আদিত্য বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, “সেজন্যই তো আমি থাকছি না। তুমি থেকে সামলাও।”
রুমকি রাগি মুখে দাঁড়িয়ে রইল। আর বাড়ির বাইরে গেল না।
#
রাত সাড়ে নটা।
আদিত্য ফ্ল্যাটে ফিরে টিভি দেখছিল। হোম ডেলিভারি থেকে খাবার আনিয়েছে। আর কিছুক্ষণ পর খেতে বসবে। রুমকিকে আর ফোন করেনি।
আর-এক দফা ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছে রুমকির সঙ্গে। এরকম তাদের প্রায়ই হয়। যখন হয়, তখন দু পক্ষের কথা বন্ধ থাকে। কোনও প্রয়োজন ছাড়া কথা শুরুও হয় না।
সোফায় বসে আদিত্যর ঘুমে চোখ লেগে আসছিল। সারাদিন অনেক পরিশ্রম গেছে।
সে ভাবছিল ডিনারটা কাটিয়েই দেবে, এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল।
আদিত্য বিরক্ত মুখে উঠল, দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল।
বাইরে ঝুমকি দাঁড়িয়ে আছে। রীতিমতো হাঁফাচ্ছে।
১৩ ।।আগের কথা।।
ফিরোজা বেগম পথের পানে তাকিয়ে বসেছিলেন। ছেলেটা সেই কবে পালিয়ে চলে গেল মনোয়ারা বেগমের দলের সঙ্গে, তারপর থেকে কোনওরকম খোঁজ খবর নেই।
একা একা কাঁদেন, গ্রামের বাকি লোকেদের জিজ্ঞেস করেন। সবাই একটাই কথা বলে, ও ছোঁড়া কম বয়সে রং বুঝে ফেলেছে, আর ফিরবে না। ফিরোজা তাঁর জীর্ণ কুটিরে দিন গুজরান করতে করতে স্বামী সন্তানের কথাই ভাবেন। আজমলের বাবা ইব্রাহিম লোদির সেনাবাহিনীর সেপাই ছিলেন। যুদ্ধে মারা যান। তখন সবে আজমল হয়েছে। তারপর থেকে কম কষ্ট হয়নি ফিরোজার। আগামী দিনের কথা ভেবে দাঁতে দাঁত চেপে ছেলেকে বড়ো করে তুলেছিলেন শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে। সে ছেলেটাকে পর্যন্ত মনোয়ারা বশ করে নিয়ে চলে গেল।
দুপুর হয়েছে, ফিরোজা সামান্য কিছু মুখে দিয়ে বসে ছিলেন, হঠাৎ দূর থেকে একটা ঘোড়া আসতে দেখে সোজা হয়ে বসলেন। এ ভঙ্গি তো তাঁর বড়ো চেনা। ফিরোজা উঠে দাঁড়ালেন, দৌড়োতে দৌড়োতে দুপুর রোদের মধ্যেই ধুলোমাখা পথে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আজমল! আজমল এসেছে। সঙ্গে একটা মেয়ে!
আজমল একদম তার বাবার মতো ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়া থেকে মেয়েটাকে নামাল। পরক্ষণেই ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল, “আম্মিইই… কেমন আছ তুমি?”
ফিরোজা কাঁদতে কাঁদতে ছেলের দুগালে জোরে জোরে চড় মারতে বললেন, “কোথায় চলে গেছিলি তুই আমাকে না বলে? ওই ডাইনিটা তোকে কি গুণ করেছিল? আর এই মেয়েটা কে?”
রাধা ফিরোজা আর আজমলের ভাষা কিছুই বুঝতে পারছিল না। পথশ্রমে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে মাথা ঘুরে পড়ে গেল।
ফিরোজা দৌড়ে গিয়ে রাধাকে ধরে আজমলকে ধমক দিয়ে বললেন, “পানি নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি যা।”
আজমল দৌড়ে জল নিয়ে এল। ফিরোজা রাধার চোখে মুখে জল ছিটিয়ে দিলেন। আজমলকে বললেন, “ওকে ঘরে নিয়ে চল।”
মা ছেলে মিলে রাধাকে ধরে ঘরে নিয়ে মেঝেতে শোয়াল।
ফিরোজা আরও অনেকটা জল দিলেন রাধাকে। রাধা ক্লান্ত চোখে ফিরোজার দিকে তাকাল।
ফিরোজা রাধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আজমলের দিকে তাকিয়ে রাগি গলায় বললেন, “দেখে হিন্দু মনে হচ্ছে। কোত্থেকে নিয়ে এসেছিস তুই ওকে?”
আজমল বেড়ায় হেলান দিয়ে বসে বলল, “বেগমের কুঠি থেকে। ওকে হারেমে পাঠিয়ে দিত নইলে।”
ফিরোজা বললেন, “দিলে দিত। তোর কী হয়েছিল?”
আজমল মাথা চুলকে বলল, “জানি না, কী হয়েছিল। মনে হল ওকে হারেমে নিয়ে গেলে খুব খারাপ হবে। তাই যখন সরাইখানায় ঝামেলা শুরু হয়ে গেল, আমি ওকে উঠিয়ে নিয়ে চলে এলাম। আগে পিছে কী হবে, অত ভেবে দেখিনি আমি।”
ফিরোজা ছেলের দিকে তাকালেন। ছেলেটা এ কদিনেই কতটা বড়ো হয়ে গেছে। কেমন বড়োদের মতো করে কথা বলছে। মেয়েটার মধ্যেও একটা অদ্ভুত মায়া আছে। ফিরোজা প্রাণভরে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আজমলকে বললেন, “এ মেয়েকে তো এমনি এমনি এখানে রাখা যাবে না। ইমাম সাহেব অনেকরকম প্রশ্ন করবেন। গ্রামের বাকি মুরুব্বিরাও ছেড়ে কথা বলবেন না। তোকে এ মেয়েকে বিয়ে করতে হবে।”
আজমল লজ্জায় মাথা নিচু করল।
ফিরোজা আজমলের চুলের মুঠি ধরে নাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “সেই ইচ্ছাই ছিল তোর, তাই না?”
আজমল বলল, “জানি না আম্মি, অত কিছু তো ভাবিনি আমি।”
ফিরোজা বললেন, “কোথায় বাড়ি এ মেয়ের? জানিস কিছু?”
আজমল মাথা নাড়ল।
ফিরোজা আরও খানিকটা জল রাধার চোখে মুখে দিলেন। রাধা কেঁদে উঠল, “আমি বাবার কাছে যাব।”
ফিরোজা অবাক মুখে আজমলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা কী ভাষা?”
আজমল বলল, “পুবের ভাষা। বঙ্গাল মুলুকের ভাষা মনে হয়।”
ফিরোজা বললেন, “এই মেয়েকে তুই বিয়ে করলে কী করে হবে? কেউই তো কিছু বুঝব না ও কী বলছে। কিন্তু এভাবে রেখেও তো দেওয়া যাবে না। ঠিক আছে, কাজি সাহেবকে ডেকে আজকেই বিয়ে পড়িয়ে দিচ্ছি। তারপর আমি দেখছি কী করা যায়।”
আজমল বলল, “আর মনোয়ারা বেগম যদি ওকে খুঁজতে এখানে চলে আসে?”
ফিরোজা চিন্তিত গলায় বললেন, “তা তো হতেই পারে। ওদের অনেক ক্ষমতা। সত্যিই যদি দেখতে পায় ওর দলের মেয়ে নিয়ে এসেছিস, তাহলে সবাইকে মেরে ফেলবে। কী করা যায়?”
আজমল বলল, “দিল্লি চলো মা। ছোটো খালার কাছে যাই। এখানে, এই গ্রামে থেকে তো কিছু হবেও না। আমাদের চাষের জমিই বা কতটুকু আর আছে? চলো দিল্লি যাই।”
ফিরোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এতদিন পরে এলি, তাও আবার কতরকম মুসিবত নিয়ে এলি। তুই কোনও দিন আর মানুষ হলি না রে আজমল, এত বড়ো হয়ে গেলি, তবুও মানুষ হলি না।”
১৪ ।। এই সময়।।
আদিত্য অবাক চোখে ঝুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই? এত রাতে?”
