জলিল সবখানি খাবার খেয়ে গাছের তলাতেই নিদ্রা গেলেন।
বিকেল নাগাদ গ্রামে খবর হলে গ্রামের সবাই দল বেঁধে চণ্ডীমণ্ডপে এসে হাজির হল।
হরিকে বিদ্যাচরণ ডেকে বললেন, “ছোঁয়াছুয়ি হয়নি তো ঠাকুর?”
হরি একগাল হেসে মাথা নাড়লেন, “কী যে বলেন!”
বিদ্যাচরণ বললেন, “এ পেয়াদা কোত্থেকে এয়েচে? এখেনেই থাকবে?”
হরি জলিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভাষা তো কিছুই বুঝি না। তবে থাকবে না মনে হয়। রাতেই দেখবেন চলে যাবে।”
বিদ্যাচরণ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ভারী অলুক্ষুনে হে হরি। ম্লেচ্ছ পেয়াদা ভারী অলুক্ষুনে। দেখো সাবধানে।”
সবাই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে জলিল খানকে দেখতে লাগল।
সন্ধে নাগাদ জলিল উঠে কলসির বাকি জলটুকু খেয়ে ঘোড়ায় উঠে গ্রাম ত্যাগ করলেন।
সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। বিদ্যাচরণের নেতৃত্বে চণ্ডীমণ্ডপসহ গোটা চত্বরটা গোবর (গোবর দিয়ে নিকোনো হয়, ধোয়া যায় না।) এবং গঙ্গাজল দিয়ে ধোয়া হল।
সন্ধ্যারতি হবার পরে সব গ্রামবাসী যখন ঘরে ফিরে গেল, হরি দেখলেন জলিল ফিরে এসেছেন।
তিনি জলিলের কলসিতে জল ভরে দিলেন।
কাত্যায়নীর রক্তচক্ষু আরও একবার উপেক্ষা করে জলিলকে খেতে দিলেন। জলিল খেয়েদেয়ে গাছতলাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরের দিন সকালে হরি ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলেন, রাধা এবং জলিল, কেউই নেই।
২ ।। বর্তমান সময়।।
আদিত্য গাড়ি বের করছিল। সবে গাড়ি চালানো শিখে নতুন গাড়িটা কিনেছে। সাবধানে চালাতে হয়। এখনও মাঝে মাঝে ব্রেক আর অ্যাক্সিলারেটর গুলিয়ে ফ্যালে।
রুমকি দরজায় তালা দিয়ে গাড়িতে উঠল। হালকা গলায় বলল, “দেখো, ঠিকঠাক পৌঁছোতে পারবে তো?”
আদিত্য বলল, “দেখাই যাক।”
গাড়ি চালানোর সময় কোনও কথা বলে না আদিত্য।
মাথা ঠান্ডা করে চালাতে হয়। অন্য কোনও দিকে মন দিলে হবে না।
শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। কলকাতার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সাবধানে না চালালে চিত্তির।
রুমকির ফোনে ফোন আসছিল বাড়ি থেকে। মাঝে মাঝেই ফোন বের করে রুমকি “হ্যাঁ এই তো রুবি” “এই তো সাইন্স সিটি” করে যাচ্ছে।
ঘণ্টাখানেক লাগল শ্বশুরবাড়ি পৌঁছোতে।
বাড়িতে পুজো হচ্ছে। রুমকি ঢুকেই ঠাকুরঘরে চলে গেল। রুমকির বাবা পুজো করছেন।
আদিত্য বসার ঘরে বসল। ঝুমকি বসে বসে মোবাইল ঘাঁটছে। অন্যান্য দিন তাকে দেখলেই ঝুমকি একগাদা প্রশ্ন করে। আজ শুধু হাসল।
আদিত্য বলল, “কী ব্যাপার রে? মুড অফ কেন? পুজোর ওখানেও যাসনি!”
ঝুমকি বলল, “কিছু না দা, শরীরটা একটু খারাপ, এই যা।”
আদিত্য বুঝল পিরিয়ডস সংক্রান্ত কোনও ব্যাপার হবে হয়তো। সে আর কিছু বলল না।
ঝুমকি বলল, “তোমরা নৈনিতাল কবে যাচ্ছ যেন?”
আদিত্য বলল, “কেন? তোর দিদিয়া তোকে বলেনি?”
ঝুমকি বলল, “দিদিয়া তো সময়ই পায় না আজকাল কথা বলতে।”
আদিত্য বলল, “তা ঠিক। তোর দিদিয়া সর্বক্ষণ বই নিয়ে ব্যস্ত। ইউনিভার্সিটির এক্সামটা শেষ হলে বাঁচি।”
ঝুমকি বলল, “আর আমি? ফার্স্ট ইয়ারের যে কী চাপ তা আর তোমাকে কী বোঝাব! মাঝে মাঝে মনে হয় গলাজলে বসে থাকি।”
আদিত্য হাসল। বলল, “বিয়ে করে নে তাহলে। পড়াশোনা করতে হবে না।”
ঝুমকি ছদ্ম আগ্রহী গলায় বলল, “হাতে ভালো পাত্র আছে নাকি?”
আদিত্য বলল, “আছে তো। বলব কথা?”
ঝুমকি বলল, “প্লিজ বলো। দেখতে কেমন? হৃতিক পুরো?”
আদিত্য বলল, “একদম। রূপে কার্তিক, গুণে কী যেন বলে…”
ঝুমকি ছদ্ম রাগে বলল, “হুঁ, সেই তো হুঁকোমুখো হ্যাংলা ধরে নিয়ে আসবে একটা।”
ঝুমকির মোবাইলে ঘন ঘন মেসেজ টোন বাজছে।
আদিত্য বলল, “কে রে? প্রেম-ট্রেম করছিস নাকি?”
ঝুমকি একটু চমকাল, পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে বলল, “না না, ধুস, কী যে বলো।”
আদিত্য বলল, “তবে?”
ঝুমকি বলল, “কলেজের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। সারাক্ষণ কিছু না কিছু আসছে।”
আদিত্য বলল, “ও। আমারও অনেকক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ চেক করা হয়নি বটে।”
আদিত্য মোবাইল বের করল। দুজনে বেশ কিছুক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পরে পুজো শেষে রুমকি বসার ঘরে এসে আদিত্যকে দেখে বলল, “এ কী! আবার মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তুমি? তোমার শালিকে নিয়ে গল্প তো করতে পারতে!”
আদিত্য বলল, “উনিও তো ওতেই ব্যস্ত।”
রুমকি ঝুমকির মোবাইলের দিকে দেখে রাগ করল, “দেখেছিস? আমি বাবাকে বারবার বারণ করলাম তোকে যেন স্মার্টফোন এখনই না কিনে দেয়, ঠিক কিনে দিল, না? এইজন্য আমি বাড়ির ব্যাপারে আজকাল আর কিছু বলি না। আমার কথা কেউ শোনেই না আজকাল!”
ঝুমকি বলল, “আমি একদম বেশি নেট করি না দিদিয়া, বিশ্বাস কর!”
রুমকি বলল, “যা ইচ্ছা কর। আমার কী!”
আদিত্য বলল, “বেরোব এখন?”
রুমকি বড়ো বড়ো চোখ করে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “এখনই যাবে? খাবে না?”
আদিত্য বলল, “প্রসাদ হয়েছে? আমাকে আবার কতটা ড্রাইভ করতে হবে!”
রুমকি বলল, “হবে না কেন! বসো। খেয়ে যাও। এই মেয়ে, যা ওর খিচুড়িটা নিয়ে আয় শিগগির।”
ঝুমকি উঠে ঘর থেকে বেরোলে রুমকি বলল, “দেখেছ? ঠিক মোবাইল দিয়ে দিল বাবা ওকে। কতবার বলেছি।”
আদিত্য বলল, “দিয়েছে ভালো করেছে। সব বন্ধুরা স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরবে আর তোমার বোন গরিবের কমদামি ফোন নিয়ে ঘুরবে? তুমিও যেমন।”
রুমকি মুখ ভার করল, “যাক গে, তুমি সাবধানে যাবে। আর শোনো, রাত্তিরে আবার বোতল খুলে বোসো না যেন।”
