বুবকা বলল, “তোর মনে আছে দাদা ক্লাস টুয়েলভে আমি অঙ্কে টেস্টে ফেল করেছিলাম? আর তুই তারপর থেকে তিনমাস নিয়ম করে আমাকে অঙ্ক করাতে বসতি? কিছুতেই মাথায় ঢুকত না, আর তুই দিনের পর দিন ধৈর্য নিয়ে আমাকে বুঝিয়ে যেতিস। সেই তুই এত তাড়াতাড়ি এতটা চেঞ্জ হয়ে গেলি?”
তথাগত চুপ করে বসে রইল মাথা নিচু করে।
বুবকা বলল, “দুজন মানুষ ভালোবাসলে সবার এত সমস্যা কেন বল তো দাদা? বয়সটাই কি সব? এই যে বাবা মা দিনের পর দিন আলাদা ঘরে থাকে, একটা ঠান্ডা সম্পর্ক বয়ে চলে এল সারাটা জীবন, এটাই বা কেমন সম্পর্ক বল তো? একটা মানুষ কাকে ভালোবাসবে তাতে তাদের দুজন ছাড়া সবার এত মাথাব্যথা কেন হবে?”
তথাগত বলল, “আই অ্যাম সরি বুবকা, পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিস।”
বুবকা বলল, “ক্ষমা যার করার কথা ছিল, সে-ই তো নেই আর, আমি কী করব আর!”
কলিং বেল বাজল।
বুবকা দরজা খুলে দেখল কৌশিক এসেছেন।
কৌশিক ঘরে ঢুকে তথাগতকে দেখে বললেন, “ওহ, আমার মনে হয়েছিল আপনি এখানে আসবেন। আপনাদের জন্য একটা খবর আছে।”
তথাগত বলল, “কী?”
কৌশিক বললেন, “টিভিতে দেখাচ্ছে তো, টিভিটা চালান। দীপ্ত রায় কিছুক্ষণ আগে ওঁর অফিস থেকেই অ্যারেস্ট হয়েছেন। আপাতত পুলিশ কাস্টডিতে আছেন।”
বুবকা বলল, “কোন চার্জে?”
কৌশিক বললেন, “আপাতত বৈভবী এবং আগরওয়ালের মার্ডারের চার্জ আছে। অলকা দেবীকে খুঁজে পাওয়া গেলে দীপ্তর জন্য আরও বড়ো বাঁশ অপেক্ষা করছে। যাকে বলে আছোলা এক্কেবারে।”
বুবকা কৌশিকের দিকে তাকাল, “দীপ্ত তো সবার আগে মার আর দাদার নাম নেবে।”
কৌশিক বললেন, “স্বাভাবিক। ওর মতো হারামি মাল কী কী করতে পারে তা আমার থেকে ভালো আর কে জানতে পারে।”
বুবকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “মাকে এখন টানাহ্যাঁচড়া না করলেই ভালো হয় বোধহয়, দাদাকেও। আমি ওদের ক্ষমা করে দিয়েছি কৌশিকবাবু।”
তথাগত দুহাতে মুখ ঢাকল। কৌশিক বললেন, “সেটা হয়তো সম্ভব হবে না, তবে কেদার সিংয়ের সাক্ষ্যটা খুব ইম্পরট্যান্ট হবে, কারণ ব্যাটাকে দীপ্তই ইনভলভ করিয়েছিল। মালটাকে আমার গোপন ডেরায় রাখা আছে যাতে ওকে চাপ দিয়ে বয়ান চেঞ্জ না করানো যেতে পারে। আশা করা যায় এই ব্যাপারে দীপ্ত রায়ের খেলা এখানেই শেষ।”
বুবকা বলল, “শুভদাকে দেখলেন বাইরে?”
কৌশিক বললেন, “হ্যাঁ, নিচে এক ভদ্রলোক মাউথ অরগ্যান বাজাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে সেটা শুনছে। চলুন আপনারাও চলুন। মারামারি, হানাহানি, হিংসার বাইরেও একটা পৃথিবী আছে। দেখে আসবেন চলুন।”
তারা বেরোল ঘর থেকে। নিচে নেমে দেখল এক বৃদ্ধ অপূর্ব এক সুর তুলেছেন মাউথ অরগ্যানে। “তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।”
বুবকা দেখল একদিকে বৃদ্ধ সুর তুলছেন অন্যদিকে শুভর দু চোখ বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। বুবকা তথাগতকে বলল, “দাদা, অনেক দিন টাকা দিস না, আজ দে তো কিছু, স্কচ খাই বহুদিন পর।”
৩৫
-দীপ্তবাবু ভালো আছেন? এরা ভালো রেখেছে তো আপনাকে?
-ওহ, কৌশিকবাবু! বাহ। আপনাকেই এক্সপেক্ট করছিলাম। কী দেবেন? থার্ড ডিগ্রি?
-আপনাকে তো পারলে হাজার ডিগ্রি দিতাম দীপ্তবাবু, কিন্তু কী করব বলুন, আপনি তো এমনিই সব বলে দেবেন। অকারণে আর এনার্জি নষ্ট করে কী করব।
-বলতে পারি, কিন্তু কেন বলব?
-যাতে শাস্তি কম হয়।
-ওহ। তা বটে। কিন্তু বলব না। বুঝলেন? চিন্তা করবেন না, আমারও মিডিয়া আছে, আপনার মতো দুর্নীতিবাজ পুলিশ যে কীভাবে একজন নির্দোষ লোককে ফাঁসাচ্ছে সকাল বিকাল দেখবেন আপনি।
-তা দেখান, কোনও চিন্তা নেই। আচ্ছা এবার কাজের কথায় আসি। বলুন তো বস, বৈভবীকে মারলেন কেন? শুধুই রাইভ্যালরি? নাকি বৈভবী আর-একটু বেশি কিছু জেনে ফেলেছিল?
-আপনাদের তো বললাম, তথাগত মিত্র আর বাণী মিত্র আমাকে মারতে বলেছিল বলে আমি মেরে দিলাম। ওদের জেরা করে জানুন পুরোটা। আমাকে কেন বলছেন?
-দীপ্তবাবু, আপনার ফেসবুক ডেটিং ব্যবসাটা কেমন চলছে? বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে সর্বনাশ করে পাচারের কাজ? খুব বেশি দূর গেছে না এখনও ওয়েস্ট বেঙ্গলই…?
-মাইনে কত পান কৌশিকবাবু? ডিএ তো পান না। রাস্তায় মাঝরাতে গাড়ি ধরে ট্রাক ধরে বিশ টাকা ত্রিশ টাকায় সংসার চলে?
-বৈভবী কি সব জেনে গেছিল দীপ্তবাবু? আগরওয়ালও তো জানত, তাই না?
-পঁচাত্তর লাখ টাকা চোখে দেখেছেন কোনও দিন কৌশিকবাবু? সবার একটা রেট থাকে। কোন শুয়োরের বাচ্চা বলছিল আপনি নাকি সৎ? আমি বিশ্বাস করি না। পুরোনো প্রবাদ আছে, সৎ বলে কিছু হয় না। সবার রেট আছে কৌশিকবাবু। এসব চাকরি করে কী করবেন? আমি শুনলাম আপনি ভালো স্ক্রিপ্ট লেখেন। আপনার গল্পে আমি সিনেমা বানাব। ভাবুন তো এই বালের চাকরি করে কী লাভ হয়? আপনার সিনেমা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাবে, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি আপনাকে পুরস্কার দেবে, হট নায়িকারা আপনার বুকে বুক ঠেকিয়ে ফটো তুলে পেজ থ্রিতে দেবে। ভাবতে পারছেন কৌশিকবাবু?
-রিমিকে ওভাবে মারলেন কেন দীপ্তবাবু?
-আচ্ছা ছেড়ে দিন, এক কোটি, আমি বেরিয়েই আপনাকে একটা ওয়ার্ল্ড ট্যুরে পাঠাব। প্যারিসের মেয়েরা খুব ভালো শয্যাসঙ্গিনী হয় জানেন তো? কিংবা ব্রাজিল। মরিশাসও যেতে পারেন। আপনি তো অবিবাহিত, নাহয় একজন মডেলকে নিয়েই বেরোবেন। সব ব্যবস্থা আমি করে দেব কৌশিকবাবু, একদম চিন্তা করবেন না। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুরুন। আমি আছি আপনার পিছনে। কলকাতার বস্তিতে অপরাধীদের পিছনে ঘুরে বেড়াবেন, কোন ধাপার মাঠে রাতবিরেতে পড়ে থাকবেন, কেন? কল্পনা করুন আপনি স্কটল্যান্ডের বিচে বসে মার্টিনি খাচ্ছেন, ঠিক যেমন জেমস বন্ড খেতেন, পাশে অর্ধনগ্না মডেল, আপনি চাইলেই আপনাকে ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে, আমি আরব্য রজনীর দৈত্য কৌশিকবাবু, একবার চেয়ে তো দেখুন।
