শুভ বুবকার গাড়ির পিছনের সিটে শুয়েছিল অভ্যাসমতো।
রাত আড়াইটা। রাস্তার মধ্যে একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মদ খাচ্ছিল তারা।
রোজের মতোই।
বুবকা বলল, “কেন হয় না? নেশাটা আসলে জানো তো মুডের ওপর ডিপেন্ড করে।”
শুভ বলল, “তোমার মুড তো আজকে ভালো হবার কথা। ওই শুয়োরের বাচ্চাটাকে গাঁড় ক্যালানি দিয়েছ। কোথায় আজ এট্টু ফুর্তি করবে তা না, কেমন একটা ঝিমিয়ে যাচ্ছ!”
বুবকা বলল, “শুধু দীপ্ত রায়কে মারলেই মুড ভালো হবে? হলে তো খুশিই হতাম।”
শুভ খিক খিক করে হাসতে হাসতে বলল, “ওই বানচোদকে মেরেছ, আমি তাতেই খুশি, মাইরি বলছি আজ যদি হাতে টাকা থাকত আমি তোমাকে মদে চান করিয়ে দিতাম। আচ্ছা তুমি যখন ক্যালাচ্ছিলে মালটা কী বলছিল?”
বুবকা বলল, “চুপচাপ মার খেয়ে গেল।”
শুভ বলল, “ওই দীপ্ত ব্যাটা তো চুপচাপ মার খাবার মাল না গুরু।”
বুবকা হাসল, “হিরো মারলে ভিলেন মার খায় জানো না?”
শুভ বলল, “তা যা বলেছ গুরু, তুমি শালা সত্যি সত্যি একটা হিরোই বটে!”
বুবকা বোতল থেকে অনেকটা মদ গলায় ঢালল, এই সময় তার গাড়ির সামনে একটা বাইক এসে থামল। একজন বাইক থেকে নেমে ড্রাইভার সিটের পাশে এসে বলল, “ওহ, আপনি এখানে? আর আমি গোটা পৃথিবী খুঁজে বেড়াচ্ছি আপনাকে!”
বুবকা বলল, “আপনি কে?”
লোকটা বলল, “আমি? আমি ওই যে আপনারা বলেন না, মামা! আমি ওই মামা।”
শুভ পিছন থেকে বলল, “গুরু, আজ গাঁ মারা গেল।”
লোকটা জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলল, “বাহ, আপনিও আছেন শুভবাবু। এ তো এক ঢিলে দুই পাখি মারলাম ফিল হচ্ছে। আচ্ছে দিন এসে গেল তো মশাই। গাড়িতে এসে বসতে পারি?”
বুবকা নিস্পৃহ গলায় বলল, “বসুন।”
লোকটা বলল, “কী খাচ্ছেন? রামের গন্ধ পাচ্ছি! এত বড়োলোকের ছেলে রাম খাচ্ছেন? স্কচ খান না?”
শুভ বলল, “রামের টাকা জোগাড় করতেই পেছন ফেটে যাচ্ছে আর আপনি আবার স্কচের গল্প শোনাচ্ছেন।”
লোকটা বলল, “ওই মুরগির গলার চর্বি ফ্রাই না কী খেতেন না আপনি? শোনার পর থেকে আমারও ভীষণ খেতে ইচ্ছা করছে। খাওয়াবেন?”
বুবকা বলল, “আপনার বাইক? এখানে থাকবে?”
লোকটা বলল, “সেটাও ঠিক। আচ্ছা, আজ বাদ দিন, পরে একদিন খাইয়ে দেবেন। কাজের কথায় আসি, আমার নাম কৌশিক রায়। আমি বৈভবী মার্ডার কেসটা এখন ইনভেস্টিগেট করছি।”
বুবকা বলল, “ডিল করে মাঠে নেমেছেন না সব জেনে-টেনে তারপর রেট ফিক্স করবেন?”
কৌশিক হাসলেন, “ডিল তো শেয়ালে করে। ওই শেয়ালের মাংস ভাগের গল্প পড়েছেন তো?”
বুবকা বলল, “পড়েছি। আচ্ছা বলুন আপনার কী জানার আছে।”
কৌশিক সিগারেটের প্যাকেট বের করে বুবকাকে অফার করলেন, বুবকা নিল না, শুভ উঠে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিল।
কৌশিক বললেন, “দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাটে ঢুকলেন কী করে বলুন তো। পিছন দিক দিয়ে? সামনে তো সিকিউরিটি থাকে দেখলাম।”
বুবকা বলল, “ওই শুয়োরটা আপনাকে আমার নামে নালিশ করেছে নাকি?”
কৌশিক বললেন, “ধুর মশাই, পুলিশকে কী ভাবেন বলুন তো? পুলিশ যদি চেষ্টা করে সব কিছু জানতে পারে।”
বুবকা বলল, “হ্যাঁ, পিছন দিয়ে।”
কৌশিক বললেন, “ঘরে আর কেউ ছিল?”
বুবকা বলল, “সেদিন তো দেখিনি কাউকে।”
কৌশিক সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, “ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, সেদিন দীপ্ত রায়ের বেডরুমে একটা মেয়ে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় ছিল। আজকে ঘরে কাছের ডাক্তার এনে সিক্রেট চিকিৎসা চলছে সে মেয়েটির।”
বুবকা বলল, “ও।”
কৌশিক হালকা চালে বললেন, “আপনি জানতেন না দীপ্ত রায়ের বেডরুমে কেউ ছিল? অলকা দেবী আপনাকে বলেননি কথাটা?”
বুবকা বলল, “অলকা? ও কী করে বলবে? আমি কি জানি নাকি ও কোথায় আছে?”
কৌশিক বললেন, “ওহ, জানেন না? আমি তো ভাবলাম আপনি জানেন।”
শুভ পিছনের সিট থেকে বলল, “জানলে তো ভালোই হত, কতদিন বউটাকে দেখি না।”
কৌশিক পিছনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বউ কেলিয়ে পুরুষসিংহ না আপনি? আপনার কিন্তু অনেক গুণ আছে মশাই।”
শুভ চুপ করে গেল। কৌশিক শুভর বোতলটা নিয়ে বেশ খানিকটা মদ গলায় ঢেলে বললেন, “আজ আসি, কাল একবার শ্যুটিং দেখতে যাব। বাংলা সিরিয়ালের শ্যুটিং দেখা আমার ছোটোবেলার ইচ্ছা, বুঝলেন তো?”
বুবকা বলল, “ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। আশা করব শুধু বাতেলা না মেরে কাজেও কিছু করবেন।”
কৌশিক বুবকার গাড়ি থেকে নেমে দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে বললেন, “আপনার পাহাড় কেমন লাগে বুবকা?”
বুবকা বলল, “ভালো লাগে। আপনার?”
কৌশিক বললেন, “অসাধারণ।”
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কতদিন যাই না, শালার চাকরি!!!”
২৯
বাণীর ঘুম ভেঙে গেল সকাল সকাল।
রাত আড়াইটেয় বাড়ি ফিরেছেন।তিনটেয় শুয়েছিলেন। তবু সাড়ে ছটার সময় ঘুম ভেঙে গেল। উঠে ব্যালকনিতে এসে বসলেন।
মেঘে ঢেকে আছে শহরের আকাশ। বৃষ্টি হবে যে-কোনো সময়।
“চা খাবে?” প্রকাশ এসে দাঁড়িয়েছেন কখন বুঝতে পারেননি বাণী।
বললেন, “তুমি খাবে?”
“আমি এই সময়ে রোজই চা খাই। তোমার অবশ্য তখন মাঝরাত।” হাসলেন প্রকাশ।
বাণী বললেন, “বানাতে হবে নাকি?”
“নাহ, এই জাস্ট বানালাম।”
“হবে আমার?”
“হয়ে বেশি হবে। যাক গে, তোমার প্রেশারের কী হাল? ওষুধ খাচ্ছ নিয়মিত?”
“আর প্রেশার! বুবকা ফিরেছে? দেখলে?”
“না, ফেরেনি।”
