তথাগত বলল, “আমি চিনি না, কোন গাড়িকে মেরেছে?”
কৌশিক বললেন, “আপনি বলেছিলেন যার গাড়িকে মারতে। মনে করতে পারছেন না? নাকি মনে করিয়ে দেব?”
বুবকা কৌশিকের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, “ও আছে না? আমি জানতাম ও আছে। আমি জানতাম…”
কৌশিক বুবকার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিলেন, “আপনি একটা কথাও বলবেন না বুবকা। প্লিজ। এটা ওঁর সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। আপনি দূরে কোথাও যেতে চাইলে যেতে পারেন। প্লিজ।”
বুবকা চুপ করে গেল।
কৌশিক বললেন, “বলুন তথাগতবাবু। আচ্ছা দীপ্ত রায়ের সঙ্গে আপনার ফিটিংটা হল কবে থেকে? মানে কবে থেকে এইসব প্ল্যানগুলো করলেন। একটু আলোকপাত করুন। ওহ, ওয়ান মোর থিং, আপনি ভাবুন কী করবেন এখন, দীপ্ত রায়কে কিন্তু খুব শিগগিরি আমরা পাকড়াও করব এবার।”
তথাগত রেগে গেল, “দেখুন, আপনি যদি আমাকে বৈভবী মার্ডারে দোষী ভাবেন, তাহলে ভুল ভাবছেন, আমি কিন্তু খুন করিনি। কাউকে খুন করতেও বলিনি।”
কৌশিক ঠান্ডা গলায় বললেন, “শুধু অ্যারেঞ্জ করেছিলেন আগরওয়াল যেন বৈভবীকে ডাকে স্ক্রিপ্ট শোনাবার নাম করে। এদিকে বুবকাও সেটা জানতে পারলে রেগে যাবেন, তাই বুবকাকেও বলেনি কিছু বৈভবী, তারা গাড়িতে করে কোথাও একটা যাচ্ছিল, আপনারা ট্রাক দিয়ে গাড়িটাকে…”
তথাগত চেঁচিয়ে উঠল, “উফ… পাগল করে দিচ্ছেন তখন থেকে। শুনুন, আমি বারবার বলছি, আবার বলছি, আমি খুন করিনি। যেহেতু দীপ্ত রায়ের সঙ্গে আগরওয়ালের ভালো বন্ধুত্ব ছিল, তাই আমি ওকে ফিট করেছিলাম আগরওয়ালকে দিয়ে বৈভবীকে ডাকার জন্য। আমাদের প্ল্যান ছিল কিছু ফটো তোলা, ভিডিও করে বুবকাকে পাঠানো, যাতে ও বোঝে বৈভবী ওকে চিট করছে। কিন্তু ব্যাপারটা হল ওই ড্রাইভার গাড়িটায় মেরেই দিল। সেটা আমি বলিনি! বিশ্বাস করুন!!!”
একবারে কথাগুলো বলে তথাগত থামল।
কৌশিক বুবকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নিন বুবকা, দিস ইজ দ্য স্টোরি, বুঝলেন?”
তথাগত হাঁফাচ্ছিল। বুবকা এগিয়ে এসে তথাগতর কলার ধরল, “তুই এটা করতে পারলি? কী লাভ হল তোর এটা করে দাদা? একটা মেয়েকে মেরে ফেললি তোরা?”
বুবকার চ্যাঁচ্যামেচি শুনে কটেজের হাউসস্টাফরা দৌড়ে এল। কৌশিক তাদের হাত তুলে নিরস্ত করলেন।
তথাগত বলল, “আমার বুদ্ধিতে এটা হয়নি বুবকা। মা বলেছিল বলেই এটা করা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস কর, বৈভবীকে খুনের কথা কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি।” বুবকা বিস্ফারিত চোখে তথাগতর দিকে তাকিয়ে থাকল।
কৌশিক বললেন, “হুঁ, কলার ছাড়ুন বুবকা। দীপ্ত রায় ওভারট্রাম মেরেছিলেন, যাতে আপনাদের মধ্যে খিঁচটা জম্পেশ করে লাগে। মা ব্যাটায় বোঝেননি।”
চ্যাঁচামেচিতে প্রীতিকা বেরিয়ে এসেছিল। বুবকা তথাগতর কলার ছেড়ে দিল। রেলিংয়ে একটা ঘুসি মেরে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
কৌশিক বললেন, “এইজন্য বলি একটা ট্রুথ হাউজ দরকার, সবাই মিলে ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার খেলতাম, কিছু না কিছু একটা বেরিয়ে আসত।”
প্রীতিকা বিস্মিত হয়ে বলল, “আপনি কী করে জানলেন ট্রুথ হাউজের কথা?”
কৌশিক হাসতে হাসতে বললেন, “ওটা তো আমারই লেখা। সৌভিকের মুখস্থ বুদ্ধি ভালো, তবে এইসব লিখতে সেই আমাকেই লাগে।”
প্রীতিকা বলল, “সৌভিক মানে?”
কৌশিক বললেন, “ওহ, আপনারা তো ওকে দীপ্তানুজ নামে চেনেন। তা ভালো। ওই নামটাও আমারই দেওয়া। নাম মনে পড়ছিল না মাথায়, ওটাই দিয়েছিলাম। দীপ্ত রায় বোঝেনি বাপেরও বাপ থাকে। এদিকে বরাটকে ফিট করছে, ওদিকে বড়ো সাহেব আমাকে ডেকে প্যারালাল ইনভেস্টিগেশন চালাতে বললেন। এদিকে দেখলাম আপনারা স্ক্রিপ্ট রাইটার নিচ্ছেন, ব্যস, মালটাকে ঢুকিয়ে দিলাম। ভেতরের খবর রাখার জন্য এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? এককালে স্ক্রিপ্টও লিখেছি, বুঝলেন কিনা? তবে আপনাদের সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট বড্ড ঢপের জিনিস, খুব বিরক্ত লাগে লিখতে।”
প্রীতিকা অবাক হয়ে কৌশিক রায়ের দিকে তাকাল। তথাগত চেয়ারে বসে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পর বুবকার দিকে তাকিয়ে বলল, “বিশ্বাস কর, বৈভবীকে মারার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।”
বুবকা কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
৩২
“বাবা একটা কারখানায় কাজ করত বুঝলেন বুবকা, দেড় কামরার একটা ঘরে দুই ভাই, বাবা, মা। একবার বাবা পুজো বোনাস পেল, আর কীভাবে যেন টাকা বাঁচিয়েছিল। সেই প্রথম দার্জিলিং যাওয়া। সে কী উৎসাহ আমাদের। দাদা আর আমি মিলে ম্যালে দৌড়ে বেড়াচ্ছি সারাদিন ধরে। হোটেলের থেকে কত দূরে ছিল ম্যাল, অনেকটা হাঁটতে হত, কিন্তু তাই সই। দুজনে মিলে মাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে চলে আসতাম। তারপর দৌড়ে বেড়ানো। তিন না চার দিন ছিলাম মনে নেই। ফিরলাম যেদিন সেদিন কী মনখারাপ। শুধু মনে হত আবার সেই জীবনে ফিরে যেতে হবে!
যেতে হল। ফেরার পরেই বাবার কারখানায় লক আউট হল। কোনও দিন এক বেলা খেয়ে কাটাতাম, কোনও দিন খাওয়াই হত না। ভদ্রলোকের সন্তান হবার সমস্যা হল, ভিক্ষা চাওয়াতে আমাদের অসম্মান। দিনের পর দিন বাবা ফিরত আর আমরা হাঁ করে অপেক্ষা করতাম ভালো কোনও খবর শুনব হয়তো। এর মধ্যে একদিন দাদা স্কুল থেকে ফিরছিল, রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়ল। দাদার বডি আসছে, বাড়ির সেই পরিবেশ, বাবার সেই দৃষ্টি, মার কান্না আমাকে একদিনে বড়ো করে দিয়েছিল। তারপর থেকে স্বপ্নে দাদাকে দেখেছি প্রতিবার, ম্যালে ছোটাছুটি করছি আমরা। আর দাদা সেই একইরকম আছে।”
কৌশিক কথাগুলো বলে পকেট থেকে সিগারেটটা বের করে ধরালেন।
শুভ পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তারা দুজন হোটেল থেকে বেরিয়ে খানিকটা হেঁটে একটা বসার জায়গায় এসে বসেছে।
বুবকা বলল, “দাদা আর মাকে কি অ্যারেস্ট করা হবে?”
কৌশিক সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললেন, “এখানে আপনার এখনও এইসব কথা মনে আসছে? এই পরিবেশে? আমার তো ইচ্ছা করছে কোথাও না গিয়ে এখানেই থেকে যাই। ডিপার্টমেন্টে এক-আধ দিন একটু ঝামেলা হবে বটে, কিন্তু ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
বুবকা বলল, “পারবেন না থাকতে।”
কৌশিক বললেন, “কেন বলছেন?”
বুবকা বলল, “আপনি মানুষ ঘেঁটে ঘেঁটে রোবট হয়ে গেছেন। রোবটদের এইসব সৌন্দর্য ভালো লাগে না।”
কৌশিক বললেন, “তা বটে। দু-চারটে ক্রিমিনালকে পিটিয়ে ঠান্ডা না করতে পারলে আজকাল মনে হয় দিনটা খুব খারাপ যাচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে, আপনি রিমিকে চিনতেন?”
বুবকা বলল, “কে রিমি?”
কৌশিক বললেন, “ওহ, আপনি চিনবেন না।”
বুবকা বলল, “এখানে রিমি এল কোত্থেকে?”
কৌশিক বললেন, “রিমি হল একজন এসকর্ট, যাকে দীপ্ত রায় বোন বলে পরিচয় দিচ্ছিল। তাকে খানিকক্ষণ আগে অর্ধমৃত অবস্থায় দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা গেছে। দীপ্ত রায় তালা লাগিয়ে অফিসে গেছিলেন। আমাদের ফোর্স অনেক কসরত করে দরজা খুলে মেয়েটিকে উদ্ধার করে নার্সিং হোমে নিয়ে গেছে। দ্য ফানি সাইড ইজ, স্টিল দীপ্ত রায় এ ব্যাপারে কিছু জানে না। মেয়েটার সারা শরীরে উন্ড, অত্যাচারের ছাপ স্পষ্ট। হালকা ক্লু পাওয়া গেছে, একটা নারী পাচার চক্রের অন্যতম মাথাও এই গুণধর বাবুটি। দীপ্তবাবু লম্বা ফাঁসবেন। শুধু অলকা দেবীকে প্রয়োজন ছিল এই সময় বুবকা। ওঁর কাছে অনেক খবর থাকতে পারে।”
অর্ধেক খাওয়া হয়ে গেছিল। কৌশিক সিগারেটটা ফেলে দিল।
বুবকা বলল, “চিরকাল দেখে এসেছি আমার দাদা পড়াশোনায় সেরা। ক্লাসে ফার্স্ট হত। ক্যুইজে একবার কলকাতার সেরা হয়েছিল। অঙ্কে এত ভালো ছিল যে ক্লাসের ছেলেরাই দাদার কাছে বুঝতে আসত। ছোটোবেলা থেকে মা ছাড়া কিছু বুঝিনি। এরা এই দীপ্ত রায়ের মতো লোকের সঙ্গে হাত মেলাবে কৌশিকবাবু? শুধু বৈভবীকে পছন্দ নয় বলে?”
কৌশিক বললেন, “আপনার দাদার চাকরিটা ছাড়া উচিত হয়নি। একটা প্রাচীন ক্লিশে প্রবাদ আছে, বন্যেরা বনে সুন্দর। আপনার দাদা ওই ঝকঝকে অফিসগুলোতেই সুন্দর। সৌভিক যখন আমাকে রিপোর্ট দিত তখনই বুঝেছিলাম। উনি এই লাইনের লোকই নন। আপনার এক্কেবারে উলটো।”
বুবকা বলল, “ছোটোবেলায় সবাই বলত দাদা বাবার মতন। অ্যাকাডেমিক টাইপ। পড়াশোনা ছাড়া কিছু বোঝে না।”
কৌশিক বললেন, “একজ্যাক্টলি। আর আপনি বাণী মিত্রের মতোই। কিংবা বাণী মিত্র আপনার মতো। নিজেরা যেটা চান, তার জন্য এমন জেদ করে থাকেন যেখানে আর সব কিছু খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। বেশি ভালোবাসা মানুষকে ঠিক ভুল বিচার করতে দেয় না। ন্যায় অন্যায়ও না। বাণী দেবী আপনাকে ভালোবাসেন…”
বুবকা বাধা দিল, “এটা ভালোবাসা না কৌশিকবাবু, এটা লোকলজ্জার ভয়, ইগো ক্ল্যাশ।”
কৌশিক পকেট খুঁজে আর-একটা সিগারেট ধরালেন, বললেন, “আমার মা এখনও দিনে তিরিশবার ফোন করে বুবকা। খেয়েছি কি না, বাড়ি কখন আসব। মায়েরা আসলে সন্তানের ব্যাপারে অন্ধ হয়ে থাকে, কিছু বুঝতে চায় না।”
বুবকা চুপ করে বসে থাকল।
কৌশিক বললেন, “যারা বর্ন ক্রিমিনাল হয়, তাদের পেট থেকে কথা বের করতে আমাদের অনেক ঘুঘু অফিসারদের পর্যন্ত দম বেরিয়ে যায়। ক্রমাগত তারা মিসলিড করে যাবে, দিনের পর দিন তারা মার খাবে, কিন্তু তাদের পেট থেকে একটা কথা বেরোবে না। অথচ তথাগতবাবুকে দেখুন। কত সহজে কনফেস করে দিলেন। উনি আসলে ভাঙছিলেন ভিতরে ভিতরে। চাপটা আর নিতে পারছিলেন না। ওঁকে রিড করতে আমার বেশি সময় লাগেনি। সৌভিকের রিপোর্টই এনাফ ছিল। পাহাড়ে তড়িঘড়ি আপনাকে এজন্যই নিয়ে আসা। আর-একটা কারণ অবশ্য, আমার ভয় ছিল তথাগত বেশি প্যানিকড হয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে না যান!”
বুবকা বলল, “আপনি ক্রমাগত আমার দাদা আর মার পক্ষে কথা বলছেন কেন?”
কৌশিক হাসলেন, “আচ্ছা ছাড়ুন আপনাকে একটা খবর দি।”
বুবকা বলল, “কী?”
কৌশিক বললেন, “অলকানন্দা মুখার্জির কল লিস্ট চেক করা হয়েছে। নিখোঁজ হবার বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই একটি নম্বরে উনি প্রায়ই ফোন করতেন। যাবার আগে অবশ্য ফোনের ডায়াল লিস্ট থেকে নম্বরটা ডিলিট করে গেছেন। আমার একটু সন্দেহ হয়েছিল। অগত্যা একটু গভীরে যেতে হল। নাম্বারটা আপনার বুবকা।”
বুবকা বলল, “আমি জানতাম আপনি বুঝে যাবেন।”
কৌশিক বললেন, “রেখেছেন কোথায়? জানতে পারি? এখানে আমি আপনি আর পাহাড় ছাড়া কেউ নেই।”
বুবকা হাসল। কিছু বলল না।
৩৩
সন্ধে সাতটা। প্রকাশ অফিস থেকে ফিরে দেখলেন বাণী ব্যালকনিতেই বসে আছেন। অবাক হলেন তিনি, “তুমি অফিস যাওনি?”
