রিন্টুর মা কিছু বললেন না। সুশোভন আদিত্যকে বললেন, “চল।”
আদিত্য সুশোভনের পিছন পিছন এগোল। ছেলেগুলোও তাদের সঙ্গে সঙ্গে গেট অবধি এল। গলি দিয়ে হেঁটে বড়ো রাস্তায় উঠে হাঁফ ছাড়ল আদিত্য। বলল, “বাপ রে, কী ডেঞ্জার জায়গা রে!”
সুশোভন বললেন, “সেন্সিটিভ জায়গা। খুব সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হয়। না হলেই চিত্তির। অনেকরকম খেলা চলে এখানে।”
আদিত্য বলল, “সেটা বুঝতেই পারছি। তোর সেই মাথা গরম অবতার এতটা চেঞ্জ হয়ে গিয়ে প্রায় অপোজিট হয়ে গেছে সেটা দেখেও অবাক হয়ে গেলাম। ফাটিয়ে দিলি তো!”
সুশোভন বললেন, “কিছু করার নেই। যেখানে যেরকম, সেখানে তেমন হতেই হবে। এখানে আমি একা কী করব? তুই-ই বা কী করতিস? কীভাবে তেড়ে এসেছিল দেখেছিস?”
আদিত্য চিন্তিত গলায় বলল, “হুঁ। কেসটা আর কিছু করার নেই।”
সুশোভন বললেন, “এক-একটা ফ্যামিলি এক-এক রকম ভাবে ডিল করে। কিছুদিন আগে এক মাড়োয়ারি ফ্যামিলির মেয়ে একটা মুসলিম ছেলের সাথে ভেগেছিল। ছেলের বাপ বুঝিয়ে-টুঝিয়ে মেয়েটাকে বাড়িতে এনে আর-একটা বিয়ে দিয়ে দিল অ্যাব্রডে। সে ক্যাচাল এখনও আমাদের সামলাতে হচ্ছে। তবে তোর শ্বশুরকে বলে দে ব্যাপারটা নিয়ে আর কিছু না করতে।”
আদিত্য বলল, “উনি কিছু করবেনও না আর। এমনিতেই তীব্র অ্যান্টি-মুসলিম। আর-এক বন্ধু আছে। লাভ জিহাদ এটসেট্রা বুঝিয়ে দিয়েছে। আর কী…”
সুশোভন বললেন, “বাদ দে। আমি তবে যাই রে, আর বেশিক্ষণ থাকলে চলবে না। একগাদা কাজ জমে আছে।”
আদিত্য ঘাড় নাড়ল, “ঠিক আছে। দেখি কী করা যায়।”
সুশোভন চলে গেলেন।
আদিত্য কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আবার রিন্টুদের বাড়ির দিকে রওনা দিল।
১২
আদিত্য শ্বশুরবাড়ি পৌঁছল বেলা চারটে নাগাদ। রুমকি দরজা খুলল।
তাকে দেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “কী হল? কোনও আপডেট পেলে?”
আদিত্য দেখল ড্রয়িং রুমে শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই বসে আছেন।
সে রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ওই ছেলেটার বাড়ি গেছিলাম সুশোভনের সঙ্গে।”
শাশুড়ি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “বসো বাবা, বসো। এই দুপুর রোদে এলে।”
আদিত্য সোফায় বসে বলল, “হ্যাঁ, বিয়েটা হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই আর কি।”
তপন শ্লেষ জড়ানো গলায় বললেন, “তাহলে তো হয়েই গেল। তা উনি কি এখন এখানেই আছেন?”
আদিত্য রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “না, হানিমুনে গেছে।”
শাশুড়ি অন্য ঘরে চলে গেলেন।
রুমকি বলল, “তোমার বন্ধু কী বলল? কিছু করা যাবে?”
আদিত্য বলল, “ওরা ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ। আর কিছু করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না।”
তপন রুমকির দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি জানতাম। ওরা এমনই। সঙ্গে সঙ্গে কনভার্ট করে দেয়। যেভাবে সোনার দোকানে সোনা বেচার পর ওরা সোনা গলিয়ে দেয়, একইভাবে কোনও হিন্দু মেয়ে যদি ওরা বিয়ে করে, ওদের টার্গেটই থাকে কত তাড়াতাড়ি কনভার্ট করবে।”
আদিত্য বলল, “তা কেন হবে? অনেক ক্ষেত্রেই সেটা হয় না। আমাদের অফিসের এক কাপলই আছে, মহিলাটি এখনও শাঁখা সিঁদুর পরেন।”
তপন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করে বললেন, “হবে হয়তো। যাই হোক, আমি আর চিন্তা করছি না। প্রথম প্রথম আমার টেনশন হচ্ছিল। এখন আমি অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছি। অবশ্য শোক করবই বা কার জন্য? যে মেয়ে নিজের পরিবারের মূল্যবোধের দাম দিতে পারে না, তাকে তো আর কিছু বলার নেই আমার।”
আদিত্যর অস্বস্তি হল, এমনিতেই শ্বশুরের সামনে সে খুব একটা স্বাভাবিক হতে পারে না, তার ওপর এই পরিস্থিতি। সে রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা তাহলে কি আজ বাড়ি যাব?”
রুমকি একবার বাবার দিকে, আর-একবার আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো এই অবস্থায় কোনওভাবেই যেতে পারব না। তুমি যাও বরং। আমি দুটো দিন বাবা-মার কাছে থেকে যাই। এখনই যেয়ো না, লাঞ্চ করোনি তো?”
আদিত্য বানিয়ে বলল, “হ্যাঁ, করে এসেছি। সুশোভন খাইয়ে দিয়েছে। আমি যাই বরং।”
রুমকি আদিত্যর অস্বস্তিটা বুঝল। বলল, “ঠিক আছে, তুমি সাবধানে যেয়ো। গিয়ে ফোন কোরো কিন্তু।”
তপন বিড়বিড় করে বললেন, “সবাই এবার আমাকে দেখে হাসবে। সারাজীবন ভক্তিভরে ধর্মপালন করে গেলাম, আর সেই আমার মেয়েকেই কিনা… ছি ছি ছি।”
আদিত্য ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে গেল। পিছন পিছন রুমকি।
আদিত্য জুতো পরছিল, রুমকি ফিসফিস করে বলল, “কী বুঝলে? কেমন বাড়িঘর?”
আদিত্য বলল, “একেবারেই অন্য ধরনের, ওই পরিবেশে থাকতে পারবে না। সব কিছুই অন্যরকম। কী দেখে গেল, ও-ই জানে।”
রুমকি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “চিরকালই তো বোকা হাঁদা একটা জানোই তো, কোনও কিছুর আগু পিছু কিছু না ভেবে কাজ করে ফ্যালে। ও যে এরকম করবে তা তো জানা ছিলই। এবার কী হবে?”
আদিত্য বলল, “মেনে নিতে হবে। সময় পালটেছে, এখনও যদি প্রাচীন ধ্যানধারণা নিয়ে থাকতে হয় সেটা তো অসম্ভব, তাই না?”
রুমকি রেগে বলল, “আমার বোন বলে খুব সহজে কথাটা বলে দিতে পারলে, তাই না? নিজের বোন হলে বলতে পারতে?”
আদিত্য থমকে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি কী করব বলো? আমার কী করার আছে? আমি তো ছেলেটার সঙ্গে তোমার বোনের পরিচয় করিয়ে দিইনি, দিয়েছি কি?”
রুমকি চাপা গলায় বলল, “একদম গলা তুলে কথা বলবে না। ভদ্রভাবে কথা বলো। এমনিতেই আমার বাবা মা চিন্তায় আছে।”
