তপনের কথা শুনে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রুমকি প্রতিবাদ করে বলল, “কী বলছ বাবা এসব তুমি? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?”
তপন বললেন, “তো কী বলব? যাদের জন্য একটা দেশ থেকে উৎখাত হয়ে এপারে আসতে হল, তাদের গলাতেই যদি আমার মেয়ে মালা দেয়, তবে কি উদ্বাহু হয়ে নাচব? এত ইনভেস্টমেন্ট, এত আশায় সব জলাঞ্জলি দিয়ে… ছি ছি ছি…” মাথা নাড়লেন তপন।
রুমকি আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি দ্যাখো না যদি ঝুমকির সঙ্গে ফোনে কথা বলানোর ব্যবস্থা করানো যায় তোমার ওই পুলিশ বন্ধুকে বলে!”
আদিত্য বলল, “দেখছি।”
দেখছি শব্দটা আদিত্য তার বসের থেকে শুনেছে। বস শিখিয়েছেন কখনও কোনও কিছুতে সরাসরি না বলতে নেই। বলতে হয় দেখছি। তাতে উলটোদিকের মানুষটা কখনও রেগে যায় না। আবার কোনও কিছু না করেও পরে বলে দেওয়া যায়, চেষ্টা করেছিলাম, হল না।
তপন বললেন, “খিদিরপুরের মুসলমান, ভাবতে পারছিস?”
রুমকি বলল, “ভাবতে পারছি বাবা, কিন্তু তুমি আর এসব নিয়ে ভেবো না। ডাক্তার আঙ্কেলকে ফোন কর, তোমার প্রেশার মাপা দরকার।”
তপন জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “কাউকে ফোন করতে হবে না। আমি ঠিক আছি। পিনাকের ছেলে, পুনেতে ছিল যে, আমেরিকাতে আছে এখন, সব ঠিক করে রেখেছিলাম জানিস…”
তপনের গলা ধরে এল।
আদিত্য রুমকির দিকে তাকাল, “আমি অফিস যাই? ছুটিটা ক্যানসেল করা যাবে। ফিরে এসে নাহয়…”
রুমকি আগুনে চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “একদিন না গেলে কিচ্ছু হবে না। বোসো চুপচাপ। আমি একা পারব সব সামলাতে?”
তপন বললেন, “না না, তুই আদিত্যকে আটকে রেখেছিস কেন? আমি আছি তো। কেসটা তো যা হবার হয়েই গেল। ও অফিসে গেলে যাক।”
আদিত্য রুমকির দিকে আর তাকাল না। উঠে পড়ল।
রুমকি বলল, “ফোনের ব্যাপারটা দেখো।”
আদিত্য বেরোতে বেরোতে বলল, “হুঁ।”
গাড়ি বের করে আদিত্য সন্তর্পণে প্রথম গিয়ারে দিয়ে গাড়িটা এগোল। নতুন গাড়ি চালানো শেখার মজা হল সারাদিন গাড়ি চালাতে ইচ্ছা হয়। আবার মুহূর্তের ভুলে বড়ো বিপদ ঘটে যেতে পারে।
খানিকটা গিয়ে রাস্তার বাঁদিকে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে সুশোভনকে ফোন করল আদিত্য। একটা রিঙেই ফোন তুললেন সুশোভন। বললেন, “বল রে।”
আদিত্য বলল, “বলছি ভাই, শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। অবস্থা খুব খারাপ। ছেলেটার বাড়ি নিয়ে যেতে পারবি আমায়? তুই আর আমি গেলাম? কোনও প্রবলেম আছে?”
সুশোভন বললেন, “প্রবলেম কিছু নেই, কিন্তু গিয়ে কী করবি?”
আদিত্য বলল, “জাস্ট দেখে আসব। আমার বউ তো পাগল করে দিচ্ছে বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলাতে হবে, যদি কিছু ব্যবস্থা করা যায় ওখানে গিয়ে।”
সুশোভন বললেন, “তুই কোথায় আছিস বল।”
আদিত্য নিজের লোকেশন বলল।
সুশোভন বললেন, “ঠিক আছে, তুই ওদিকে রওনা দে, আমিও যাচ্ছি। ফোন করে নিস আমায়।”
আদিত্য বলল, “ওকে।”
##
সরু গলিটায় ঢুকে নাকে রুমাল চাপা দিল আদিত্য। অত্যন্ত নোংরা গলিটা।
সুশোভন বললেন, “তুই বলেই এলাম। নইলে এসব কেসে পুলিশ কখনও আসে না। সেই কেসটা মনে আছে তো?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ। তবে আমি তো কোনও ঝামেলা করতে আসিনি। জাস্ট কথা বলে চলে যাব।”
সুশোভন বাড়িটার সামনে দিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। আশেপাশের বাড়ি থেকে পুলিশের উর্দিতে থাকা সুশোভনকে সবাই কৌতূহলী চোখে দেখছিল। দরজা খুলল কিছুক্ষণ পরে। এক মহিলা দরজা খুললেন। সুশোভন বললেন, “রুবেলের কেউ হন আপনি?”
ভদ্রমহিলা তাদের দুজনকে আপাদমস্তক মেপে বললেন, “আম্মি, ক্যা চাহিয়ে?”
সুশোভন বললেন, “বাড়ির ভেতরে গিয়ে কথা বলা যাবে? উনি মেয়েটির জামাইবাবু।”
ভদ্রমহিলা দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন।
১০
ঝুমকির শেষরাতের দিকে ঘুম এসেছিল। তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা। উঠে দেখল তার দিকে রিন্টু তাকিয়ে আছে। সে জাগতেই রিন্টু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, “কি রে, ঠিক আছিস?”
ঝুমকি অবাক হল। এই রিন্টু আর রাতের রিন্টু তো এক নয়! এই রিন্টুকেই তো সে এতদিন চিনে এসেছিল! রাতে কী হয়ে গেছিল ছেলেটার?
ঝুমকি উঠে বসতে গিয়ে ককিয়ে উঠল। ব্যথা করছে। রিন্টু ব্যস্ত হল, “কী হচ্ছে?”
ঝুমকি উত্তর দিল না।
রিন্টু ঝুমকির হাত ধরে বলল, “কি রে, এখনও রাগ করে আছিস? আসলে কাল রাতে আমার যে কী হয়েছিল, চাচাতো দাদা বউদিরা এমন সব কথা বলল, আমার মাথাটা কেমন হয়ে গেছিল।”
ঝুমকি বলল, “ওরা বললে তুমি আমাকে মেরেও ফেলতে, তাই না?”
রিন্টু ঝুমকিকে জড়িয়ে ধরতে গেল, “এসব কথা বলিস না প্লিজ। আমি সেটা করতে পারি? তুই তো মেরা জান সে ভি প্যারি।”
ঝুমকি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “বাথরুম যাব।”
রিন্টু বলল, “বুরখাটা পরে নে। বাইরে চাচা আছে।”
ঝুমকি অবাক হয়ে বলল, “মানে? বোরখা পরে বাথরুম যেতে হবে নাকি?”
রিন্টু বলল, “হ্যাঁ, এরা একটু গোঁড়া, বুঝলি না? আমাদের বাড়িতে অত চাপ নেই।”
ঝুমকি রেগে গেল, “তুমি তো কালকে বললে আমাকে এসব আর পরাবে না।”
রিন্টু বলল, “তুই যদি হিন্দু বিয়ে করতিস, শাঁখা সিঁদুর পরতিস না? এগুলো তো রিচুয়ালস। আমাদের রিলিজিয়নে মেয়েরা বেআব্রু থাক সেটা যদি আমাদের বয়স্ক লোকেরা না চায়, তবে কি তারা খুব ভুল কিছু চায়? সব ধর্মেরই তো আলাদা আলাদা রিচুয়ালস আছে। তুই-ই বল, আমি মুসলিম হয়ে কি খুব বড়ো কোনও অপরাধ করে ফেলেছি?”
