-আপনার মধ্যে একটা সম্মোহনী শক্তি আছে দীপ্তবাবু, কথাও ভারী সুন্দর বলেন। আচ্ছা আরও বলুন তো, নিজের বাজারদরটা বুঝে নি।
-আমার কেসটা হালকা করে দিন কৌশিকবাবু, আপনাকে বুবকা টাকা খাইয়েছে না? কত টাকা খাইয়েছে, আপনি আমাকে বলুন।
-আমাকে আমার চাকরি টাকা খাওয়ায় দীপ্তবাবু, ওই ডিএ না পেয়ে পেয়ে যে মাইনেটা পাই, ওই টাকাই আমাকে খাওয়ায় দীপ্তবাবু। সে টাকাটার বেশি টাকা আপনি দিতে পারবেন না।
-আপনি বোকা কৌশিক, আপনি বোকা, আপনি একটি চার অক্ষরের বোকা। লাস ভেগাসে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলছেন, একের পর এক টাকা হারছেন তবু আপনি টাকা লাগাতে পিছপা নন, জানেন দীপ্ত ঠিক আছে আপনার সঙ্গে, ভাবতে পেরেছেন কোনও দিন? ভাবুন ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন। আপনার বস, তার তস্য বস, তার তস্য তস্য বস সবাই বিক্রি হয়ে যায়, আপনি তো কোন ছাড় কৌশিক, রেটটা বলুন। টাকাটা বলুন।
-অলকানন্দা সব জানিয়ে দিয়েছে আপনার ব্যাপারে দীপ্তবাবু। কেদার সিংও। শিলিগুড়ি এবং কলকাতা মিলিয়ে আপনার এসকর্ট সার্ভিসের চুয়ান্ন জন মহিলাকে উদ্ধার করে এনজিওর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কাস্টিং কাউচ করে, অভিনয় করার নাম করে আপনি মেয়েদের যে রাস্তায় নামিয়েছিলেন সেই পথটা আমরা কেটে দিয়েছি দীপ্তবাবু। আপনার খেলা শেষ।
-অলকানন্দা? শি ইজ আ বিচ! মাগিটাকে বরের মারের হাত থেকে বাঁচালাম আমি। শেষে এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা করল? হবেই তো, এরাই নিমকহারাম হবে, গলায় জুতো পিষে…
-আহ, দীপ্তবাবু, অনেক মাথা ঠান্ডা করে ছিলাম। এই চড়টা আপনার প্রাপ্য ছিল। ব্যথা লাগল? চিন্তা করবেন না, ধীরে ধীরে সেরে যাবে। চলি, কাল কোর্টে আপনাকে আমিই নিয়ে যাব। ভালো থাকবেন।
৩৬
-গুরু।
-বলো শুভদা।
-আমরা পথের লোক পথেই ফিরে এলাম।
-সেই। যা বলেছ।
-এই যে বৃষ্টি, এমন একটা রোম্যান্টিক দিন। আমরা কী করছি? রাস্তার ধারে, কেলিয়ে বসে থেকে মদ গিলছি। এটা কোনও লাইফ গুরু?
-চানাচুরটা না খেলে দাও শুভদা। কষ্টের টাকায় কেনা চানাচুর। নষ্ট কোরো না।
-খাব রে ভাই। আচ্ছা নে। তুই তো আজ শ্যুটিংয়েও গেলি না। আচ্ছা তোকে আমি তুই বলতাম না তুমি বলতাম?
-ও যা ইচ্ছা বলো তুমি। আমার কোনও চাপ নেই।
-চাপ নেই তো জানি। অত বড়ো সেলিব্রিটি তুই। রাস্তাঘাটে বেরোলে মেয়েরা তো পারলে চুমু অবধি খেয়ে নেয়। কী করছিস বল তো ভাই আমার? মাঝরাতে মদ খেয়ে পড়ে থাকলে চলে? একটা লক্ষ্মীমন্ত বউ আন, সংসার কর। আমার যখন বিয়ে হয়েছিল, জানিস এরকমই বৃষ্টি ছিল সেদিন। এমন বৃষ্টি যে আদ্ধেক লোকই আসতে পারেনি। অলকার ঠাকুমা বেঁচে ছিল তখন। আমাকে বলল, জামাই, বৃষ্টির দিনে বিয়ে শুভ লক্ষণ। টিনের চালে ফুলশয্যার মজা বোঝো জামাই? যেদিন ফুলশয্যা হল ভাই, বাড়ির সামনে হাঁটুজল জমে গেছে, আমি ঘর-টর পরিষ্কার করছি, অলকাও করছে, তারপর কখন যেন বাজ পড়ল। আর সে কী ভয়! আমার হাত ধরে বসে আছে। বলে তুমি আমাকে ছেড়ো না। আমি পড়লাম মহা ফ্যাসাদে। বউ এরকম ভয় পেলে কী করে হবে? একা গোটা সংসারটা ধরে রাখতে হবে তাকে। আমি যত বোঝাই সে তত আমার হাত চেপে ধরে, আর বৃষ্টিও হয়েছিল সেদিন। সঙ্গে বাজ। কী দিন ছিল রে ভাই, কী দিন ছিল, ভেসে গেল সব…
দুজনে চুপ করে বসে ছিল।
বুবকার গাড়ির সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়াল। শুভ বলল, “উফ, ইমোশনাল সময়গুলোতেই এই বেরসিক পুলিশগুলোকে আসতে হয়।”
কৌশিক জানলায় উঁকি মারলেন, “বুবকাবাবু, এবার তো সময় এসে গেছে। কাল তো আমাকে কোর্টে…”
বুবকা বলল, “বাইকটা কী করবেন?”
কৌশিক বললেন, “আপনি গাড়িটা নিয়ে এগোন, আমি বাইক নিয়ে পিছনে যাচ্ছি।”
বুবকা গাড়ি স্টার্ট দিল।
শুভ অবাক গলায় বলল, “গুরু, কোথায় যাচ্ছ?”
বুবকা বলল, “চুপ করে বসে থাকো না। থাকা যায় না?”
শুভ বলল, “ভালো লাগে না, এই পুলিশ যেদিন থেকে জীবনে এসেছে, একটু শান্তি নেই রে ভাই।”
বুবকা বলল, “শুভদা, অলকা এখন ফিরে এলে সংসার করবে?”
শুভ বলল, “কেউ ফিরে আসে না রে ভাই, আমি যা করেছি, আমাকে কেউ ক্ষমা করবে না।”
বুবকা বলল, “যদি ফিরে আসে? তোমাকে সিচুয়েশন দিলাম। তোমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তুমি কী করবে?”
শুভ বলল, “পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব, বলব সবই তো করেছ সেই আমাকে খাওয়ানোর জন্যই, আমরা যাতে ভালো থাকি তার জন্যই। দোষ ত্রুটি তো সবাই করে। আমি যদি কোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়ে আসতাম তুমি তো কিছুই বলতে না, আমি খুব ভুল করে ফেলেছি বউ, এই কান ধরলাম, আর কোনও দিন করব না, বিশ্বাস করো।”
বুবকার গাড়িটা বৈভবীর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বুবকা পকেট থেকে একটা চাবি বের করে দিয়ে বলল, “দরজাটা খোলো।”
শুভ বলল, “এ কোথায় নিয়ে এলি ভাই?”
বুবকা বলল, “যাও না। দরজাটা খোলো, আর এ নাও, টর্চটা নিয়ে যাও।”
বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল আবার। শুভ গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেটটা খুলে সদর দরজার তালাটা খুলল। কৌশিক বাইক নিয়ে চলে এসেছিলেন।
বুবকা বলল, “দাঁড়ান। আমরা একটু পরে যাই, নাহয় বৃষ্টিতে ভিজি কিছুক্ষণ। শুভদার শুভদৃষ্টি হবে আজকে অনেক দিন পরে, কাবাব মে হাড্ডি হবার দরকার নেই কোনও।”
কৌশিক অবাক গলায় বললেন, “আপনি এখানে রেখেছিলেন? ইলেক্ট্রিক পর্যন্ত নেই? খেত কী?”
