“ইএমআই স্যার। কী এমন পড়ে।”
“সে তো বটেই, পঞ্চান্ন লাখের ফ্ল্যাটের আর কী এমন ইএমআই পড়ে। আপনি তো দেখছি অঙ্কেও খুব পাকা। বেশ বেশ। আপনি যেতে পারেন।”
ঘরটা থেকে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে বরাট একটা নম্বরে ফোন করলেন। নম্বরটি নেটওয়ার্ক সীমার বাইরে বলছে।
বাইরে এসে গাড়িতে উঠলেন। অস্থির লাগছে মাথা। ড্রাইভারকে বললেন, “কোন চায়ের দোকানে দাঁড় করাস।”
ড্রাইভার গাড়িটা নিয়ে রাস্তায় নামল। ফোনটা বাজছিল আবার। বরাট ধরলেন, “কে?”
“স্যার আপনি আমার নম্বরটা এখনও সেভ করেননি?”
“বলো বলো কী বলবে? বেকার ভাট বোকো না তো! মেজাজ গরম আছে।”
“কেন স্যার? ডিসিশনটা জানিয়ে দিল?”
“হুঁ।”
“দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাটে তুলকালাম হয়েছে কাল, শুনেছেন তো?”
“আমি শুনে কী করব? নাচব? তুমি তো জানোই এই কেসের চার্জে আমি নেই।”
“স্যার কৌশিক রায় খুব বাজে লোক।”
“বাজে মানে?”
“মানে অনেস্ট স্যার।”
“আমাকে এসব বলছ কেন?”
“মানে স্যার আপনাকে তো রেসপেক্ট করি, এমনিই বললাম।”
“আর বলে কী করবে?”
“হ্যাঁ স্যার। আপনার ট্রান্সফারটাও পাক্কা। একদম ঘোড়ার মুখের খবর স্যার।”
“তুমি খুশি তো?”
“আমি কেন খুশি হব স্যার? আপনি আমাকে কাবাব…”
বরাট ফোনটা কেটে দিলেন।
বাকিটা শোনার প্রয়োজন বোধ করলেন না।
২৫
“তোমার ছেলে হাতের বাইরে চলে গেছে বাণী।”
তরুণ টেবিলের পেপারওয়েটটা নাড়তে নাড়তে কথাটা বললেন।
বাণী গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। বললেন, “কেন, শ্যুটিংয়ে এসেছে তো, ঠিক ঠাক ছিল না আজ?”
তরুণ বললেন, “কেন থাকবে না, ওর রক্তে অভিনয়।”
বাণী তরুণের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, “তবে? সমস্যাটা কী?”
তরুণ বললেন, “ও কিছু একটা আন্দাজ করেছে। ওর চোখ সেটা বলছে।”
বাণী বললেন, “দীপ্ত কিছু একটা প্ল্যান করেছে তরুণ, ওকে যতটা ভালো ভাবতাম ও ততটাই খারাপ। বুঝতে পারছ ওর প্ল্যানটা?”
তরুণ বললেন, “হ্যাঁ, ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইকে লড়াতে চাইছে। তোমাকেও সন্দেহের বাইরে রাখেনি বুবকা দীপ্তর কথা শোনার পরে। এর মানে তোমার সোনার সংসারে ভাঙন।”
বাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সংসার আমার কোনও কালেই সোনার ছিল না তরুণ। সেটা তোমার থেকে ভালো কারও জানার কথা নয়।”
তরুণ বললেন, “তবু। এবার তো ডিজাস্টার আসছে।”
বাণী বললেন, “বুবকা এখনও ফ্লোরে আছে?”
তরুণ বললেন, “আছে।”
“আর ওই ছেলেটা?”
“গাড়িতে আছে। তোমার কথা শুনেছে।”
বাণী বললেন, “আর শুনে কী হবে? স্বয়ং ছেলেই তো দীপ্তকে মেরে এসেছে।”
তরুণ বললেন, “বেশ করেছে। বাপ কা বেটা।”
বাণী বললেন, “এভাবে মাথা গরম করাটা কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না তরুণ। আমি তো অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে এখনও পুলিশ বুবকাকে অ্যারেস্ট করছে না কেন?”
তরুণ বললেন, “কারণ ওদিকেও অনেক ভাঙাগড়া চলছে।”
বাণী অবাক হলেন, “মানে?”
তরুণ বললেন, “বরাটকে সরিয়ে দিয়েছে বৈভবী মার্ডার কেসের চার্জ থেকে। নতুন অফিসার এসেছে।”
বাণী বললেন, “তুমি কোত্থেকে জানলে?”
তরুণ বললেন, “জেনে গেছি, না জানার তো কিছু নেই। সর্বক্ষণ ফ্লোরে পড়ে আছি বলে ভেবেছ আমি কিছুই জানি না?”
বাণী বললেন, “তার মানে আবার সব নতুন করে…?”
তরুণ বললেন, “হ্যাঁ, তবে এতদিন পরে কেস রি-ওপেন হবে। কতটা কী হবে সে ব্যাপারে আমি অতটা নিশ্চিত হতে পারছি না।”
বাণী বললেন, “নিজেকে কুন্তীর মতো মনে হচ্ছে। ছেলেরা যুদ্ধ করবে, আর আমি কিছুই করতে পারছি না।”
তরুণ বললেন, “আবার ভুল করছ। এক্ষেত্রে তুমিও সাসপেক্ট লিস্টে আছ। ভুলে গেলে, সিনেমাটা করতে বুবকাকে সবচেয়ে বাধা তুমিই দিয়েছিলে?”
বাণী বললেন, “বুবকা আমার সবথেকে প্রিয় সন্তান তরুণ। বৈভবী আমার পুত্রবধূ হয়ে আসবে এটা আমার কাছে এখনও দুঃস্বপ্ন। অ্যাক্সিডেন্ট হোক কিংবা মার্ডার, যা হয়েছে তা কি খুব খারাপ হয়েছে?”
তরুণ বাণীর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, “বুবকার তোমার সম্পর্কে সন্দেহটা অমূলক নয় বলতে চাইছ?”
বাণীর ফোন বাজছিল। ফোনটা দেখে বললেন, “নাও, তথাগত ফোন করছে।”
তরুণ গম্ভীর মুখে বললেন, “আমার প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে যাচ্ছ?”
বাণী ফোনটা ধরলেন, “বলো।”
“মা, বুবকা ফোন করেছিল।” তথাগতর গলাটা থমথমে।
বাণী ঠান্ডা গলায় বললেন, “কী বলছে? তোমায় হুমকি দিয়েছ?”
তথাগত বলল, “না, স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করেছে এই রবিবার কোথায় নাকি সবাই মিলে লাঞ্চ করতে যাবে, প্রীতিকাকে ভেনু ঠিক করার জন্য ফোন করেছিল।”
বাণী বললেন, “এ তো ভালো ব্যাপার, তোমার গলাটা এরকম লাগছে কেন? তোমার ফোনেরই বা কী হয়েছিল, কিছুতেই পাওয়া যাচ্ছিল না!”
তথাগত বলল, “লোলেগাঁও গেছিলাম লোকেশন দেখতে। কোনও কারণে টাওয়ার পাচ্ছিলাম না।”
বাণী বললেন, “এটা দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হল। প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা দাও। তোমার গলাটা এমন লাগছে কেন? সবাই ঠিক আছ তো?”
তথাগত বলল, “এরকম লাগছে কারণ আমি খবর পেলাম বুবকা কাল দীপ্ত রায়ের বাড়ি গিয়ে দীপ্তর সঙ্গে ঝামেলা করে এসেছে। মারধরও করেছে এবং সেটা একতরফা।”
বাণী বললেন, “তোমাকে সে খবরটা কে দিল? দীপ্ত নিজে?”
একটু ইতস্তত করে তথাগত বলল, “হ্যাঁ।”
বাণী বললেন, “বাহ, বেশ। তো তোমাকে দীপ্ত এটা বলেছে যে সে বুবকাকে বলেছে বৈভবীকে মারার প্ল্যানে তুমিও ছিলে ওর সঙ্গে?”
