরা তাদের একটা দলকে কচুকাটা করেছে সরাইখানার ভিতরে।”
হুমায়ুন শিউরে উঠে বললেন, “আমার ভাই ভালো আছে তো?”
বৈরাম খাঁ সম্রাটের প্রতিক্রিয়া দেখে খানিকটা অবাক হয়ে বললেন, “এই খবরে আপনার আর কোনও কিছু মনে পড়ল না?”
হুমায়ুন বললেন, “নাহ। আগে তো পরিবার। তারপরে সব কিছু। যাই হোক, কামরান ভালো আছে তো?”
বৈরাম খাঁ সম্রাটকে আশ্বস্ত করলেন, “হ্যাঁ জাহাঁপনা। ওঁর শরীরে আঁচটুকুও লাগেনি। তা ছাড়া উনি ঘটনাস্থলে ছিলেনও না। তবে রাজবিদ্রোহ দমন করা এই মুহূর্তে কঠিন কাজ হত। যা হয়েছে, ভালোর জন্যই হয়েছে। যদিও কামরান মির্জা চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আমাদেরই সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোনও গুপ্তঘাতক আপনার কাছে না ঘেঁষতে পারে।”
হুমায়ুন বললেন, “তাহলে ঠিক আছে। আর চিন্তা বাড়ার কারণ কী?”
বৈরাম খাঁ বললেন, “শের শাহ শক্তিবৃদ্ধি করছেন। আমার মনে হয়, আমাদের শের শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেওয়া উচিত।”
হুমায়ুন বললেন, “বেশ তো, আপনি প্রস্তুত করুন সকলকে। তরবারি ধরি না অনেকদিন হয়ে গেল।”
বৈরাম খাঁ বললেন, “অধৈর্য হবেন না জাহাঁপনা। এই মুহূর্তে শের শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রার কথা রাজ্যের সর্বত্র রটে গেলে কামরান মির্জা খুশিই হবেন। দিল্লির তখত খালি থাকবে। কামরান মির্জা বিদ্রোহীদের নিয়ে রাজধানী দখল করতে চলে আসবেন। এখন এই সংবাদ গোপন করা আমাদের আশু কর্তব্য। আমরা নিঃশব্দে প্রস্তুতি শুরু করব।”
