বাণী বললেন, “নাহ। আজ আর ইচ্ছে করল না।”
প্রকাশ বললেন, “সে কী! তাহলে অসুবিধা হবে না?”
বাণী হাসলেন, “কোনও কিছু কারও জন্য থেমে থাকে না। আমি না গেলেও কাজটা ঠিকই চলবে। তুমি চা খাবে?”
প্রকাশ বললেন, “ব্ল্যাক টি, নো সুগার।”
বাণী বললেন, “জানি জানি। আমার অতটাও ভুলো মন না।”
প্রকাশ বসলেন। বাণী বললেন, “তুমি ফ্রেশ হয়ে নিতে পারতে তো।”
প্রকাশ বললেন, “নাহ। অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে কথা বলছি, আর-একটু বলি।”
বাণী বললেন, “আজ সকালেই তো বললে।”
প্রকাশ গুনগুন করলেন, “তুমি একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে।”
বাণী বললেন, “বাহ। তোমার গলাটা তো সেই একইরকম আছে। কতদিন পর শুনলাম।”
প্রকাশ বললেন, “আমিও বহুদিন পর গাইলাম। গাইতে যে পারি, সেটাই ভুলতে বসেছিলাম, আসলে শোনারও তো কেউ নেই।”
বাণী বললেন, “অনেক হল। আমাদের এবার অবসরের সময়। থামতে হবে হয়তো এবার।”
প্রকাশ বললেন, “অবসর কেন? অবসরের কোনও বয়স হয় নাকি? তুমি কি এখনও বুবকার ব্যাপারে ভেবে যাচ্ছ?”
বাণী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “বুবকা সব জেনে গেছে প্রকাশ।”
প্রকাশ বললেন, “স্বাভাবিক। আজ না হয় কাল জানত। কতদিন এভাবে চেপে রাখতে পারতে সত্যিটাকে?”
বাণী বললেন, “তুমি এত নির্লিপ্ত হও কী করে? সংসার থেকে এতটা দূরে চলে গেলে কবে?”
প্রকাশ বললেন, “যেদিন জানতে পারলাম তোমার আর তরুণের ব্যাপারটা। সেদিন থেকেই।”
বাণী প্রকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। বললেন, “তুমি সব জানতে? তবু কিছু বলোনি কোনও দিন?”
প্রকাশ বললেন, “কী করতাম বলো? ছেলেরা বড়ো হচ্ছে, তরুণের সংসার আছে, স্ত্রী কন্যা আছে। অকারণ একটা জটিলতা তৈরি করা ছাড়া আর কিছু হত? নিজেকে তোমার থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল!”
বাণী বললেন, “চিরকাল একটা বোকা মানুষ থেকে গেলে। কী পেলে এত বোকা থেকে?”
প্রকাশ বললেন, “তোমাকে পেলাম। এই যে, অফিস থেকে ফিরে ব্যালকনিতে বসে আছ দেখলাম, এই মুহূর্তটা পেলাম।”
বাণী বললেন, “রোম্যান্টিক মানুষেরা চিরকাল বোকা থেকে যায়, তুমি সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।”
প্রকাশ বললেন, “বোকা থাকাই বোধহয় ভালো। আচ্ছা বাদ দাও, বুবকা কোথায়?”
বাণী বললেন, “কালিম্পংয়ে। তথাগতর ওখানে।”
প্রকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তথাগতই বলেছে তাহলে ওকে?”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ। ভালোই করেছে। কতদিন আর পালিয়ে থাকা যায়!”
প্রকাশ বললেন, “ও কি নিজেই ওখানে থাকাটা এক্সটেন্ড করেছিল না তুমি বলেছিলে?”
বাণী বললেন, “আমিই বলেছিলাম। ব্যাপারটা কী থেকে কী হয়ে গেল, না? আমি শুধু চেয়েছিলাম বুবকা যেন বৈভবীর থেকে দূরে চলে যায়। দীপ্ত সেখানে মেয়েটাকে মেরেই ফেলল!”
প্রকাশ বললেন, “আগুন নিয়ে খেললে তুমি যদি ভাবো শরীর পুড়বে না তাহলে তো তুমি মূর্খের স্বর্গে বাস করছিলে। তোমার অনেক ভেবে এগোনো উচিত ছিল, বা না এগোলেই ভালো হত।”
বাণী বললেন, “কী যে হল আমার! যতবার ভেবেছি বুবকা বৈভবীকে বিয়ে করবে ততবার আমার শুধু মনে হয়েছে এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না! যদিও দীপ্তর সঙ্গে বসার কথা তথাগতই বলেছিল, তবু আমি এই দায় ওকে দিতে পারি না, এ আমারই দায়। আমারই বোঝা উচিত ছিল দীপ্তর মতো ছেলে ঠিক এই সুযোগটা নেবে। বম্বে রোডের ধারে একটা বারে ওদের বসার কথা ছিল স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করার জন্য, বৈভবীর ড্রিংকসে ড্রাগস মিশিয়ে ওকে খাইয়ে ওর সঙ্গে আগরওয়ালের ঘনিষ্ঠ ছবি তোলার প্ল্যান ছিল। ওরা যেতে পারল না তার আগেই ট্রাকটা… ছি ছি ছি, আমি কী করলাম। এত নিচে নেমে গেলাম!”
বাণী ভেঙে পড়লেন। প্রকাশ বাণীর পিঠে হাত রাখলেন, “একটা কথা বলব শুনবে?”
বাণী বললেন, “কী?”
প্রকাশ বললেন, “এসব নিয়ে আর ভেবো না। চা করবে বলছিলে না? যাও। অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হও।”
বাণী বললেন, “যাচ্ছি।”
প্রকাশ বললেন, “তুমি যেদিন প্রথম ভেলভেট পিকচারস শুরু করেছিলে ব্যাংক লোন নিয়ে, সেদিনের কথাটা মনে আছে? কতটা ভয় ছিল, আদৌ এত টাকা শোধ করতে পারবে নাকি! জীবনটাও তো অনেকটা সেরকমই। অনিশ্চয়তায় ভরা। শুধু একটা সিদ্ধান্তের জন্য সব কিছু শেষ হয়ে যেতে পারে না। তুমি ওঠো। চলো দুজনে মিলেই চা-টা বানাই। ওঠো।”
বাণী উঠলেন। প্রকাশ বাণীর হাত ধরলেন।
৩৪
তারা যখন হোটেলে ফিরল তখন সন্ধে হয়ে গেছে। কৌশিকের সিগারেট শেষ হয়ে গেছিল। কৌশিক বুবকাকে বললেন, “আপনি যান, আমি কিনে ঢুকছি।”
বুবকারা অন্য হোটেলে উঠেছিল। বুবকা ঘরে গিয়ে দেখল শুভর সঙ্গে তথাগতও বসে আছে। কথা বলছিল তারা। বুবকা বলল, “কি রে, তুই?”
তথাগত বলল, “তোর কাছেই এসেছিলাম।”
বুবকা বলল, “শুভদা তুমি তো সারাদিন হোটেলে ঘুমালে, যাও একটু বাইরে হাওয়া খেয়ে এসো।”
শুভ বলল, “বুঝেছি বুঝেছি, তবে দেখো বাপু, মারপিট কোরো না যেন।”
বুবকা বলল, “যাও তো।”
শুভ করুণ মুখে বলল, “বুঝেছি, গরিব মানুষের কোনও দাম নেই। আচ্ছা আসছি।”
শুভ বেরিয়ে গেল।
বুবকা বলল, “বল কী বলবি।”
তথাগত বলল, “আমি ডিসিশন নিয়েছি আগের কোম্পানিতে জয়েন করব, এসব আমার জন্য না।”
বুবকা বলল, “সেটা আমি জেনে কী করব।”
তথাগত বলল, “একটা সময় ভেবেছিলাম এত বড়ো হাউজ, হয়তো খুব ইজিলি ব্যাপারগুলোকে বুঝে নেব। আদতে বুঝলাম আমি পারছি না। আর এইসবের মধ্যেই খুব বড়ো একটা পাপ করে ফেললাম। তোকে আবার বলছি, বৈভবীকে মারার কথা কোনও দিনও ভাবিনি। সেদিন যখন খবরটা শুনলাম, প্রথমেই হতভম্ব হয়ে তোকেই ফোন করে দিলাম। আমি ভাবতেই পারিনি দীপ্ত এটা করতে পারে। যতবার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি, ততবার আমি নিজেকেই ক্ষমা করতে পারি না। তুই আর আমাকে কী ক্ষমা করবি!”
