ঝুমকি কয়েক সেকেন্ড রিন্টুর দিকে তাকিয়ে বোরখাটা পরে নিয়ে বলল, “দয়া করে বাথরুমটা দেখিয়ে দাও। আমি তো চিনব না, কার না কার ঘরে ঢুকে পড়ব, সেই নিয়ে আর-এক ঝামেলা শুরু হবে। আর এখান থেকে আজকেই যাব তো?”
রিন্টু ঝুমকির প্রশ্নটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে উঠে বলল, “চল তোকে বাথরুমে নিয়ে যাই।”
ঝুমকি নড়ল না, বলল, “আজকে যাব তো এখান থেকে?”
রিন্টু মাথা চুলকে বলল, “ইয়ে মানে চাচা কাজি সাহেবকে খবর দিয়েছে। একটা ছোটো অনুষ্ঠান আছে। ওটা না করলে তো হবে না।”
ঝুমকি বলল, “কীসের ছোটো অনুষ্ঠান?”
রিন্টু বলল, “তোকে কনভার্ট করে তারপর নিকাহটা হবে। বেশিক্ষণের কাজ না। কাজি সাহেব এলেই হয়ে যাবে। ব্যাপারটা ফান বুঝলি? সিনেমায় দেখিস না, তিনবার কবুল বলে। করিনা কাপুরও তো বলেছিল।”
ঝুমকি বলল, “আমাকে কনভার্ট হতে হবে?”
রিন্টু কাঁধ ঝাঁকাল, “আরে জাস্ট একটা প্রোগ্রাম। এই আত্মীয়স্বজনদের মুখ বন্ধ করার জন্য। তুই তোর মতো তোর ধর্ম মেনে চলিস, আমি কিছু বলব না, সিরিয়াসলি।”
ঝুমকি বলল, “চলো বাথরুম দেখিয়ে দাও।”
ঘর থেকে বেরোনো মাত্র রিন্টুর চাচা চাচি বউদিরা ঝুমকিকে ঘিরে ধরল।
ঝুমকি ক্লান্ত মুখে রিন্টুর দিকে তাকাল। রিন্টু ওদের হাত থেকে ঝুমকিকে বাঁচিয়ে বাথরুমে নিয়ে গেল।
বাথরুমে ঢুকে সম্পূর্ণ নগ্ন হল ঝুমকি। নিজের দিকে তাকিয়ে কান্না পেয়ে গেল তার। বুকের ওপর একগাদা দাগ। এই ছেলেটাকে সে প্রেম করেছিল? জীবন দিয়ে ভালোবাসত? মানুষের এত তাড়াতাড়ি এত পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে?
বেশ খানিকক্ষণ বাথরুমে কাটিয়ে বেরোল ঝুমকি।
বাড়ির মাঝের খোলা জায়গাটায় রিন্টুর চাচা একটা চেয়ারে এসে বসেছে। আর-একজন অপরিচিত লোক ছাড়াও বাড়িভর্তি লোকজন।
ঝুমকি অবাক হয়ে রিন্টুর দিকে তাকাল।
রিন্টু বলল, “তোকে বললাম না?”
ঝুমকি কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আমি একটু ঘর থেকে আসি?”
রিন্টু বলল, “ওকে।”
ঝুমকি বলল, “তুমি আসবে একটু?”
রিন্টু বলল, “আচ্ছা, আসছি।”
দুজনে ঘরে যেতে ঝুমকি দরজা বন্ধ করে বলল, “আমি কনভার্ট হতে চাই না। কিছু করা যাবে?”
রিন্টু ঝুমকির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার বারোটা ভাই আছে। সবাই মিলে তোকে যদি রেপ করে কয়লাখনিতে ফেলে রেখে দেয়, তোর বাপ কেন, তোর চোদ্দোগুষ্টি খবর পাবে না, বুঝলি?”
ঝুমকি শিউরে উঠল। সেই অচেনা রিন্টু যাকে সে চেনে না! যাকে সে কোনও দিন ভালোবাসেনি!
রিন্টু গলা নামিয়ে বলল, “চুপচাপ বাইরে চ, যা যা করতে বলবে করবি। একটু নড়চড় হয়েছে কী তোকে আমি বুঝে নেব বলে দিলাম।”
১১
একটা ঘরে বসিয়ে রেখে ভদ্রমহিলা বেরোলেন। সুশোভন সিগারেট ধরিয়ে আদিত্যকে বললেন, “তোরা কেসটা নিয়ে এগিয়ে কোনও লাভ পাবি না সেটা বুঝতে পারছিস?”
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “না বোঝার কিছু নেই। অফিসটা গেল মাঝখান থেকে। কাউন্টার দিস।”
সুশোভন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঘরের মধ্যে প্রায় দশ-বারোজন ছেলে এসে ঢুকল। তাদের পিছনে রিন্টুর মা। সুশোভন অবাক হয়ে বললেন, “কী ব্যাপার?”
রিন্টুর মা বললেন, “ইয়ে সব মেরে রুবেল কে ভাই হ্যায়। আপ ইন হি লোগো সে বাত কিজিয়ে।”
আদিত্য দেখল প্রায় সবাই ষণ্ডা গুন্ডা টাইপ। সে অবাক হয়ে সুশোভনের দিকে তাকাল। সুশোভন একটুও উত্তেজিত হলেন না। রিন্টুর মার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা তো বিয়েটা আটকাতে আসিনি। আপনি খামোখা ওদের ডেকে নিয়ে এলেন কেন?”
একটা ছেলে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “পুলিশ কিঁউ লেকে আয়া?”
আদিত্য বলতে যাচ্ছিল, সুশোভন আটকালেন তাকে। বললেন, “পুলিশ না। আমি ওর বন্ধু। যে মেয়েটি পালিয়েছে, ও আমারও বোনের মতোই। আমরা দেখতে এসেছি কোন বাড়িতে এসে ও উঠেছে। আপনাদের বাড়ির কোনও মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করলে আপনাদের জানতে ইচ্ছা করবে না সে কেমন আছে, কোথায় আছে?”
সুশোভনের কথায় ভিড়ের উত্তেজিত ভাবটা কমল খানিকটা। রিন্টুর মা বসলেন। সুশোভন বললেন, “দেখুন মেয়েটি পালিয়ে বিয়ে করেছে, কিন্তু নিজের অমতে। আমাদের এখানে কিছু করার নেই। বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি?”
রিন্টুর মা বাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়ে সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হাঁ বতাইয়ে।”
সুশোভন বললেন, “মেয়েটি, মানে যাকে আপনাদের ছেলে বিয়ে করেছে, তার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় ওরা কোথায় আছে, সেটা বললে, কিংবা যদি ফোনেও কথা বলানো যায়…”
একটা ছেলে বলে উঠল, “ফোন নেহি হ্যায় উসকে পাস।”
সুশোভন ঠান্ডা চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিছু তো আছে, কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করছি আমরা। ফোন অফ করে রেখে দিয়েছে। বাড়ির লোক না জানলে সমস্যা কি কমবে? আমরা তো বিয়েটা মেনে নিয়েছি।”
আদিত্য ছেলেগুলোর দিকে তাকাচ্ছিল। কারও চেহারাই স্বাভাবিক নয়। সুশোভনের ঠান্ডা মাথার মনে মনে তারিফ করল সে।
রিন্টুর মা বললেন ওরা দিল্লি গেছে। ফিরলে যোগাযোগ করতে বলবেন।
সুশোভন কয়েক সেকেন্ড বসে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে কার্ড বের করে রিন্টুর মার হাতে দিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, কোনওরকম খবর এলে জানাবেন। আপনাদের যেমন পরিবার আছে, ওদেরও তেমনি আছে। বুঝতেই পারছেন, জন্ম থেকে বড়ো করার পরে মেয়ে যদি কিছু না বলে চলে যায়, তাহলে বাবা মার ওপর দিয়ে ঠিক কতটা চাপ আসতে পারে।”
