ঝুমকি হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “দিদি কোথায়?”
আদিত্য বলল, “রুমকি তো তোদের বাড়িতেই। বাবা মাকে সামলাচ্ছে। আয়, ভিতরে আয়।”
ঝুমকি তাড়াতাড়ি ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকে বলল, “দরজাটা দাও শিগগিরি। ওরা আমাকে ফলো করছে নাকি জানি না।”
আদিত্য দরজায় লক করে বলল, “তুই বস। কী হয়েছে বল আগে।”
ঝুমকি কেঁদে ফেলল। আদিত্য কিছু বলল না। চুপ করে বসে থাকল। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর ঝুমকি বলল, “আমি কোনওমতে পালিয়ে এসেছি।”
আদিত্য বলল, “আমি তোর দিদিকে ফোন করব?”
ঝুমকি জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “না, দিদিকে ফোন কোরো না। বাবা মাকে যদি বলে দেয় আর-এক ঝামেলা। দিদির পেটে কোনও কথা থাকে না।”
আদিত্য রুমকিকে খুব ভালো করে চেনে। ঝুমকি কথাটা ঠিকই বলেছে।
সে বলল, “কী হয়েছিল কী? হঠাৎ করে এত বড়ো কাণ্ড করার দরকার কী ছিল?”
ঝুমকি আবার কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে জানাল কলেজ ফেস্টের দিন রিন্টুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। দারুণ গিটার বাজায়, ব্যান্ডে গান করে। কখন যে দুজনের প্রেম হয়ে গেল বুঝতেও পারেনি। বিয়ের সমস্ত প্ল্যানিং ও-ই করেছিল। শুধু সার্টিফিকেট নিয়ে আসা, মোবাইল অফ করে রাখা, সব প্ল্যান রিন্টুর। ও যে অন্য ধর্মের, কোথায় থাকে, সে সম্পর্কে আগে কিছুই জানায়নি তাকে। ঝুমকিও জানার প্রয়োজন বোধ করেনি কখনোই। কিন্তু একদিনের অভিজ্ঞতা তার রিন্টু সম্পর্কে সমস্ত ধারণাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। বাকি সবটা বলার পর ঝুমকি জানাল কী করে সে পালাতে পারল।
ঝুমকিকে কনভার্ট করার উৎসবে একে একে জড়ো হয়েছিল সবাই। স্থানীয় ইমামও চলে এসেছিলেন। হঠাৎ রিন্টুর চাচি রিন্টুকে বলল, বহুকে তারা সাজাতে চায়। রিন্টু আর আপত্তি করেনি। ঝুমকিকে নিয়ে চাচি একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে তাকে চমকে দিয়ে বাংলায় বলল, “তোমাকে জোর করে নিয়ে এসেছে, না?”
ঝুমকি হাঁ করে রিন্টুর চাচির দিকে তাকাল।
রিন্টুর চাচি বলল, “আমি সব বুঝেছি। আমাকেও একদিন এভাবেই নিয়ে আসা হয়েছিল। তুমি যাও, পিছনের দরজায় আমার খুব বিশ্বস্ত একজন গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি গাড়িতে গিয়ে ওঠো। ও তোমাকে স্টেশনে দিয়ে আসবে, আর এই টাকাগুলো রাখো। কোনও দিন ভুলেও এর কাছে ফিরে আসবে না, মনে রেখো, জানে মেরে দেবে তোমাকে।”
হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়ে রিন্টুর চাচি ঝুমকিকে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিল। সেখান থেকে স্টেশন, হাওড়াগামী ট্রেন, হাওড়া থেকে এখানে ট্যাক্সি নিয়ে আসা, সমস্ত পথটাই ঝুমকি তীব্র আতঙ্কের মধ্যে ছিল। তার বারবার মনে হয়েছে, এই বুঝি রিন্টু তাকে ধরে ফেলল।
আদিত্য ফ্রিজ থেকে জলের বোতল এনে ঝুমকিকে দিয়ে বলল, “জল খা। এসে যখন পড়েছিস, তখন আর চিন্তার কিছু নেই।”
ঝুমকি আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা সব জেনে গেছে, না?”
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড থমকে বলল, “হ্যাঁ। সবটাই।”
ঝুমকি মাথা নিচু করে বলল, “বাবা আমাকে কোনও দিন মেনে নেবে না।”
আদিত্য বলল, “সেটা বড়ো কথা না। তুই বেরিয়ে আসতে পেরেছিস, সেটা বড়ো কথা। জলটা খা। আমি সুশোভনকে ফোন করি।”
ঝুমকি বলল, “সুশোভন কে?”
আদিত্য বলল, “আমার বন্ধু। পুলিশে আছে। চিন্তা করিস না। তুই খাসনি তো কিছু? ফ্রিজে খাবার আছে, গরম করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
ঝুমকি উঠল না। বসে রইল।
আদিত্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুশোভনকে ফোন করল।
সুশোভন একটা রিং হতেই ধরলেন, “বল রে, কোনও আপডেট?”
আদিত্য বলল, “ঝুমকি ফিরে এসেছে। টর্চার হয়েছে, কনভার্শনের চেষ্টা হয়েছে এবং রেপ হয়েছে। কী করা যায়?”
আদিত্যর কথা শুনে ঝুমকি মুখ চাপা দিল দু হাত দিয়ে।
সুশোভন চাপা গলায় বললেন, “ফিরে আসতে পেরেছে এটা বিরাট ব্যাপার। বাকিটা কী হবে সেটা নিয়ে কাল কথা বলি বরং। মেয়েটি কোথায়?”
আদিত্য বলল, “আমার সামনেই। এখন কথা বলতে পারবে না। বুঝতেই পারছিস কী অবস্থা ওর।”
সুশোভন বললেন, “ওকে। কাল কথা হচ্ছে। গুড নাইট।”
আদিত্য বলল, “গুড নাইট।”
ফোনটা রেখে আদিত্য ঝুমকিকে বলল, “তুই খেয়ে নে।”
ঝুমকি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “আমি নষ্ট হয়ে গেলাম।”
আদিত্য চুপ করে বসে রইল।
১৫
ঝুমকি গেস্টরুমে ঘুমাল। আদিত্য বেশ কয়েকবার ভেবেছিল রুমকিকে জানাবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আর জানাল না। ঝুমকি ঠিকই বলেছে রুমকির সম্পর্কে। ও পেটে কথা রাখতে পারে না। এখন ওদের বাবার প্রতিক্রিয়া ঠিক কী হবে সেটা আঁচ করা সম্ভব নয়। ভদ্রলোক বেশ গোঁড়া।
ঘুমাতে যাবার আগেও আদিত্যর রিন্টুর বাড়ির পরিবেশটা মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। সুশোভন চলে গেলে সে আবার গেছিল। দরজার বাইরে থেকেই উত্তেজিত কথোপকথন শুনতে পেয়েছিল সে। পুলিশ কেন এসেছে, আগে জানলে পুলিশের গলা নামিয়ে দিত, এই সমস্ত কথা শুনে সে আর দাঁড়ায়নি। সন্তর্পণে চলে এসেছিল। মানুষ এত মারমুখী কেন হবে অনেক ভেবেও সে বুঝে উঠতে পারেনি। বিয়ে হয়েছে, মেয়ে নিজের ইচ্ছাতেই বিয়ে করেছে, তাতে গলা নামিয়ে দেবে, এ জাতীয় ভাষা কেন ব্যবহৃত হবে? আদিত্য খানিকটা ভয়ই পেয়েছিল। অনেক রাত অবধি এপাশ ওপাশ করে শেষমেশ ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।
ঘুম ভাঙল কলিং বেলের শব্দে।
ড্রয়িং রুমে এসে দেখল ঝুমকি আগেই দরজা খুলে দিয়ে আবার ঘরে চলে গেছে। সুশোভনের সঙ্গে আর-একজন মধ্যবয়স্ক অপরিচিত মানুষ। উর্দি পরে রয়েছেন। আদিত্য বুঝল ইনি সুশোভনের কলিগ।
