তপনের চোখটা জ্বলে উঠল, “ও ঘরে যেতে হবে না। যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। ও মেয়ে আমার কাছে আজ থেকে মৃত।”
রুমকির মা কেঁদে উঠলেন।
৮
আব্দাল খাঁর নির্দেশে পথের পাশের নিকটবর্তী একমাত্র বড়ো সরাইখানায় নিয়ে যাওয়া হল রাধাকে। সরাইখানা মানে শুধু খাওয়াদাওয়ার জায়গা নয়, এখানে নৃত্য এবং গীতে আগত পথযাত্রীদের মনোরঞ্জন করা হয়।
মূলত মুসলমান সৈনিক এবং সেনানায়করা এ সরাইখানায় বেশি আসেন। সন্ধের পর থেকে আশরফির আশকারায় গানবাজনায় এ চত্বর রমরমিয়ে চলে।
দ্বিপ্রহর। বাইজি মনোয়ারা নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, এমন সময় একজন দাসী এসে উপস্থিত হল, “মা জি, জনাব আব্দাল খাঁ আপনার কাছে একটি পত্র পাঠিয়েছেন।”
মনোয়ারা বিরক্ত গলায় বললেন, “একটু বিশ্রাম করারও ফুরসত পাই না। কী পত্র পাঠিয়েছে, দে দেখি।”
দাসী ইতস্তত করে বলল, “আজ্ঞে, শুধু পত্র পাঠাননি, তার সঙ্গে একজনকে পাঠিয়েছেনও বটে।”
মনোয়ারা বললেন, “কাকে পাঠিয়েছেন?”
দাসী বাইরে থেকে রাধাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল।
কেঁদে কেঁদে রাধার চোখ, নাক, মুখ ফুলে গেছে। মনোয়ারা অবাক চোখে দাসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ কে?”
দাসী বলল, “পত্রে সব লেখা আছে সম্ভবত।”
মনোয়ারা বললেন, “পত্র আমি পড়তে পারি নাকি? আজমলকে ডেকে নিয়ে আয়। উফ, কী সব ঝামেলা যে কপালে এসে জোটে আল্লাই জানেন।”
দাসী ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গিয়ে একজন ষোড়শবর্ষীয় ছেলেকে নিয়ে এল। মনোয়ারা বললেন, “ও আজমল, কী লিখেছেন আব্দাল খান একটু পড়ে দাও তো শুনি।”
আজমল দাসীর হাত থেকে পত্রটা নিয়ে পড়ে রাধার দিকে তাকাল। রাধা তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আজমল মনোয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ্ঞে এই মেয়েটিকে আশ্রয় দিতে বলেছেন। বলেছেন আপাতত আপনার কাছে রাখতে, উনি বাড়ি যাবার সময় নিজের মেয়ের খেলার সঙ্গিনী হিসেবে এই মেয়েটিকে নিয়ে যাবেন।”
মনোয়ারা রাগি চোখে দাসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখেছিস? আমাদের কী ভাবে এরা? আমাদের কি কাজবাজ নেই?”
দাসী বলল, “অপরাধ মার্জনা করবেন মা জি, কিন্তু আব্দাল খাঁর কথা না শুনলে আমাদের এখানে শান্তিতে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।”
মনোয়ারার চোখ একটু জ্বলে শান্ত হয়ে গেল, “মেয়েটাকে নিয়ে যা। খেতে-টেতে দে। আর দেখিস, কেউ যেন মেয়েটার খবর না পায়, সেপাইদের এই কচি মেয়েদের প্রতিই ঝোঁক বেশি থাকে। ইবলিশের বাচ্চা যতসব।”
দাসী রাধার হাত ধরে বেরিয়ে গেল।
মনোয়ারা আজমলকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন, বললেন, “খবর এসেছে কিছু?”
আজমল বলল, “হ্যাঁ, আজকেই।”
মনোয়ারা খুশি হলেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ব্যবস্থা করো।”
আজমল বেরিয়ে গেল।
#
রাত ঘনিয়েছে। আব্দাল খান তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সরাইখানায় এসেছেন। বিশেষ মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে তাদের জন্য। সৈনিকদের মন পালাই পালাই করলে প্রায়ই এরকম জলসার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
সরাইখানার নাচঘরে প্রশস্ত পরিসরে তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মনোয়ারা বেগম স্বয়ং আজ নৃত্য পরিবেশন করবেন আব্দাল খানের সম্মানার্থে।
সুরা পরিবেশন হচ্ছে, তার সঙ্গে বিভিন্ন সুস্বাদু খাদ্যেরও আয়োজন হয়েছে।
তবলচিরা তবলায় বোল তুলছেন, খানিকক্ষণ পরেই মনোয়ারা বেগম প্রবেশ করবেন। একজন চতুর্দশবর্ষীয়া কন্যা এসে মাননীয় অতিথিদের হাতে বিভিন্ন সুগন্ধী ফুল দিয়ে গেল। আব্দাল খান উশখুশ করছেন। ঘরবাড়ি থেকে এত দূরে এসে শুধু নৃত্যগীতে মন ভরে না। মনোয়ারা বেগমের মতো একজন রাত্রিসঙ্গিনী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মনের মধ্যে চলাচল করছে।
এর আগে যেবার মনোয়ারা তাঁর সঙ্গিনী হয়েছিলেন, সে রাতের কথা ভাবতে আব্দাল উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। অধৈর্য গলায় বললেন, “বেগম এলেন?”
তবলার শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। নৃত্যকক্ষে প্রবেশ করলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মনোয়ারা বেগম। সুরার ঘোরে আব্দাল খান উত্তেজিত হয়ে উঠে বসলেন, কোমরবন্ধনী থেকে আশরফি ছুড়ে মারলেন মনোয়ারার উদ্দেশে। মনোয়ারা নৃত্য শুরু করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মোহময়ী নৃত্যকলায় নাচঘর যেন গভীর কোন ঘুম থেকে জেগে উঠল।
তবলার লয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনোয়ারার শরীরী বিভঙ্গ দর্শকদের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাতে শুরু করল। আব্দাল খান সুরায় নিমজ্জিত হতে হতে মনোয়ারাকে পাওয়ার অভিপ্রায়ে অস্থির হয়ে উঠতে লাগলেন।
ঠিক এই সময় সবাইকে চমকে দিয়ে নাচঘরে প্রবেশ করল শের শাহ সুরির গোপন ঘাতক বাহিনী। আব্দাল খান প্রস্তুতির সামান্যতম সময়টুকু পেলেন না। মিনিট দশেকের মধ্যে প্রায় বিনা যুদ্ধে আবদাল খান এবং তার শাগরেদদের রক্তে ভেসে উঠল সরাইখানার নাচঘর।
প্রায় নিঃশব্দে এবং সুকৌশলে সেনাছাউনির দখল নিল শের শাহ সুরির সেনাবাহিনী।
আর এই সময় সরাইখানার পিছনের দরজা দিয়ে তার ঘোড়ায় করে রাধাকে নিয়ে আজমল পালিয়ে গেল।
৯
“অনার কিলিং বস্তুটাকে একটা সময় ঘেন্না করতাম। এখন বুঝি কোন পরিস্থিতিতে গিয়ে পরিবারের লোক এই সিদ্ধান্ত নেয়।”
গম্ভীর মুখে কথাটা বললেন তপন। আদিত্য চমকে শ্বশুরের দিকে তাকাল। খবরটা পাবার পর থেকে তপন গুম হয়ে গেছিলেন। এতক্ষণ পরে এই কথাটা বললেন। মিনু শাড়িতে মুখ চাপা দিয়ে কাঁদছিলেন।
