বাণী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, “সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল, না? সুখটা সইল না।”
প্রকাশ বললেন, “তুমি এত অল্পে ভেঙে পড়ছ কেন? কী এমন হয়েছে?”
বাণী প্রকাশের দিকে তাকালেন, শেষ কবে একসঙ্গে এভাবে কথা বলেছেন মনে করতে পারছিলেন না। বললেন, “স্টুডিওতে সিআইডি অফিসার এসে দু ছেলের খোঁজ করছে, এর থেকে আর কত খারাপ হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?”
প্রকাশ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “বুবকাকে ফোন করব? কোথায় আছে দেখব?”
বাণী বললেন, “নাহ। ফোন করে কী হবে? মাকে খুনি ভাবছে আজকাল। ফোন করলে ভাববে ট্র্যাক করতে চাইছি।”
প্রকাশ বিষণ্ণ গলায় বললেন, “আমিই দায়ী, ওকে আরও চোখে চোখে রাখা উচিত ছিল।”
বাণী মাথা নাড়লেন, “তুমি কেন দায়ী হতে যাবে? একটা সময় তুমি সাপোর্টটা না দিলে ভেলভেট পিকচারস দাঁড়াত না। কিন্তু সেসব করতে গিয়ে ছেলেটার দিকেই নজর দেওয়া হল না। মা বাড়িতে না থাকলে ছেলে এভাবেই বখে যায়। আরও ভুল করেছি আমি। বুবকাকে অ্যাকাডেমিক লাইনে জোর করে নিয়ে গেলেই ভালো হত। মাত্র সতেরো বছর বয়স ছিল ওর, যখন ওর ডেবিউ হয়। ওই অত অল্প বয়সে এত লাইমলাইট পড়ল, মাথাটা ঠিক রাখতে পারল না। আমাদের গাইডেন্সটা মিস করে গেল। ওই সময়টাই সব শেষ করে দিল।”
প্রকাশ বললেন, “বৈভবী মেয়েটা খারাপ ছিল না বাণী, বুবকাকে কিছুটা হলেও সামলাতে পারত।”
বাণী চুপ করে থাকলেন। প্রকাশ বললেন, “আমি বুবকার সাইকোলজিটা বোঝার চেষ্টা করেছি। ও তোমায় মিস করত। একটা সময় ছিল যখন ও মা ছাড়া আর কিছু বুঝত না। সর্বক্ষণ মা মা করেই চলেছে। যে সময়টা তুমি হাউসটাকে দাঁড় করানোর জন্য হঠাৎ করে ওর থেকে দূরে হয়ে গেল, ও অদ্ভুত এক ইনসিকিউরিটিতে ভোগা শুরু করল। এই ইনসিকিউরিটি থেকেই ও বৈভবীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। ভালোবাসার থেকে বেশি ওর কাছে আশ্রয় কিংবা নিরাপত্তা বড়ো হয়ে গেছিল।”
বাণী ব্যঙ্গচ্ছলে হেসে বললেন, “হ্যাঁ, এমনই আশ্রয়, নিরাপত্তা, যে, ছেলে শান্তিনিকেতনে শ্যুট করছে আর তিনি এখানে প্রোডিউসারের সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছেন।”
প্রকাশ বললেন, “ফুর্তি করে বেড়াচ্ছিল কি না সেটা তো এখনও কনফার্মড না, তাই না? হয়তো জানাও যাবে না কোনও দিন। তোমার বৈভবীকে নিয়ে এত সমস্যা কেন বলো তো!”
বাণী প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে মেয়ে কেরিয়রের শুরুতে হেন কোনও লোক নেই যার সঙ্গে শোয়নি, তাকে যদি আমার ছেলে বউ হিসেবে মনোনীত করে, তাহলে আমি কেন, পৃথিবীর সব মায়েরই সমস্যা হবে প্রকাশ। হতে পারে সে মেয়ে ভালো হয়ে গেছে, হতে পারে সে বুবকাকে ভীষণ ভালোবাসে, তবু সমস্যা হতে পারে। পারে না? কেন, বাবা হিসেবে তোমার সমস্যা হত না?”
প্রকাশ বললেন, “আমি তোমাদের থেকে বহুদিন হল দূরে চলে গেছি বাণী। আমার শিডিউল তোমার শিডিউল মেলে না। অফিস থেকে ফিরে ঘরে কাউকেই দেখতে পাই না। তাও প্রীতিকা থাকলে কথা-টথা হয়, তবু সেটা একেবারেই সৌজন্যমূলক। কিন্তু দূর থেকে আমি এটুকু বুঝতে পারি, তোমরা যে জায়গাটায় এখন প্রবেশ করেছ, সেটাতে যতটা না গ্ল্যামার আছে, তার থেকেও বেশি আছে যান্ত্রিকতা। এই জীবনটা অদ্ভুত। এক-একটা মানুষ নিশাচর প্রাণীর মত পার্টি করে, রোজ নিয়ম করে মাঝরাতে বাড়ি ফেরে, তাদের কাজের সময়টাই অত রাত করে শেষ হয়। এ তো খুব একটা স্বাভাবিক জীবন না। এবার স্বাভাবিক জীবনের মানুষের থেকে তোমাদের পৃথিবীর জীবনটা অন্য হবেই, তাই না? সেক্ষেত্রে সমস্যা হলেও ভেবে নিতে হবে ওটা বুবকার লাইফ, ও যা ভালো ভেবেছে করেছে।”
বাণী কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বললেন, “আমার কিছু ভালো লাগছে না আর। সেই আগের মতো গান চালাও তো। শুনি বসে বসে। তখন সস্তার টেপরেকর্ডার ছিল, কত গান শুনতাম। এখন দামি মিউজিক সিস্টেম, অথচ গানই শোনা হয় না দ্যাখো।”
প্রকাশ উঠলেন, “বেশ, রবীন্দ্রসংগীত চলবে তো?”
বাণী হাসলেন, “শুধু রবীন্দ্রসংগীতই। আর কিছু না। সাগর সেন। আছে?”
প্রকাশ বললেন, “আছে।”
৩০
“একটা ভালো গান চালাও তো ড্রাইভারভাই। নেপালি গান এখন জমছে না। মেরে সপনো কি রানি আছে?”
তাদের গাড়ি সেবক কালীবাড়ি পেরোতে পেরোতে কৌশিক হাঁক পাড়লেন।
শুভ বলল, “হ্যাঁ। সত্যি মাইরি। কান পচে গেল। এ শালারা গোর্খাল্যান্ড নিয়েই ছাড়বে!”
বুবকা তিস্তা দেখছিল, বলল, “তুমি তো দেখি সব ব্যাপারই কম বেশি জানো।”
শুভ বলল, “হ্যাঁ, কাগজটা পড়া চাই, বুঝলে গুরু।”
ড্রাইভার গান চেঞ্জ করল।
কৌশিক বললেন, “আচ্ছা শুভবাবু, প্লেনের মধ্যে চোখ বন্ধ করে বসে কাঁপছিলেন কেন? এত ভয় কীসের? বেঁচে থেকেই বা কী হবে? এই যদি গাড়িটা এখন খাদে পড়ে যায়, কী করবেন তখন?”
শুভ সভয়ে বলল, “কী সব অলুক্ষুনে কথা বলছেন স্যার! এসব বলে নাকি! বেঁচে থেকে কী করব মানে? মরে গিয়েই বা কী করব? ভগবান মানুষ করে পাঠিয়েছেন, কতদিন আর বাঁচব। যতদিন বাঁচব ভালো করে বেঁচে নি। এখনও কত কিছু খেলাম না, কত জায়গায় গেলাম না। কিছুই তো দেখলাম না। তবু এই আপনাদের কল্যাণে প্লেনে চড়তে পারলাম। এইটা একটা ভালো কাজ করলাম বলতে পারেন সারা জীবন ধরে।”
কৌশিক সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, “সেই, কথায় আছে না ভাগ্যবানের বউ পালায়, আপনি হলেন সেই বিরল ক্যাটাগরির ভাগ্যবান। যা যা উইশলিস্টে আছে সবই দেখতে পাবেন আপনি, চাপ নেই।”
