তথাগত ক্যামেরাটা নিয়ে জঙ্গলের ছবি তুলছিল, প্রীতিকার কথায় অবাক হয়ে বলল, “তুমি তো দেখছি এসব ব্যাপারে আমার থেকেও বেশি জানো। কোত্থেকে শুনলে বলো তো?”
প্রীতিকা বলল, “গোটা ইন্ডাস্ট্রি জানে। শুধু তুমিই জানো না।”
দীপ্তানুজ বলল, “আমার ট্রুথ হাউজের গল্পটা একজনকে শুনিয়েছিলাম। যেই ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ারের পার্টটা শুনেছে, বলছে এরকম একটা সিনেমা নাকি হয়েছে। ভাবুন জাস্ট, ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার নিয়ে আর কোনও সিনেমা বানানো যাবে না? অথচ এই সিনেমাটার মেইন কনসেপ্টটা কিন্তু ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার না, ট্রুথ হাউজ।”
প্রীতিকা বলল, “কোন সিনেমাটা হয়েছে?”
দীপ্তানুজ নামটা বলল।
তথাগত বলল, “শিট, এ তো অন্য প্রবলেম ক্রিয়েট হয়ে গেল। সিনেমাটা দেখা যাবে? তাহলে অ্যাটলিস্ট কম্পেয়ার করে দেখা যেত।”
দীপ্তানুজ বলল, “কলকাতায় গিয়ে নাহয়…”
তথাগত ভ্রূ কুঁচকাল, “ওকে, ভুলো না, ফুলপ্রুফ না হলে মাকে শোনাব না, তরুণ দাস বড়ো খুঁত ধরা ডিসগাস্টিং একটা লোক।”
প্রীতিকা বলল, “সেক্ষেত্রে ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার না রেখে অন্য কিছুও তো রাখা যেতে পারে?”
তারা হ্যাংগিং ব্রিজে উঠল। একটু হেঁটেই প্রীতিকা বলল, “আমার শুধু মনে হচ্ছে পড়ে যাব।”
তথাগত প্রীতিকার হাত ধরল।
দীপ্তানুজ বলল, “ট্রুথ অ্যান্ড ডেয়ার না রেখে কী রাখব তাহলে?”
তথাগত বলল, “ভাবো ভাবো, ব্রেইন স্টর্মিং করো। ট্রুথ হাউসের কনসেপ্টটা রেখে যেটা খুশি ভাবো। ইউ আর ফ্রি টু থিংক। শুধু বুঝে নিয়ো গল্প যেন মৌলিক হয়। নইলেই ঝামেলা।”
ব্রিজ থেকে নেমে প্রীতিকা বলল, “এই ব্রিজটায় চড়ার জন্য এত দূর এলাম?”
দীপ্তানুজ বলল, “এখন তো মেঘ আছে, একটা ভিউ পয়েন্ট আছে, সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব ভালোমতো দেখা যায়।”
তথাগত বলল, “সকাল থেকে আজ কী হয়েছে কে জানে, মোবাইলের টাওয়ার পাচ্ছি না, তোমরা কেউ পাচ্ছ?”
দীপ্তানুজ কাঁচুমাচু মুখে বলল, “আমার ফোনটা কাল রাতে চার্জ দিতে ভুলে গেছিলাম। সকালে বেরোনোর সময় দেখি সুইচড অফ হয়ে পড়ে আছে।”
প্রীতিকা বলল, “আমার আর তোমার তো একই সার্ভিস প্রোভাইডার। অন্য কোনও সিম থাকলে ভালো হত।”
সামনে এক ভদ্রলোক জঙ্গলে ফটো তুলতে ঢুকেছিলেন, লাফাতে লাফাতে বেরোলেন, দু পায়ে দুটো জোঁক জড়িয়ে ধরেছে, প্রীতিকা তাড়াতাড়ি গিয়ে নুন ছিটিয়ে দিল। তথাগত সন্দিগ্ধ চোখে নিজের জুতোজোড়া দেখে নিল। বলল, “এইখানে শ্যুটের কথা কিছুতেই ভাবা যাবে না। এত জোঁকে কীভাবে কাজ করব?”
দীপ্তানুজ বলল, “বাবুনবাবুকে তাহলে বলে দিতে হবে।”
তথাগত বলল, “কিন্তু তোমার গল্প ফাইনাল করো আগে। নইলে তো এখানে আসাটাই বৃথা হয়ে যাবে।”
দীপ্তানুজ বলল, “আমাকে দুটো দিন সময় দিন। আপনিও একবার আগের সিনেমাটা দেখে নিন।”
তথাগত বলল, “বেশ।”
তারা গাড়িতে গিয়ে উঠল। প্রীতিকা বলল, “লাঞ্চের কথা ভাবছ না তো কেউ? ব্রেকফাস্ট তো হেভি করেই বেরিয়েছিলাম।”
তথাগত বলল, “আমার তো এখানে কিছুক্ষণ পর পরই খিদে পাচ্ছে। যাই হোক, তাতে সমস্যা নেই, লাভায় গিয়ে খেয়ে নেওয়া যাবে দেন।”
তথাগতর ফোনটায় একটা মেসেজ এল। তথাগত বলল, “এই দ্যাখো, টাওয়ার লুকোচুরি খেলছে এদিকে আবার এসএমএস আসছে। কে দেখি… ওহ ইদ্রিশ, লিখেছে কল ইমিডিয়েটলি, আর্জেন্ট।”
তথাগত প্রীতিকার দিকে তাকাল।
দীপ্তানুজ বলল, “কোনও হোটেলে দাঁড়ানো যাক তাহলে। আপনি ফোনটা সেরে নিন।”
২৩
বাণীর ঘুম ভেঙেছে সকাল সাড়ে এগারোটায়। ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে দেখলেন বুবকা কোথাও যাবার জন্য জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে বসে আছে।
বললেন, “এখন উঠলে? কোথাও যাবে?”
বুবকা কাগজ পড়ছিল। শুধু বলল, “হ্যাঁ।”
বাণী বললেন, “শ্যুট কটা থেকে আজ?”
বুবকা বলল, “সাতটা।”
বাণী বললেন, “এখন কেমন লাগছে? ইন্টারেস্ট পাচ্ছ কিছু?”
বুবকা বলল, “হ্যাঁ। আচ্ছা, আমি বেরোব এখন।”
বাণী বললেন, “খেয়ে নিয়ে বেরোও।”
বুবকা বলল, “বাইরে খেয়ে নেব। দেরি হয়ে যাবে।”
বাণী উঠে রান্নাঘরে গেলেন। রান্নার মেয়েটার রান্না সবে শেষ হয়েছে। ওখান থেকেই বললেন, “খেয়ে যাও। রান্না হয়ে গেছে।”
বুবকা কিছু বলল না।
বাণী মেয়েটাকে বলে দিলেন বুবকাকে খেতে দিতে।
টেবিলে এসে বসলেন। বললেন, “তোমার বাবার সঙ্গে শেষ কবে তোমার দেখা হয়েছে?”
বুবকা বলল, “ভুলে গেছি।”
বাণী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, “একদিন বাড়ি থেকো। কথা বোলো। এক কাজ করা যাক, এই রবিবারটা আমরা সবাই বাড়ি থাকি। লাঞ্চে কোথাও সবাই একসঙ্গে খেতে যাই। আগে যেমন যেতাম। আমরা প্রতি রবিবারেই এটা করতে পারি। ফার্স্ট ডে কোথায় যাব সেটা তুমি ঠিক কোরো।”
বুবকা বলল, “ফার্স্ট ডে-টা বউদি ঠিক করুক। নিউয়েস্ট ইন দ্য ফ্যামিলি, ওকেই বোলো।”
বাণী খুশি হলেন, বললেন, “ওকে, ডান। ওরা পরশু ফিরছে। রবিবারে কারও কোনও প্রবলেম হবে না আশা করি।”
বুবকাকে ভাত দিল মেয়েটা। বুবকা খেতে শুরু করল। বাণী মোবাইল ঘাঁটছিলেন। ফোন অন রেখেই ঘুমাতে যান, তবে সাইলেন্ট থাকে।
ভ্রূ কুঁচকে নাম্বারগুলো দেখতে দেখতে একটা নাম্বারে কলব্যাক করলেন তিনি, কয়েক সেকেন্ড কথা বলার পরই ফোনটা কেটে বুবকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কাল দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাটে ঢুকে ওকে মারধর করে এসেছ?”
