আদিত্য বলল, “না না, তুমি না থাকলে আমি বোতল খুলি না তো! জানো না?”
রুমকি মুখ বাঁকাল, “হ্যাঁ, ওই আনন্দেই আছি আর কি।”
ঝুমকি প্রসাদ নিয়ে এসেছিল। আদিত্য খেতে খেতেই বলল, “বাবা মাকে দেখছি না?”
রুমকি বলল, “আরও কী সব লোক এসেছে, বাইরে আছে। তুমি যাবার সময় দেখা করে যেয়ো, তাহলেই হবে।”
আদিত্য খেয়ে শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করে বেরোল।
বেশি রাত করে সে শহরের রাস্তায় গাড়ি চালাতে চায় না।
#
পরদিন অফিসে ছিল আদিত্য। দুপুর দেড়টা নাগাদ দেখল রুমকি ফোন করছে। বিরক্ত হল খানিকটা। মেয়েটা অফিস আওয়ারস বুঝতে পারে না। ধরল, “বলো, আবার কী হল।”
রুমকি ওপাশ থেকে ধরা গলায় বলল, “সর্বনাশ হয়েছে দিত্য। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো এ বাড়ি এসো।”
৩
সরু গলি। গাড়িটা দাঁড় করানোর পর অনেকটা হাঁটতে হয়।
ঝুমকি গাড়ি থেকে নামল। রিন্টু বলল, “চ।”
ঝুমকি ইতস্তত করে বলল, “তোমার বাড়ি থেকে ঝামেলা করবে না তো?”
রিন্টু ঝুমকির হাত ধরল, “ধুস। চ তো।”
ঝুমকি হাত ছাড়িয়ে নিল না। তার ভালো লাগছিল সব কিছুই।
সকাল থেকে তাকে অনেক অভিনয় করতে হয়েছে। গয়নাগাঁটি যা ছিল সব খুলে খাটের ওপর রেখে ক্লাস টেন আর টুয়েলভের সব সার্টিফিকেট, ভোটার আই কার্ড, আধার কার্ড কলেজের ব্যাগে নিয়ে নিয়েছে। মাসের হাতখরচটা নিয়েছে। রিন্টু বলেছিল কোনও জামাকাপড় না নিতে। সব কিনে নেওয়া যাবে। ঝুমকি কিছুই নেয়নি। একটা চিঠি রেখে এসেছে শুধু, “আমি বিয়ে করছি মা। আমার সঙ্গে কোনও দিন আর যোগাযোগ রেখো না। জানি আমি খুব খারাপ।” ব্যস, এটুকুই।
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যেভাবে রোজ তাড়াহুড়ো করে খায় সেভাবেই খেয়েছে। রুমকি ঘুমোচ্ছিল। আগের দিন পুজো করে ক্লান্ত ছিল। ঝুমকি রুমকির ঘরে গিয়ে ওকে আদর করে এসেছে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসরাস্তায় রিন্টু একটা গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নিজেই চালিয়ে এসেছিল। ঝুমকি সে গাড়িতে উঠতেই রিন্টু গাড়ি স্টার্ট দিয়েছিল। সারা রাস্তা খুব বেশি কথা হয়নি। ফোন বাজছিল তার মাঝরাস্তায়। ঝুমকি দেখল রুমকি ফোন করছে। বুঝেছিল চিঠিটা হয়তো রুমকিই প্রথম দেখেছে। ফোনটা কেটে মোবাইলটা অফ করে দিয়েছিল।
গলিতে হাঁটতে হাঁটতে ঝুমকি দেখল পাড়াটা খুব একটা পরিষ্কার না। সে নাক সিঁটকাল।
রিন্টু সেটা দেখল, বলল, “চিন্তা করিস না। খুব শিগগিরি আমরা শিয়ালদা সাইডে চলে যাব। খিদিরপুর আমারও পছন্দ না।”
ঝুমকির একটু ভয় ভয় করছিল। সে রিন্টুর হাত জোরে চেপে ধরল।
খানিকক্ষণ পরে তারা রিন্টুদের বাড়িতে পৌঁছল। রিন্টু দরজা ধাক্কাল। একজন মহিলা দরজা খুলল।
তাদের দেখে অবাক হয়ে তাকাল। রিন্টু বলল, “নিয়ে এসেছি।”
মহিলা দরজা ছেড়ে দাঁড়াল।
বাড়িটা বেশ বড়। গলির মধ্যে যে এত বড়ো বাড়ি হতে পারে ঝুমকির ধারণা ছিল না।
রিন্টু ঝুমকিকে একটা ঘরে বসিয়ে ফ্যান চালিয়ে দিয়ে বলল, “বস। মাকে নিয়ে আসি।”
ঝুমকি ঘরটা দেখল। বেশ বড়ো একটা খাট। দেওয়ালে একটা বড়ো ক্যালেন্ডার।
তার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। কেন হচ্ছিল সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
খানিকক্ষণ পরেই সালোয়ার পরা এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ঘরে ঢুকলেন। ঝুমকি বুঝল ইনিই রিন্টুর মা।
সে উঠে প্রণাম করতে গেল। মহিলা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “জিতি রহো।” রিন্টু ঘরে ঢুকেছিল। মহিলা ওকে বললেন, “খানা খাকে আয়া হ্যায়?”
রিন্টু বলল, “নেহি।”
মহিলা রাগি চোখে ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঠহরো।”
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা।
ঝুমকি ভাবছিল কথাটা। শেষমেশ বলেই ফেলল, “তোমাদের বাড়িটা কেমন মুসলমান মুসলমান বাড়ি। এরকম মক্কা শরিফের ফটো দেওয়া ক্যালেন্ডার ঝুলিয়েছ কেন দেওয়ালে?”
রিন্টু খাটে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল, “মুসলমানদের বাড়ি মুসলমানদের মতোই তো হবে। কেমন আশা করছিস?”
ঝুমকি হাঁ করে রিন্টুর দিকে তাকাল। বলল, “মানে?”
রিন্টু বলল, “কেন তুই জানিস না?”
ঝুমকি মাথা নাড়ল দুদিকে। “না তো।”
রিন্টু বলল, “তাতে কি কোনও সমস্যা আছে তোর? আমি কিন্তু কোনও জোর করছি না। তুই চাইলে আমি তোকে বাড়ি দিয়ে আসতে পারি।”
ঝুমকি একটা চেয়ার টেনে বসল। তার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না সবটা।
সে বলল, “আমাকে তো কোনও দিন বলোনি!”
রিন্টু বলল, “এটা কি খুব ইম্পরট্যান্ট কিছু ব্যাপার? জানতাম না তো!”
ঝুমকি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল এমন সময় রিন্টুর মা দুটো থালা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। খাটের ওপর রেখে তার দিকে তাকিয়ে আধভাঙা বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বললেন, খাওয়া হয়ে গেলে থালা দুটো ঘরের বাইরে রেখে দিতে।
রুটি মাংস দিয়ে গেছেন ভদ্রমহিলা। রিন্টু বলল, “খেয়ে নে। খেয়ে বাড়িতে ফোন কর। চিন্তা করবে সব।”
ঝুমকি বলল, “কীসের মাংস?”
রিন্টু বলল, “বিফ। খাস তো তুই। আসমাতে সেই মনে নেই?”
ঝুমকির খিদে পেয়েছিল। সে খাওয়া শুরু করল।
রিন্টুও খাচ্ছিল। বলল, “আজ রাতে ট্রেনে উঠব। হানিমুন সেরে আসি। তারপর দেখা যাবে। তোর বাড়ি থেকে কদিন আর ঝামেলা করবে। ঠিকই মেনে নেবে।”
ঝুমকি কিছু বলছিল না। চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিল।
তার হঠাৎ করে খুব কান্না পাচ্ছিল।
কেন পাচ্ছিল নিজেই বুঝতে পারছিল না।
৪
তড়িঘড়ি শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে আদিত্য বুঝতে পারল সমস্যা গুরুতর। ড্রয়িং রুমে গম্ভীর মুখে শ্বশুর, শাশুড়ি আর রুমকি বসে আছে।
