তথাগত রাগি গলায় নিজের মনেই একটা গালাগালি দিয়ে বলল, “সরি, এটা তোমাকে বুবকা বলল?”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ। তো এরপরও তুমি দীপ্ত রায়ের ফোন ধরবে তো? তোমাকে আগেই বলেছিলাম যে শত্রুর সঙ্গে কখনও সব কথা শেয়ার করতে নেই। আশা করি মনে আছে কথাটা?”
তথাগত বলল, “বুবকার গলা শুনে তো সেরকম কিছু মনে হল না!”
বাণী বললেন, “সেটা বুবকা জানে, আমাকে জিজ্ঞেস করে কী করবে! ওদিকে বরাটেরও ট্রান্সফার হয়ে গেল।”
“হ্যাঁ, সেটা শুনেছি।”
“তোমার লোকেশন দেখা কি এখনও চলছে?”
“না, হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম আর-একটা দিন থাকব। এখন মনে হচ্ছে কাল সকালেই যে ফ্লাইট পাই চলে আসি।”
“উঁহুঁ। তুমি এক কাজ করো, আরও দুদিন এক্সটেন্ড করো। ওখানে থেকে যাও।”
“মানেটা কী? এখানে আমি কী করব? কত কাজ আছে কলকাতায়!”
“আমি বলছি তুমি এটাই করবে। আমি আগে পরিস্থিতিটা দেখতে চাই। তারপর ডিসিশন নেব কী করতে হবে।”
বাণী ফোনটা কেটে দিলেন।
তরুণ বললেন, “আমি প্রশ্নটার উত্তরের জন্য বসে আছি বাণী।”
বাণী ক্লান্ত গলায় বললেন, “সবাই একরকম হলে কী করে হবে বলো তো তরুণ?”
২৬
দীপ্ত অফিসে ছিল। রিসেপশনিস্ট ফোন করে জানাল পুলিশের কেউ একজন দেখা করতে এসেছেন।
দীপ্ত ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিন।”
কৌশিক দীপ্তর চেম্বারে ঢুকে বললেন, “বাহ, আপনার তো বেশ রুচি আছে মশাই।”
দীপ্ত বলল, “চা না কফি?”
কৌশিক বললেন, “ডিউটি আওয়ারসে কিছু খাই না।”
দীপ্ত বলল, “ডিউটি আওয়ারসের পরে কী কী খান?”
কৌশিক প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “সবার কাছ থেকে সব কিছু খাওয়া যায় না জানেন তো। আমি আবার পার্টনার চয়েজের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে। বাজে স্বভাব, কান্ট হেল্প ইট, বুঝলেন কি না?”
দীপ্ত বলল, “আমি পার্টনার হিসেবে খারাপ নই, সেটা সবাই বলে কিন্তু।”
কৌশিক সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “অলকানন্দা মুখার্জিও তাই বলতেন নাকি?”
দীপ্ত বলল, “অফকোর্স।”
কৌশিক বললেন, “তা এখন বলছেন না কেন?”
দীপ্ত বলল, “দেখুন, সবার আগে তো আমিই চাই অলকা কোথায় আছে সেটা জানতে। আমি তো অনেকবার আপনাদের রিকোয়েস্ট করেছি কেসটায় যেন হায়েস্ট প্রায়োরিটি দেওয়া হয়।”
কৌশিক বললেন, “আচ্ছা! জানতাম না তো। আপনি ফোর্স করেছেন যখন তখন নিশ্চয়ই দেখা হবে। আপনি একজন পাওয়ারফুল লোক মিস্টার রায়। এখানে আসার আগে তিনটে জায়গা থেকে ফোন এসে গেছে।”
দীপ্ত হাসল, “আমি কাউকে কিছু বলতে বলিনি। সেটা ভাবলে ভুল ভাববেন।”
কৌশিক সিগারেটটা অর্ধেক খেয়ে অ্যাশট্রেতে গুঁজতে গুঁজতে বললেন, “আচ্ছা। আপনার ফ্ল্যাটে একটি মেয়ে আছে, আপনি বলেছেন উনি আপনার বোন?”
দীপ্ত পেপারওয়েটের দিকে মনোযোগ দিল, “হ্যাঁ, দূর সম্পর্কের, শিলিগুড়ি থাকে।”
কৌশিক বললেন, “বেশ। আপনি শরদিন্দু পড়েছেন? আপনারা প্রোডাকশন হাউজ চালান, পড়াশোনা করেছেন আশা করব। অবশ্য আপনাদের সিরিয়ালগুলো দেখলে মনে হয় না কেউ পড়াশোনা করেন বলে, সেই একই বালবিচি জিনিস চালিয়ে যাচ্ছেন গতে ফেলে। সরি, স্ল্যাং ইউজ করে ফেললাম, কিছু মনে করবেন না। যে কথা বলছিলাম, শরদিন্দু পড়েছেন?”
দীপ্ত বলল, “সব পড়িনি কিছু কিছু পড়েছি। ব্যোমকেশ পড়েছি খানিকটা।”
কৌশিক মাথা নাড়লেন, “না, এটা ব্যোমকেশ রিলেটেড না। যাক গে, একটা গল্প আছে, যেখানে এক বাদশার কাজই ছিল নারী ভোগ করা। প্রতিদিন নতুন নতুন নারী। তা হয়েছে কী…”
দীপ্ত বাধা দিল, “এসব গল্প আমাকে শুনিয়ে কী বলতে চাইছেন অফিসার?”
কৌশিক আবার প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাতে ধরাতে বললেন, “ডাক্তার বলেছে সিগারেট কম খেতে, বুঝলেন? তা হাফ করে খাচ্ছি। আশা করি ডাক্তারের বাবার এতে কোনও অসুবিধা হবে না। বাদ দিন, আমি যখন একটা কথা বলব, বাধা দেবেন না বুঝেছেন? এসিতে আছেন, এসি গাড়িতে চড়ছেন, বন্ধ ঘরে যখন থার্ড ডিগ্রি খাবেন তখন বুঝবেন পুলিশ কী জিনিস, এখনও বোঝেননি।”
দীপ্ত রেগে বলল, “এসব কী ভাষায় কথা বলছেন?”
কৌশিক অ্যাশট্রেতে ছাই ফেলতে ফেলতে বললেন, “কোন ভাষায় কথা বলব বলুন দেখি আপনার সঙ্গে! আপনিই ঠিক করে দিন নাহয়।”
দীপ্ত বলল, “আপনি আমার রিচ জানেন না।”
কৌশিক বললেন, “আপনিও আমার রিচ জানেন না। নিন্দুকেরা বলে নরকেও আমি লোক-টোক রাখি, বুঝলেন?”
দীপ্ত বলল, “আমি আপনাকে আর কিচ্ছু বলব না। আমার লইয়ার আপনার সঙ্গে কথা বলবে।”
কৌশিক বললেন, “বেশ তো। সে আপনি যাকে খুশি আমার সঙ্গে কথা বলাতে পাঠাতে পারেন। যাই হোক, একটা কথা বলুন দিকি, বরাটের সঙ্গে কত টাকায় ডিল হয়েছিল?”
দীপ্ত বলল, “কী উলটোপালটা কথা বলছেন? বরাটের সঙ্গে আমার ডিল কেন হবে?”
কৌশিক সিগারেটটা আবার অর্ধেক খাওয়ার পর অ্যাশট্রেতে বাকি ভাগটা গুঁজলেন, বললেন, “আপনি অ্যাক্টিং করতে পারেন তো! ভালো অ্যাক্টিং জানেন আপনি, দেখতেও ভালো, কী যে করছেন।”
দীপ্ত গম্ভীর হয়ে বলল, “সেটা আমার পার্সোনাল চয়েস, হু দ্য হেল আর ইউ যে আমাকে এসব কথা বলছেন। দু টাকার অফিসার!”
কৌশিক মুখে চুক চুক শব্দ করতে করতে বললেন, “ওসব বলবেন না, টাকার কথা বলে দুঃখ বাড়াবেন না। বরাটের ট্রান্সফার হয়েছে শুনেছেন তো?”
দীপ্ত বলল, “না, আমি কিছু জানি না তো।”
কৌশিক হাসতে লাগলেন, হাসতে হাসতে বললেন, “আপনি তো কিছুই জানেন না দেখি। বাবার নামটা জানেন তো?”
দীপ্ত রেগে উঠে দাঁড়াল, “জাস্ট গেট আউট ফ্রম হিয়ার। আপনি কোথায় পা দিয়েছেন সেটা আপনি নিজেও জানেন না।”
কৌশিক কাঁধ ঝাঁকালেন, “আমি একটা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলাম, বেশ তো, আপনি কথা বলতে চান না। আমার কী! আচ্ছা শুনুন,এখন অবধি যা যা বললাম সেগুলো নিশ্চয়ই অনেককে এবার আপনি রিলে করে শোনাবেন, সেসব হয়ে গেলে একবার থানায় আসবেন। আজকেই। সরকারি নিমন্ত্রণপত্রখানা পাঠিয়ে দিচ্ছি একটু পরেই। বাই।”
কৌশিক দীপ্তর উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
দীপ্তর হাতে তার ফোনটা ছিল। সেটাই দেওয়ালে ছুড়ে মারল রাগের মাথায়।
২৭
“তার মানে তোমাকে এখন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে?” প্রীতিকা বলল।
বাইরে অন্ধকার। সব কটেজগুলোয় আলো নিভে গেছে। কটেজের সামনের বারান্দার চেয়ারে বসেছিল তারা।
তথাগত বলল, “আলোটা নিভিয়ে দেব?”
প্রীতিকা বলল, “কেন?”
তথাগত বলল, “অস্বস্তি হচ্ছে কেমন একটা। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।”
প্রীতিকা বলল, “এখন কটা বাজে?”
তথাগত মোবাইল দেখল, “দশটা।”
প্রীতিকা বলল, “ভাবা যায়? কলকাতায় এখন…”
তথাগত বলল, “হুঁ, দীপ্তানুজ পৌঁছল নাকি কে জানে!”
প্রীতিকা বলল, “ও ট্রেনে গেল তো। ফ্লাইটে না।”
তথাগত বলল, “ওহ। হ্যাঁ। তিস্তার ওখানে জ্যাম ছিল শুনছিলাম। পাহাড়ে একবার ধ্বস নামলে বিচ্ছিরি ব্যাপার কিন্তু।”
প্রীতিকা বলল, “সম্পর্কেও।”
তথাগত বলল, “মানে?”
প্রীতিকা বলল, “তোমাদের পরিবারে যেমন।”
তথাগত বলল, “হুঁ।”
প্রীতিকা বলল, “তুমি বুবকাকে ভয় পাও না?”
তথাগত বলল, “আমি কেন ভয় পেতে যাব? তবে হ্যাঁ, ও মাঝে মাঝে নিজের লিমিটটা বোঝে না। তখন বিরক্ত হই।”
প্রীতিকা বলল, “লিমিটটা বোঝানোর ওকে চেষ্টা হয়নি কোনও কালেই, সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। বেশি আদরে মানুষ হয়েছে। নইলে এত অ্যাডামেন্ট হয় না।”
তথাগত কিছু বলল না। প্রীতিকা বলল, “তুমি এত চুপচাপ হয়ে গেছ কেন? বুবকাকে দীপ্ত রায় কী বলেছে তাতে কি কিছু প্রমাণ হয়?”
তথাগত বলল, “দীপ্ত খুব ধূর্ত একজন মানুষ প্রীতিকা। ওকে রিড করা শিবেরও অসাধ্য।”
প্রীতিকা বলল, “আর তুমি?”
তথাগত বলল, “মানে? আমাকে তুমি পড়তে পারো না?”
প্রীতিকা বলল, “আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাইছি। তুমি কী? তোমাকে রিড করা সহজ? তুমি বুবকাকে জড়িয়ে পর্যন্ত আমাকে সন্দেহ করো, সেদিন প্রশ্নটা না করলে আমি জানতে পারতাম?”
তথাগত বিরক্ত হল, “এখন এইসব প্রসঙ্গ কেন তুলছ?”
প্রীতিকা বলল, “ইদ্রিশ কী বলছে?”
তথাগত বলল, “কী বলবে! দীপ্ত রায়কে মেরেছে বুবকা, বাণী মিত্র তরুণ দাসের সঙ্গে ক্লোজ ডোর মিটিং করছে, কৌশিক রায় সবাইকে জেরায় জেরায় অস্থির করে তুলছে। আমার খোঁজেও নাকি অফিসে গেছিল!”
প্রীতিকা বলল, “ক্লোজ ডোর মিটিং? তোমার মায়ের চেম্বারে সোফাও আছে না?”
তথাগত কয়েক সেকেন্ড থমকে বলল, “এত কিছু শুনে তোমার এই কথাটা স্ট্রাইক করল?”
প্রীতিকা হাসতে হাসতে বলল, “ওহ, সরি সরি, আসলে একগাদা ফিল্মি ম্যাগাজিন পড়ছিলাম তো একটু আগে, গসিপ মুডে চলে গেছিল মনটা।”
তথাগত থমথমে গলায় বলল, “লাইফ ইজ নট ফিল্ম প্রীতিকা, সব কিছু এত সোজা না। স্ট্রেট লাইনে কেচ্ছা খোঁজাটা বন্ধ করো দয়া করে।”
প্রীতিকা বলল, “সরি সরি। আচ্ছা, সেকেন্ড পয়েন্টটা ধরি, কৌশিক রায়টা কে?”
তথাগত বলল, “সিআইডি। ভীষণ সৎ অফিসার।”
প্রীতিকা বলল, “কোন একটা সিনেমায় একটা ডায়লগ শুনেছিলাম না? কেউ সৎ নয়, সবাই একটা দামে ঠিক বিকিয়ে যায়?”
তথাগত বলল, “কে কিনবে ওকে?”
প্রীতিকা বলল, “যে বৈভবীকে খুন করেছে, সে!”
তথাগত বলল, “বৈভবীকে কে খুন করেছে বা আদৌ কেউ খুন করেছে নাকি তুমি জানো?”
প্রীতিকা বলল, “জানি না তো। কে কোথায় কী করে আসে সব কি আর আমায় বলে?”
তথাগত বলল, “তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ?”
প্রীতিকা বলল, “কেন, তুমি কি সন্দেহ করার মতো কিছু করেছ? আচ্ছা আমাকে একটা কথা বোঝাও তো, বৈভবী আগরওয়ালের সঙ্গে মন্দারমণি যেতে যাবে কেন?”
তথাগত বলল, “সেটা আমি কী করে জানব?”
প্রীতিকা বলল, “গেস করো কিছু একটা। কৌশিক রায় না কার কথা বললে, সে যদি জিজ্ঞেস করে তখন বলতে হবে তো!”
তথাগত বলল, “দিস ইজ নট ফান প্রীতিকা। হতেই পারে বৈভবীকে আগরওয়াল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সিনেমায় চান্স দেবে বলে। হু নোজ?”
প্রীতিকা বলল, “বৈভবী কি ফ্রেশার নাকি? ও এত সহজে মেনে নেবে?”
তথাগত বলল, “মানা না মানাটা তো যার যার ওপর। যৌবনোত্তীর্ণা নায়িকা, যে কাজ পাচ্ছে না, সে যদি কম্প্রোমাইজ করতে চায় কে দেখতে যাচ্ছে?”
প্রীতিকা বলল, “তোমার কাছে কম্প্রোমাইজের অফার আসে?”
তথাগত বলল, “আমি কদিন এসেছি আর!”
প্রীতিকা বলল, “ওহ, তো এলে কী করবে?”
তথাগত বলল, “তুমি কি আমাকে ওদের মতো ভেবেছ?”
প্রীতিকা বলল, “আচ্ছা বাদ দিলাম। কৌশিক রায় সম্পর্কে কী ভেবেছ?”
তথাগত বলল, “কিছু ভাবিনি। কী ভাবব?”
প্রীতিকা বলল, “সেই। পুলিশকে তো শুধু দোষীরাই ভয় পায়। নির্দোষ লোক ভয় পাবে কেন? একটা কথা মনে রেখো, যদি কিছু করেও থাকো, ওরা কিন্তু সব আটঘাট বেঁধেই তোমার কাছে আসবে, কারণ তোমরা প্রভাবশালী। সো বি প্রিপেয়ারড।”
তথাগত বলল, “তুমি ধরেই নিয়েছ আমি বৈভবীকে মেরেছি?”
প্রীতিকা হাসল, “আমার ধরা না ধরায় কারও কিছু যায় আসে না।”
তথাগত বলল, “দেন শাট দ্য ফাক আপ, বি…”
প্রীতিকা বলল, “বিচ? বিচ বলছিলে? বাহ…”
তথাগত বলল, “সরি, আমি রিয়েলি সরি।”
প্রীতিকা ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি ঘুমাতে গেলাম। গুড নাইট।”
তথাগত কিছু বলল না। চুপচাপ বসে রইল।
২৮
“গুরু তোমার তো এখন দেখি কিছুতেই নেশা হয় না!”
