আদিত্য বলল, “কী হয়েছে? প্রবলেম কী হল?”
রুমকি ঝুমকির চিঠিটা আদিত্যকে দিল।
চিঠিতে লেখা, “আমি বিয়ে করছি মা। আমার সঙ্গে কোনও দিন আর যোগাযোগ রেখো না। জানি আমি খুব খারাপ।”
আদিত্য চিঠিটা পড়ে অবাক চোখে ঘরের সবার দিকে তাকাল। শ্বশুরমশাই তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী করব?”
আদিত্য রুমকির দিকে তাকাল। রুমকি সম্ভবত কেঁদেছে। চোখ ফুলে গেছে। কাঁদলে ওর চোখ ফুলে যায়।
আদিত্য বলল, “ফোন করেছিল?”
রুমকি বলল, “ফোন অফ। তুমি তোমার ওই বন্ধুকে বলো না, যদি ট্র্যাক করা যায়।”
আদিত্য বলল, “দেখছি।”
আদিত্যর শ্বশুর তপনবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কার না কার সঙ্গে, কোন জাত, কী করে, কিছুই তো জানি না। রুমকিকে পর্যন্ত কাল অবধি কোনও হিন্টস দেয়নি।”
রুমকি বলল, “সব রেখে গেছে জানো তো, শুধু সার্টিফিকেটগুলো নিয়ে গেছে। ঝুমকির এত বুদ্ধি হতে পারে না।”
তপন বললেন, “আমি বিকাশকে আসতে বলেছি।”
আদিত্যর শাশুড়ি মিনু এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। মিনু কোনও দিনও বেশি কথা বলেন না। স্বামীর আলোতেই বরাবর আলোকিত। আদিত্যকে বললেন, “চা খাবে বাবা?”
আদিত্য বলল, “না না। এখন না।”
তপন রাগি গলায় বললেন, “ব্যানার্জি বংশের একটা সম্মান ছিল। কী মুখ দেখাব!”
রুমকি বলল, “আহ বাবা, আগে থেকে এত ভেবে রাখছ কেন, দ্যাখো না কী হয় আগে।”
তপন বললেন, “আর কী ভাবব, অজাত কুজাত, কোথাকার কোন মুচি মেথর জোটাবে কে জানে, আর…”
কলিং বেল বাজল। আদিত্য উঠল, “আমি দেখছি।”
আদিত্য দরজা খুলল। বিকাশ এসেছেন।
ঘরে ঢুকে সোফায় বসলেন। তপন বললেন, “কী করি বল আগে।”
বিকাশের গোঁফ দেখার মতো। বেশ মোটা গোঁফ। হরলিক্সের কাচের মতো মোটা কাচের ফ্রেমের চশমা। বিয়ের আগে অনেকবার আদিত্যর অফিসে আদিত্যর ঠিকুজি কুষ্ঠি জানতে গেছিলেন। তপনই পাঠাতেন। আদিত্যর বিকাশকে পোষায় না। শ্বশুরের বন্ধু বলে সহ্য করতে হয়।
বিকাশ বললেন, “গয়নাগাঁটি কিছু নেয়নি তো?”
তপন একটু আশান্বিত হলেন, “না। তা নেয়নি।”
বিকাশ বললেন, “লাভ জেহাদের নাম শুনেছিস?”
তপন গম্ভীর হলেন, “তা শুনিনি আবার। কান পাতলেই তো আজকাল শোনা যায়।”
বিকাশ একবার আদিত্য আর-একবার তপনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ধাঁচটা চেনা চেনা। আমার এক শালির মেয়েকেও এভাবেই…”
মিনু বিহ্বল চোখে রুমকির দিকে তাকালেন।
তপন বললেন, “তাহলে আজ থেকে আমার এক মেয়ে মরে গেছে জানতে হবে।”
বিকাশ বললেন, “ওদের ব্রাহ্মণ মেয়ে পছন্দ। টার্গেট করেই করে এগুলো। ভালোবাসা-টাসা সব ঢপের কেত্তন। কচি মেয়েদের মাথা খেতে কী লাগে? এদিক ওদিক বুঝিয়ে নিতে পারলেই হল।”
রুমকি রেগে গেল, “কী সব বলছেন উলটোপালটা কথা! আমাদের ঝুমকি কি সেরকম মেয়ে নাকি? একটা বলে দিতে পারলেই হল?”
বিকাশ রুমকির দিকে তাকালেন, “আমি কিছু বলছি না মা। পরিবেশ পরিস্থিতি বলছে। মেয়ের বাড়ির লোক কিছু জানতে পারছে না…”
আদিত্য বাধা দিল, “দেখুন এটা কোনও কথা না। কন্সপিরেসি থিওরি নিয়ে ভাবলে চলবে না আমাদের।”
তপন কঠিন চোখে আদিত্যর দিকে তাকালেন, “তা কী নিয়ে ভাবলে চলবে? মেয়েটার তো কোনও খোঁজ পাচ্ছি না!”
আদিত্য বলল, “ধর্ম বা জাতপাত নিয়ে এই সময়ে কি ভেবে সত্যিই কোনও লাভ আছে? আমার তো মনে হয় আমাদের ভয়টা অন্য দিকে হওয়া উচিত।”
তপন বললেন, “কোন দিকে?”
আদিত্য বলল, “নারী পাচার চক্র যেভাবে সক্রিয়…” আদিত্য একটু ইতস্তত করল।
বিকাশ হাত নাড়লেন, “ঝুমকি তো অশিক্ষিত নয়! একেবারে যে সে এই ধরনের চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, এসব নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত নই।”
আদিত্য তপনের দিকে তাকাল, “দেখুন, আমার মনে হয় আমাদের একটা মিসিং ডায়েরি করা উচিত। লালবাজারে আমার এক বন্ধু আছে, আপনি বললে ফোন করতে পারি। শিক্ষিত অশিক্ষিত এসব সবসময়ে ভ্যালিড হয় না। কার মনে কী অভিসন্ধি থাকে তা প্রথম প্রথম সেভাবে বোঝা যায় না।”
তপন বিকাশের দিকে তাকালেন। সম্ভবত বিকাশ যা বলবেন তাতেই শিলমোহর দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁর। বিকাশ বললেন, “কী বলবে তা তো জানি, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজের অমতে বিয়ে করলে পুলিশের কিছু করার আছে বলে তো মনে হয় না। দ্যাখো ফোন করে।”
আদিত্য ফোনটা বের করল।
৫
সৈনিকদের তাঁবু খাটানো হয়েছে গঙ্গার পাশে।
প্রবল গ্রীষ্ম। সৈনিকরা এখানে তাঁবু খাটিয়ে কয়েক দিন থাকবে। দিনে প্রবল তাপপ্রবাহ থাকলেও রাতের দিকে গঙ্গার হাওয়ায় প্রাণ জুড়ায়।
সৈন্যদলের প্রধান আব্দাল খান বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। দিল্লির হালচাল ভালো না। কামরান মির্জা (বাদশা হুমায়ুনের ভাই) তাঁকে তৈরি থাকতে বলেছেন। যে-কোনো সময় বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে। কিন্তু আব্দাল খানের এখন যুদ্ধ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ হবে আর তাঁদের মতো কিছু নিরীহ মানুষের প্রাণ যাবে, এই সারসত্য আব্দাল খান অনেক আগেই অনুধাবন করেছেন।
তাঁবু থাকলেও এখানে সৈনিকদের মনোরঞ্জনদের জন্য প্রায় প্রতি রাতেই সরাইখানা থেকে নর্তকী নিয়ে আসা হয়। সৈনিকদের মধ্যে মল্লযুদ্ধে যে জয়ী হয়, নর্তকীর সঙ্গে সে রাত কাটানোর সুযোগ পায়।
এভাবে সৈনিকদের মনোবল খানিকটা হলেও ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে আব্দাল খান বুঝতে পারছেন, ভেতরে ভেতরে মনোবল ভাঙছে। এভাবে দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা স্বাস্থ্যকর নয়। প্রায়ই বিদ্রোহ তৈরি হয়। আব্দাল খান অনেক কষ্টে সেগুলো দমন করেন।
