রিখিয়া অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “সে তো তিন-চার দিন। আবার নতুন কিছু না কিছু ইস্যু উঠে আসবে।”
বাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই সব কিছু জানে। কিন্তু মাঝে মাঝে মিডিয়া যে নোংরামিগুলো করে সেগুলো ঠিক মেনে নেওয়া যায় না। ওরাও যে পার্ট অফ দ্য ইন্ডাস্ট্রি সেটা ওরা জানে না বোধহয়। বৈভবীর অ্যাক্সিডেন্টের সময় কোন একটা চ্যানেল মনে আছে ঘুরিয়ে আমার দিকেও একটা ইঙ্গিত করেছিল?”
রিখিয়া বলল, “ওরা তো পুলিশের আগেও তদন্ত করে ফ্যালে। রিডিকিউলাস।”
তরুণ দাস নক করলেন। বাণী বললেন, “এসো। হঠাৎ শ্যুটের মাঝে অফিসে এলে, কী ব্যাপার? এনিথিং সিরিয়াস?”
তরুণ চেয়ারে বসে একবার রিখিয়ার দিকে, আর-একবার বাণীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুবকার সঙ্গে যে ছেলেটি থাকে সে অলকার হাজব্যান্ড ছিল তুমি জানো বাণী?”
বাণী বললেন, “না। আমাকে তো কেউ বলেনি। তোমায় কে বলল?”
তরুণ বললেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি জানবে, তুমি তো সবই জানো।”
বাণী বললেন, “মাঝে মাঝে ইম্পরট্যান্ট ব্যাপারগুলোই মিস করে যাই। এটাও সেরকমই ধরে নাও।”
তরুণ গম্ভীর হয়ে বললেন, “ছেলেটা আজ একটা কাণ্ড করেছে।”
বাণী বললেন, “কী?”
তরুণ বললেন, “দীপ্ত রায়ের গাড়িতে ইট মেরেছে।”
বাণী বললেন, “সে কী!”
তরুণ বললেন, “আজ্ঞে। এবং মেরে-টেরে ভদ্রলোক দিব্যি বুবকার সঙ্গে শ্যুটিংয়ে বসে আছে। এবার তিনি এখানে থাকলে মার্কেটে রটবে আমরা ওনাকে শেল্টার দিয়েছি, তেনাকে তাড়াতে গেলে তোমার ছেলেও যে-কোনো সময় বেঁকে বসবে। না পারছি রাখতে, না পারছি ওগরাতে। এবার তুমি বলো কী করবে?”
বাণী মাথায় হাত দিলেন। বললেন, “যেই ভাবলাম বুবকাকে একটু একটু করে আবার কাজে এনগেজ করে দেব, এদিকে এই একটা জট পেকে গেল ঠিক। বলছি না, খুব খারাপ সময় যাচ্ছে!”
রিখিয়া বলল, “একটা পুজো দিয়ো দিদি মায়ের কাছে।”
বাণী বললেন, “পুজো তো নাহয় দেব, কিন্তু এবার কী করব?” তরুণের দিকে ফিরলেন বাণী, “ছেলেটা কী করছে এখন?”
তরুণ বললেন, “দিব্যি ভালোমানুষের মতো শ্যুট দেখছে। দেখে মনেই হচ্ছে না এত কিছু করে এসেছে।”
বাণী বললেন, “আমি যদি পুলিশে খবর দি? ছেলেটাকে নিয়েও যাবে, বুবকাও কিছু করতে পারবে না। ভাববে ছেলেটাকে খুঁজতেই পুলিশ এসেছিল আসলে।”
তরুণ বললেন, “স্টুডিওতে পুলিশ আসাটা ভালোভাবে যাবে না। দীপ্ত রায় কন্ট্রোভার্সিতে আমাদের নাম জড়িয়ে যাবে। লোকজন এও ভাবতে পারে আমরাই অলকাকে গুম করেছি।”
বাণী উঠলেন, “এখানে বসে থাকলে হবে না। স্টুডিওতে চলো।”
১৯
“যাকে ভালোবাসি, যাকে ভেবেছিলাম সে আমায় ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারে না, যদি দেখতে পাই সে আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে, তখন সব কিছু শেষ হয়ে যায় গুরু। মনে হয় সবাইকে গুলি করে মেরে দি।”
শুভ বুবকার গাড়ির পিছনের সিটে শুয়ে ছিল।
রাত আড়াইটে। শহরের রাস্তায় গাড়ি সাইড করে মদ খাচ্ছে তারা।
বুবকা বলল, “তুমি ইটটা মারলে কোন বুদ্ধিতে? দীপ্ত রায়ের এতে কোন বালটা ছেঁড়া যাবে? গাড়ির তো ইন্স্যুরেন্স থাকে, তাও যদি গাড়ির ভিতর দীপ্তদা থাকত তাহলে একটা কথা ছিল। কী যে করো না!”
শুভ বলল, “গাড়িটা দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল গুরু। যখনই মনে পড়ল ওই গাড়িটা করেই অলকাকে নিয়ে যেত শুয়োরের বাচ্চাটা! মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না।”
বুবকা বলল, “লাভ কী হল, এখন তো কদিন শ্যুটিং দেখতেও নিতে পারব না তোমায়।”
শুভ হাসতে লাগল, “কোনও চিন্তা নেই, আমি ওই সময় গাড়িতে বসে থাকব। আর মামা যদি ধরে নিয়ে যায়, তাহলে তো বেঁচেই গেলাম, কদিন ফোকটে সরকারি খানা খেয়ে আসা যাবে।”
বুবকা বলল, “ওই আনন্দেই থাকো। সরকারি ক্যাল তো আর খাওনি।”
শুভ বলল, “খেয়েছি একবার। কী কেস ভুলে গেছি, তবে খেয়েছিলাম লাঠির বাড়ি। ভুলিনি এখনও, বেজায় ব্যথা হয়েছিল। তবে যাই বলো গুরু, তোমার মা কিন্তু খুব ভালো, কী সুন্দর বুঝিয়ে দিলেন এখন কদিন শ্যুটিংয়ে এসো না!”
বুবকা বলল, “যুক্তিটা তো বুঝিয়ে বলল। দাদা থাকলে আজ ঝামেলা হত যদি কিছু বলতে আসত। মা বলে কিছু বললাম না।”
শুভ বলল, “যাক গে, বলেছেন যখন, তখন মেনে নিলাম। যাব না স্টুডিওর ভিতর। তবে তুমি কিন্তু গুরু অ্যাক্টিংটা খাসা করো। যখন গিয়ে দাঁড়াও, তখন মনেই হয় না আঠেরো ঘণ্টা বাবার প্রসাদ আর মালের ভরসায় বেঁচে থাকো। আমি হলে তো ওই লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন শুনেই ভিরমি খেয়ে যেতাম। কেমন নেশার মতো হয়ে গেছিল শ্যুটিং দেখা।”
বুবকা হাসতে লাগল, “যাহ্শালা, এটা খিস্তি মারলে না ভালো বললে?”
শুভ বলল, “ভালো বললাম। তোমার গুরু রক্তে অ্যাক্টিং আছে।”
বুবকা বলল, “রক্তে আছে নাকি জানি না। বাপ ঠাকুরদা তো কেউ অ্যাক্টিং করেনি। যাই হোক, অলকার কোনও খোঁজ পেলে?”
শুভ বলল, “না গুরু, আমি ওর বাপের বাড়িতেও খোঁজ করেছিলাম, কোনও লাভ হল না। অবশ্য খোঁজ পেয়েই বা কী হবে? সে পাখি আর ঘরে ফিরবে না।”
বুবকা বলল, “কী করে জানলে? তুমি অন্তর্যামী নাকি?”
শুভ বলল, “গুরু যা করেছিলাম তারপর কি আর ফেরে? ওই দিনটার আগে গায়ে হাত তুলিনি কোনও দিন। ভাবতেই পারিনি। কী যে হল সেদিন, মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না!”
বুবকা বলল, “তোমাকে দোষও দেওয়া যায় না অবশ্য। মাথা গরম হবারই কথা।”
