বিকেলবেলা। আব্দাল খান অন্যমনস্ক ভাবে বিমর্ষ মুখে বসে ছিলেন, এমন সময় তাঁবুর বাইরে হইহই শব্দ শোনা গেল। আব্দাল খান শঙ্কিত হলেন। আবার কোনও বিদ্রোহের ইঙ্গিত দেখা দিল নাকি?
তড়িঘড়ি উঠে আব্দাল বাইরে গিয়ে দেখলেন চার-পাঁচজন সৈনিক একজনকে ঘিরে ধরে আছে। একটি কন্যা ভয়ার্ত চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে।
আব্দাল এগিয়ে গিয়ে তাঁর সৈনিকদের জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে? কে এ?”
সৈনিকরা জানাল এই লোকটি এই মেয়েটিকে নিয়ে যাচ্ছিল। তারা লোকটিকে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করায় লোকটা পালাতে যায়। তাকে ধরে সেনা ছাউনিতে নিয়ে আসা হয়েছে।
ধৃত সৈনিকের সঙ্গে আমাদের পূর্বে পরিচয় হয়েছে। এই সেই জলিল খান।
আর মেয়েটি রাধা।
আব্দাল তলোয়ার বের করে জলিল খানের গলায় ধরে বললেন, “কোথায় যাচ্ছিলে বাপু?”
জলিল খান মাথা নিচু করে বললেন, “জনাব, আমি বাদশায়ে হিন্দুস্থানের অধীনস্থ একজন সামান্য সৈনিক মাত্র। দিল্লি যাচ্ছিলাম। বাদশার জন্য ভেট নিয়ে।”
আব্দাল অবাক হয়ে বললেন, “ভেট? কোথায় ভেট?”
জলিল খান হাত দিয়ে রাধার দিকে ইঙ্গিত করলেন।
আব্দাল চিন্তিত হলেন। এইটুকু মেয়েকে বাদশার কাছে নিয়ে যাবে? যদিও বাদশাহি হারেমে যে এই বয়সি মেয়ে থাকে না তা নয়, তবে এত কমবয়সি মেয়ে? আব্দাল জলিল খানের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, “মেয়েটিকে রেখে এখান থেকে বেরিয়ে যাও।”
জলিল খান তাঁর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন, “আপনি বুঝতে পারছেন তো জনাব আপনি কী বলছেন? আপনি স্বয়ং বাদশাহর ভেটকে লুঠ করতে চাইছেন।”
আব্দাল সৈনিকদের দিকে তাকালেন। তাদের দিকে গলা তুলে বললেন, “তোমরা কী বলো, এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে এই লোককে যেতে দেওয়া উচিত?”
সৈনিকদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
জলিল খান বললেন, “আমাকে যেতে দিন জনাব বাদশাহের ভেট নিয়ে। নইলে এর ফলাফল ভালো হবে না।”
আব্দাল জলিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আচ্ছা? এবার হুমকি দেওয়া হচ্ছে? তা তোমার এই চুরির কথা বাদশাহ জানেন? যদি তিনি রেগে গিয়ে উলটে তোমার গর্দান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন কী হবে?”
জলিল আব্দালের দিকে তাকিয়ে এবার রাগি গলায় বললেন, “আমায় যেতে দিন, আমি আবার বলছি…”
জলিলের কথা শেষ হল না, আব্দালের তলোয়ার বের করে জলিলের গলা বরাবর চালিয়ে দিলেন।
বিস্মিত জলিল কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেলেন।
রাধা এমনিতেই কাঁদছিল, এই ঘটনা চোখের সামনে দেখে আর্তনাদ করে কাঁদতে শুরু করল।
আব্দাল তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে রাধার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “ভয় নেই, ভয় নেই, আমি বাজে লোক নই।”
রাধা আব্দালের কথা বুঝল না, আব্দালের মুখে জলিলের রক্ত দেখে আরও কেঁদে উঠল।
আব্দাল শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একজন সৈনিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেয়েটাকে আপাতত সরাইতে পাঠাও। এখানে তো রাখা সম্ভব নয়। পরে দেখা যাবে কী করা যায় এর সঙ্গে।”
৬
শেষ মুহূর্তে প্ল্যান চেঞ্জ হয়েছে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল ট্রেনে যাওয়া হবে। কিন্তু রিন্টুর কী মনে হল, সে পাড়ার আসলামের থেকে গাড়ি বুক করল।
বাড়ি থেকে টিফিনকারিতে খাবার নেওয়া হয়েছে। রিন্টুর মা ঝুমকির জন্য বোরখা বের করে দিয়েছেন। সদ্য কেনা। সেটা পরার পরে ঝুমকির ভীষণ গরম লাগছিল।
রিন্টু ব্যাপারটা বুঝেছে। বলল, “একটু ম্যানেজ করে নে। কলকাতা পেরিয়ে গেলে বোরখাটা খুলে ফেলিস।”
ঝুমকি কোনও কথা বলেনি। চুপচাপ বসে ছিল।
ডানকুনি টোল পেরোলে প্রথম মুখ খুলল সে, “তোমার আসল নাম কী?”
রিন্টু বলল, “রুবেল খান। বাজে নাম, না?”
রিন্টু ঝুমকির হাতে হাত রাখল।
বাইরে ঝড়ের গতিতে গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে। ঝুমকি বলল, “তুমি কি আমাকে কনভার্ট করবে?”
রিন্টু জোরে হেসে উঠল, “ধুস, কেন কনভার্ট করতে যাব। তুই তোর মতো করে থাকবি। আর শোন, তোর কাছে এখনও সময় আছে। তুই যদি মনে করিস এই বিয়েটায় থাকবি না, আমি তোকে বাধা দেব না। বিলিভ মি, আমার মাথায় এই চিন্তাটা কোনও দিন আসেইনি।”
ঝুমকি বলল, “কোন চিন্তা? ধর্ম নিয়ে?”
রিন্টু বলল, “অবভিয়াসলি।”
ঝুমকি বলল, “আমার মাথাতেও আসেনি। কিন্তু প্রথমে বলোনি তার মানে তোমার সাবকনশাস মাইন্ডে কোথাও একটা ছিল যে তুমি মুসলমান জানলে আমি তোমাকে বিয়ে করব না, ঠিক না?”
রিন্টু ঝুমকির হাতে হালকা চাপ দিয়ে বলল, “তুই ডিসিশন নে। এখনও সময় আছে। বাড়ি যাবি?”
ঝুমকি বলল, “চিঠি দিয়ে এসেছি। এখন কোন মুখে বাড়ি যাব?”
রিন্টু বলল, “বলবি মজা করছিলি। বল, বাড়ি যাবি?”
ঝুমকি বলল, “না। আমার ফেরার আর কোনও পথ নেই।”
রিন্টু আর কিছু বলল না।
শক্তিগড়ে পৌঁছল গাড়ি। রিন্টু নেমে মুড়ি নিল।
ঝুমকি বলল, “কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
রিন্টু ঝুমকির দিকে মুড়ির ঠোঙা এগিয়ে দিয়ে বলল, “চাচার বাড়ি আছে ধানবাদে। আজ রাতটা ওখানে থাকব। কাল ট্রেন ধরব ধানবাদ থেকে। তুই একটু ঘুমিয়ে নে পারলে।”
ঝুমকি ঠোঙা নিল না। বলল, “আমার খিদে নেই।”
রিন্টু বলল, “খেয়ে নে। রাগ করে থাকিস না।”
ঝুমকি বলল, “আমি রাগ করিনি। ডিস্টার্বড আছি একটু। তুমি এখন আমাকে ঘাঁটিয়ো না দয়া করে।”
রিন্টু বলল, “ঠিক আছে।”
