বুবকা খাচ্ছিল। খাওয়া বন্ধ না করে নিস্পৃহ গলায় বলল, “না তো, কে এইসব রটাচ্ছে?”
বাণী বুবকার দিকে তাকালেন। ছোটোবেলায় স্কুলে মারপিট করে এসেও ছেলেটা এভাবেই ঠান্ডা থাকত।
বললেন, “আমাকে যে ফোন করেছে সে তো বাজে খবর দেবে না। তুমি কেন স্বীকার করছ না বুবকা?”
বুবকা মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল, “ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে?”
বাণী বললেন, “তুমি একজন সেলিব্রিটি হয়ে একটা হাউসের মাথাকে মেরে চলে আসবে, আর ভেবেছ এই খবরটা কেউ জানবে না? কেন করলে এরকম?”
বুবকা বলল, “দীপ্ত রায় স্বীকার করেছে বৈভবীকে মার্ডারের পিছনে ওর হাত আছে।”
বাণী বুবকার দিকে তাকালেন। বুবকার কোনও উত্তেজনা নেই। আবার খাওয়া শুরু করেছে।
বাণী বললেন, “এটা তুমি ওকে মেরে ধরে জানতে পারলে?”
বুবকা বলল, “আরও জানতে পারলাম এই প্ল্যানে ওর সঙ্গে দাদাও ছিল।”
বাণী আড়চোখে দেখলেন রান্নার মেয়েটা আছে নাকি। মেয়েটা রান্নাঘরেই আছে দেখে আশ্বস্ত হয়ে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ এটা একটা ট্র্যাপ? দীপ্ত মিথ্যে বলছে? এই পুরো ব্যাপারটাই দীপ্ত করিয়েছে যাতে তোমার সঙ্গে তোমার দাদার ঝামেলা বেধে যায়। আমাদের ফ্যামিলিতে যত ঝামেলা থাকবে তত ও কমফর্টেবল পজিশনে থাকবে। সেটা বোঝো?”
বুবকা বলল, “বুঝি। আমি তো কোনও রিঅ্যাক্ট করিনি। করেছি কি?”
বাণী অসহায় বোধ করলেন। এই বুবকাকে তিনি চিনতে পারছেন না। এর চেয়ে ঝামেলা করত, চ্যাঁচামেচি করত, তাহলে অন্তত বুঝতে পারতেন বুবকা রেগে আছে। এভাবে তো বুবকাকে পড়াই যাচ্ছে না!
বললেন, “তুমি খেয়ে কোথায় যাবে?”
বুবকা বলল, “বলা যাবে না।”
বাণী বললেন, “কেন বলা যাবে না জানতে পারি?”
বুবকা উঠল, “আমার আর খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি বেরোই।”
অনেকটা খাবার না খেয়েই বুবকা উঠে গেল। বাণী বললেন, “এমন কিছু কোরো না, যাতে যেটুকু সম্মান অবশিষ্ট আছে, সেটুকুও নষ্ট হয়ে যায়।”
বুবকা মুখ ধুচ্ছিল।
মুখ মুছে বাণীর সামনের চেয়ারে এসে বসে বলল, “মা, আমি জাস্ট তোমাকে একটা ফেয়ার চান্স দিতে চাই। তুমি শুধু আমাকে একটা কথা জানাও। বৈভবীর মার্ডারে তুমি কি যুক্ত আছ না নেই? আশা করব মিথ্যে কথা বলবে না।”
বাণী বুবকার চোখে চোখ রেখে বললেন, “মাকে খুনি বলতে চাইছ তুমি? তুমি ভুলে যেয়ো না সিপিকে বলে আমিই বৈভবীর কেসটা রি-ওপেন করিয়েছি।”
বুবকা হাসল, “বিশ্বাস করো, অন্য কারও থেকে যখন জানতে পারি ঘরের কেউ ব্যাকস্ট্যাব করেছে, খুব কষ্ট হয়।”
বাণী বললেন, “যেখানে যাচ্ছিলে যাও। দেরি হয়ে যাবে।”
বুবকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, “রবিবারের প্রোগ্রামটা বউদির সঙ্গে কথা বলে জানিয়ে দিয়ো কোথায় হবে। এলাম।”
বাণী চুপ করে বসে থাকলেন।
বুবকা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
২৪
“মিস্টার বরাট, আপনি একটু বলবেন বৈভবী এবং আগরওয়ালের অ্যাক্সিডেন্ট কেসটার জিস্টটা? বেশি সময় না নিয়ে অবশ্যই।”
এসি চলছিল। তবু বরাটের ঘাম হচ্ছিল। তিনি রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বললেন, “স্যার, উনত্রিশে মার্চ রাতে ওঁরা দুজন মন্দারমণি যাচ্ছিলেন।”
“এক মিনিট। আপনি কী করে জানলেন ওঁরা মন্দারমণিই যাচ্ছিলেন?”
“স্যার, ড্রাইভারকে আগরওয়াল সেদিন বিকেলে ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন মন্দারমণি যাবেন।”
“ওকে। মানে প্ল্যানটা চেঞ্জ হলেও কেউ কিছু জানতেন না, তাই তো?”
“হ্যাঁ স্যার। আমরা ড্রাইভারের বক্তব্যটাতে গুরুত্ব দিয়েছি।”
“বেশ, গো অ্যাহেড।”
“এর পরের ঘটনা স্যার তো সবাই জানে। কাগজেও বেরিয়েছে।”
“কাগজে বেরোনো আর আপনার মুখ থেকে শোনার মধ্যে অনেক তফাত আছে বরাট। আপনি বলে যান। আমরা শুনছি।”
“এর পরে সাঁতরাগাছি পেরিয়ে বম্বে রোডে পড়ে ওরা অ্যাক্সিডেন্টটা করে।”
“কী করে, বলুন।”
“মানে, গাড়িটা রং সাইড থেকে একটা ট্রাককে ওভারটেক করতে যায়, ট্রাকটা বোঝেনি, আচমকা লেগে যায় গাড়িতে। গাড়িটা পালটি খায়। দুজনেই স্পট হয়ে যায়।”
“হুঁ। গুড। গাড়ির ড্রাইভারকে কী কেস দেওয়া হয়েছিল?”
“ফাইল দেখতে হবে স্যার।”
“ফাইল দেখতে হবে কেন?”
“স্যার অনেক দিন তো হয়ে গেল, এখন ঠিক মনে পড়ছে না আর কি।”
“বাহ। খুব রেসপন্সিবল লোক তো আপনি। ভেরি গুড। তা ভুল করেও নিশ্চয়ই অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা করা হয়নি?”
“ইয়ে স্যার মনে পড়ছে না।”
“আমি মনে করিয়ে দেব বরাটবাবু? একটা পেটি কেস দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। খুবই পেটি কেস,
ছেলেটার জামিন পর্যন্ত হয়ে গেছে। জানেন আপনি জামিন হয়ে গেছে?”
“না স্যার, জানি না।”
“এক্সপেক্টেড। আচ্ছা আপনি কী করেন থানায় এসে? নাকি সারাদিন ট্রাক ধরেন আর নোট গোনেন?”
“ছি ছি স্যার এসব কী কথা!”
“এই কেসটা কত টাকায় ডিল হয়েছিল? একজ্যাক্ট অ্যামাউন্টটা কত?”
“এসব কী বলছেন স্যার!”
“আপনার ভুলে যাবার বহর দেখে তো আরও অনেক কিছুই মনে পড়ছে। এই মুহূর্তে আপনাকে এই কেস থেকে রেহাই দেওয়া হল। আপনি কৌশিক রায়কে চার্জ হ্যান্ডওভার করে দেবেন। শো কজ খাবেন একটা হালকা করে। লিখিত উত্তর তো, একটু সাবধানে দেবেন। দেখবেন ডিপার্টমেন্টাল ইনভেস্টিগেশন না শুরু হয় আপনার এগেনস্টে। খুঁটি আছে?”
“না না স্যার, ওসব নেই।”
“থাকলে কি আর বলতেন? আচ্ছা, আপনি একটা এইচআইজি ফ্ল্যাট কিনেছেন না রিসেন্টলি রাজারহাটে? কত দিয়ে যেন?”
