ঘুম থেকে তুলেই আকস্মিক এই আক্রমণে রিমি প্রথমে হতচকিত হয়ে গেছিল। সামলাতে খানিকটা সময় লাগল তার। তারপর বলল, “আমার কোনও ক্ষতি হলে কিন্তু আপনাকে দায় নিতে হবে। বুঝতেই পারছেন আমি আপনার কেনা চাকর না।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দীপ্তর মাথায় রক্ত উঠে গেল। রিমিকে মারতে মারতে খাটে শুইয়ে হাত পা বেঁধে দিল সে। মুখে কাপড় গুঁজে দিল। তারপরেই সিগারেট দিয়ে রিমির বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত তৈরি করতে করতে বলতে লাগল, “মাগি তোর শরীর বেচে খাওয়া না? এমন অবস্থা করে দিচ্ছি আর শরীর বেচার কথাও ভাবতে পারবি না সারাজীবন।”
রিমি একসময় অজ্ঞান হয়ে গেছিল। যখন জ্ঞান হল তখন দীপ্ত মদ খাচ্ছে বসে বসে। অসহ্য যন্ত্রণা সারা শরীরে। রিমি উঠল না। মড়ার মতো পড়ে রইল। কলিং বেল বাজল।
দীপ্ত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করল। বেডরুমটা বন্ধ করে ফ্ল্যাটের দরজা খুলল সে। বুবকা দাঁড়িয়ে। দীপ্ত ভুরু কুঁচকাল, “তুমি এত রাতে? ঢুকতে দিল কে?”
বুবকা হাসল, “একটা ভালো মদ খাবার জায়গা পাচ্ছিলাম না দীপ্তদা। স্কচ আছে ভালো?”
দীপ্ত বলল, “রাতের শেষের দিকে তোমার এতদিন পরে আমার সঙ্গে মদ খাবার কথা মনে পড়ল?”
বুবকা বলল, “বাইরে দাঁড়িয়েই কথা বলবে?”
দীপ্ত দরজা ছেড়ে দিল।
বুবকা ড্রয়িং রুমে সোফায় বসল। দীপ্ত দরজা বন্ধ করে গম্ভীর মুখে বুবকার সামনের সোফায় বসে টিভি চালিয়ে দিল। স্পোর্টস চ্যানেল। কোন একটা ক্রিকেট খেলার হাইলাইটস চলছে।
বুবকা বলল, “এই টিভিটা নতুন নিলে?”
দীপ্ত বলল, “হ্যাঁ। বলো কী বলবে?”
বুবকা বলল, “মিউট করো। কত নিল?”
দীপ্ত টিভিটা মিউট করে বলল, “ভুলে গেছি।”
বুবকা বলল, “গাড়ির কাচের খবর কী? ঠিক করেছ?”
দীপ্ত কয়েক সেকেন্ড বুবকার দিকে তাকিয়ে বলল, “শুনলাম শুভ তোমার সঙ্গেই থাকে আজকাল। বুদ্ধিটা কার ছিল? তোমার?”
বুবকা টিভি থেকে মুখ সরিয়ে দীপ্তর চোখে চোখ রাখল, “বৈভবীকে আগরওয়ালের সঙ্গে জড়িয়ে খুন করার বুদ্ধিটাও ভালো ছিল। কার ছিল বুদ্ধিটা? তোমার?”
দীপ্ত উঠল। ডাইনিং টেবিল বড়ো ড্রয়িং রুমের এক কোণে। টেবিলের ওপর একটা স্কচের বোতল ছিল, দীপ্ত বোতল আর দুটো গ্লাস এনে বসল। বুবকাকে একটা গ্লাস দিয়ে বলল, “জল দেব না র খাবে?”
বুবকা বলল, “একার বুদ্ধি তোমার? না সঙ্গে কেউ ছিল?”
দীপ্ত পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল, “কয়েক লাখ টাকা ইনভেস্ট করে নিজের সিনেমার অন্যতম লিড অ্যাক্ট্রেসকে মেরে ফেলব? অ্যাপ্লাই সাম কমন সেন্স বুবকা। তোমার প্রেমিকা ছিল, তুমি প্রেমিকা থাকতেও দেবদাস হয়ে ঘুরে বেরিয়েছ, মারা যাবার পরও দেবদাস হয়ে ঘুরছ। একটু বুদ্ধি অ্যাপ্লাই করতে বলছি জাস্ট। হ্যাভ ইউ হার্ড দ্য টার্ম ‘অনার কিলিং’? শুনেছ?”
বুবকা গ্লাসে চুমুক দিল, “এই কনসেপ্টটা আগেও ইনজেক্ট করার চেষ্টা হয়েছে আমার মধ্যে। ইন ফ্যাক্ট আমিও তাই ভাবতাম।”
দীপ্ত সিগারেট খেতে গিয়ে থমকাল, “ভাবতে মানে?”
বুবকা হাসল, “এখন ভাবি না। শুধু ভাবি একটা রাইভ্যালরির জন্য একটা নির্দোষ মেয়েকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করে খুন করতে দুবার ভাবো না তোমরা?”
দীপ্তর চোখ লাল হয়ে গেছিল, সে বুবকার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “তোর ওই মাগি যদি রাস্তায় এসে দাঁড়াত পাঁচশো টাকাও রেট দিত না কেউ বুঝলি? বুড়ি ছিবড়ে হওয়া মাল ছিল একটা। গান্ডুর মতো ওর জন্য নিজের কেরিয়রটা নষ্ট করছিস। তোর তো ভালোই হল বে। ওর জন্য অনেক বেশি টাকা খরচ করেছি। কম্পেনসেট করে দিস।”
বুবকা গ্লাসটা ছুড়ে মারল দীপ্ত রায়ের দিকে। দীপ্তর হাতের কাছে একটা পেপারওয়েট ছিল। সেটা ছুড়ে মারল বুবকার দিকে। একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হল সেটা। বুবকা উঠে দীপ্তর পেটে একটা সপাটে লাথি মারল। দীপ্ত ক্লান্ত ছিল। বুবকার লাথিটা নিতে পারল না। প্রবল রাগের মাথায় বুবকা পরপর ঘুসি মারতে লাগল দীপ্তর মুখে। দীপ্তর ঠোঁটের পাশ দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল।
উদ্দেশ্যহীনভাবে বেশ কয়েকবার লাথি ঘুসি মারার পর বুবকা দীপ্তকে ছেড়ে দিল। টেবিল থেকে নিজের গ্লাসটা নিয়ে স্কচটা শেষ করল। দরজা খুলে বেরোতে যাবে, দীপ্ত ওখান থেকেই চ্যাঁচ্যাল, “হেই সন অফ আ বিচ, শুনতে যখন চেয়েছিস তখন জেনেই যা, দ্য প্রোজেক্ট ওয়াজ কো-প্রোডিউসড বাই মিস্টার তথাগত মিত্র। বেস্ট অফ লাক। যা এবার বাল।”
বুবকা একটু থমকে দাঁড়াল।
তারপর বেরিয়ে গেল।
২২
“গল্প লেখার সবথেকে খারাপ জিনিস কী জানেন?”
দীপ্তানুজ প্রশ্ন করল। তারা লোলেগাঁও পৌঁছেছে কিছুক্ষণ আগে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হ্যাংগিং ব্রিজের দিকে যাচ্ছে। প্রীতিকা নুনের প্যাকেট নিয়েছে ব্যাগে। জোঁকের ভয় এখানে খুব।
তথাগত বলল, “কী?”
দীপ্তানুজ বলল, “অনেক কষ্ট করে লিখলাম, তারপর যদি কেউ বলে গল্পটা কোথাও শুনেছে।”
তথাগত বলল, “প্লটের মিল তো অনেক সময় কাকতালীয় ভাবে মিলে যেতেও পারে। অবশ্য অনেকেই আছে মিল না থাকলেও কষ্টকল্পনা করে মেলাতে ভালোবাসে। এটা ওটার মতো বলার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে।”
প্রীতিকা বলল, “দ্যাট ফেমাস সিনেমাটা, কী যেন নাম, অরিত্রর সেকেন্ড সিনেমাটা, ওর ব্যাপারে যে কথাটা উঠেছিল সেটা মনে আছে? গোটা সিনেমাটার গল্পটাই নাকি আসলে রুদ্রশেখরের একটা গল্প অবলম্বনে ফার্স্ট টু লাস্ট টোকা। রুদ্রশেখর অদ্ভুতভাবে চেপে গেল সে সময়টা। নইলে ব্যাপারটা নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি।”
