বুবকা বলল, “আমি প্রথম যখন ছোটোবেলায় এখানে আসি, মনে আছে ট্রেন থেকে নেমে বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম যখন ভাঙল দেখি খাদ। সারা রাস্তা বমি করতে করতে গ্যাংটক পৌঁছেছিলাম।”
কৌশিক বললেন, “আপনার কিন্তু বেশ ক্রেজ আছে বুবকা, যা বুঝলাম। লোকজন চিনতেও পারে। গোটা ফ্লাইটে একটা মেয়ে আপনাকে ঝাড়ি মারতে মারতে এল। বোঝাই গেল ক্রাশ-টাশ আছে। লাইফটা এভাবে রাস্তায় রাস্তায় মদ না খেয়ে বেরিয়ে নতুন করে ভাবছেন না কেন?”
শুভ বলল, “সে তো স্যার আপনাকে না চিনেও দেখলাম এক মেয়ে অনেকক্ষণ ড্যাবডেবিয়ে তাকিয়ে ছিল। হ্যান্ডু আপনিও কম না।”
বুবকা বলল, “আপনি আমার জায়গায় থাকলে কী করতেন?”
কৌশিক হাসলেন, “আমিও আপনার মতোই করতাম। কিন্তু লাইফ কি তাই? সবকিছু ভুলে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা না করলে কীভাবে হবে বলুন তো?”
বুবকা বলল, “গার্লফ্রেন্ড, যার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেও কথা হয়েছে, শুনতে পেলাম সে স্পট ডেড হয়ে গেছে, তাও নাকি কোন এক লম্পটের সঙ্গে সে যাচ্ছিল। গোটা পৃথিবীর লোক অনুকম্পার দৃষ্টি মেলে আপনাকে দেখছে, হায় রে ছেলেটা সারাজীবন ধোঁকা খেয়ে গেল, কেউ বা ভাবছে এহ, এটা একটা ভালো মুরগি হল তো, সে অবস্থায় মানুষ কী করবে?”
কৌশিক বললেন, “খবরটা আপনাকে কে দিয়েছিল?”
বুবকা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল, “দাদা।”
কৌশিক আধখাওয়া সিগারেটটা জানলার বাইরে ফেলে বললেন, “টাইমটা মনে আছে?”
বুবকা বলল, “নাহ।”
কৌশিক বললেন, “আপনি তখন কোথায় ছিলেন?”
বুবকা বলল, “খোয়াইতে।”
কৌশিক বললেন, “একা?”
বুবকা শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, “অলকা ছিল।”
শুভ বলল, “আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই গুরু। আমি জানি তুমি অন্য কারও দিকে তাকাতেই পারো না, কিছু করা তো ছেড়েই দিলাম।”
কৌশিক হাসতে হাসতে বললেন, “এ তো মহা পজেসিভ লোক দেখছি। যাই হোক, আমাকে একটা কথা বলুন তো বুবকা, বরাট আপনাকে বৈভবীকে নিয়ে কী কী জেরা করেছে?”
বুবকা বলল, “করেইনি কোনও দিন।”
কৌশিক চোখ বড়ো বড়ো করলেন, “সে কী! মালটা কী করছিল তাহলে!”
বুবকা বলল, “ডিল অ্যামাউন্টটা জানতে পেরেছেন?”
কৌশিক বললেন, “হুঁ, মন্দ নয় সে টঙ্কা ভালো, রং যদিও বেজায় কালো।”
বুবকা বলল, “ব্ল্যাক মানি?”
কৌশিক বললেন, “হুঁ।”
শুভ বলল, “মাইরি কত লোকের কত ব্ল্যাক মানি, সারাজীবন শুনেই গেলাম। কেউ তো বলে না, নে ভাই শুভ আমার অনেক ব্ল্যাক মানি আছে, আমার এত টাকা লাগবে না, তুই নিয়ে যা, মৌজ কর।”
কৌশিক বললেন, “বলবেও না। আপনাকে দিয়ে কারও এক টাকারও উপকার হবে না।”
শুভ মুষড়ে পড়ে বলল, “সেই, গরিবের দিকে তো আর কেউ কোনও দিন চোখ তুলে তাকাবে না।”
কৌশিক হাসতে লাগলেন।
#
তথাগত কটেজের বাইরে চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিল। প্রীতিকা স্নানে গেছিল। হঠাৎ দেখতে পেল সিঁড়ি দিয়ে এক ভদ্রলোক আসছেন। তার পিছনে বুবকা।
নিচ থেকেই কৌশিক হাঁক পাড়লেন, “কেমন আছেন তথাগতবাবু, কী ভাগ্যিস আপনি পাহাড়ে এসেছিলেন, নইলে এই গরমে শহরে পচে মরতে হত। থ্যাংক ইউ বস, থ্যাংক ইউ!”
৩১
“জায়গাটা তো বেড়ে মশাই। এসব তো অনেক ভাড়া, কী বলেন?” কৌশিক তথাগতর সামনের চেয়ারে বসলেন।
বুবকা রেলিংয়ে হেলান দিল। শুভ মাটিতেই বসে পড়ল।
তথাগত বুবকা আর শুভর দিকে একবার তাকিয়ে কৌশিকের দিকে তাকাল, “হ্যাঁ, ভাড়া মন্দ না। সাড়ে তিন হাজার পার ডে। খাওয়ার চার্জ আলাদা। ব্রেকফাস্ট পার হেড আড়াইশো টাকা, লাঞ্চ ডিনার চারশো টাকা করে।”
কৌশিক চোখ বড়ো বড়ো করে তথাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “শালা সৎ হবার বড্ড জ্বালা মশাই, যা মাইনে পাই, তার ওপর ডিএ তো ভুলে গেছি, এসব জায়গা তো ভাবতেও পারি না।”
বুবকা বলল, “বউদি কোথায়?”
তথাগত বলল, “স্নানে।”
কৌশিক বললেন, “তা তথাগতবাবু, আপনার তো ফেরার কথা আগেই ছিল, থেকে গেলেন যে?”
তথাগত একটু ইতস্তত করে বলল, “এমনি, এত ভালো জায়গা, কলকাতা তো সেই জ্যাম, টেনশন, যতদিন এখানে থাকা যায় আর কি!”
কৌশিক বললেন, “ওহ। তা ভালো। তা কী কী ঘুরলেন কালিম্পংয়ে? ভূত দেখলেন?”
তথাগত বলল, “ভূত বলে কিছু থাকলে তো দেখব।”
কৌশিক বললেন, “ঠিকই, ভূত বলে কিছু হয় নাকি, সবটাই ঢপবাজি, আর ভূতের বই, ভূতের সিনেমা বিক্রির চেষ্টা। জঘন্য জঘন্য। সবাই ব্যবসা করছে।”
তথাগত বলল, “একেবারেই। ব্যবসা ছাড়া আর কী?”
“তা তথাগত বাবু, চাকরি ছাড়লেন কী আনন্দে? আপনি তো গুছিয়ে ছড়াচ্ছেন যা শুনতে পেলাম। একটা মেগা অলরেডি কেস খাইয়েছেন, আরও কী কী করবেন কে জানে। এভাবে চললে তো ভেলভেট পিকচারস ডুবে যাবে।”
তথাগত বুবকার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঘরের কথা বাইরের লোকের কাছে বলার দরকার ছিল কি খুব?”
কৌশিক মুখে চুক চুক শব্দ করলেন, “আরে মশাই, আপনি পুলিশকে এত আন্ডারএস্টিমেট করেন কেন? ঘাসে মুখ দিয়ে চলি নাকি আমরা? শুনুন, মানুষ দুটো পর্যায়ে গিয়ে নির্লিপ্ত হয়, এক, সে কিছুই জানে না, দুই, সে সব জানে। আমরা, মানে পুলিশরা এই দ্বিতীয় পর্যায়ে পড়ি। আমরা জানি সবই, কিন্তু ভাব করি কিছুই বুঝতে পারি না। বুঝলেন?”
তথাগত কিছু বলল না। প্রীতিকা বাইরে এল।
অবাক চোখে বুবকার দিকে তাকাল।
কৌশিক বললেন, “এই তো, বউদি এসে পড়েছেন।”
প্রীতিকা বলল, “আপনাকে তো ঠিক…”
কৌশিক বললেন, “আমি তথাগতবাবুর বন্ধু।”
প্রীতিকা বলল, “ওহ, চা খাবেন? বলব?”
কৌশিক বললেন, “তা মন্দ হয় না। চা তো দরকারই। ও ছাড়া কী করে হবে?”
প্রীতিকা ঘরে গেল ইন্টারকম থেকে ফোন করতে।
কৌশিক বললেন, “তথাগতবাবু, দীপ্ত রায় কী বলছে আজকাল?”
তথাগত গম্ভীর ছিল, আরও গম্ভীর হয়ে বলল, “ওঁর সঙ্গে আমার কথা হয় না।”
কৌশিক বললেন, “স্বাভাবিক, সেয়ানে সেয়ানে তো কোলাকুলি হয়, কথা তো কমই হয়। অবশ্য আপনাকে সেয়ানা বললে অনেক সেয়ানা আত্মহত্যা করবে। এবার কাজের কথায় আসি, বলুন তথাগতবাবু, কেদার সিংয়ের নাম শুনেছেন?”
তথাগত অবাক হল, “কে বলুন তো!”
কৌশিক বললেন, “ও, আপনি কেদার সিংকে চিনবেন না, কেদার সিং তো একজন পাতি ট্রাক ড্রাইভার যে একটা গাড়িকে ইচ্ছা করে মেরেছিল। আপনি চিনবেন কী করে?”
