তথাগত বিরক্ত গলায় বলল, “তুমি বুবকাকে এখনও চিনতে পারোনি? সোজা সোজা ব্যাপারগুলোকে গুলিয়ে দিতে ওর থেকে ভালো আর কে বলে? সেদিন ওকে টাকা দিইনি বলে এই গেমটা ও আমাদের সঙ্গে খেলেছিল। কথাটা এখনও তুমি মনে রেখে দিয়েছ?”
প্রীতিকা বলল, “কী জানি, কোন কথাটা মনে রাখা দরকার আর কোন কথাটা ভুলে যাওয়া দরকার। তা ছাড়া তোমার সঙ্গে বৈভবীর রিলেশন থাকলেই বা কী হত, শি ইজ হিস্ট্রি নাও।”
তথাগত বলল, “এই কথাটা তো তোমার বোঝা উচিত ছিল। সহ্য করা না করার মধ্যেও তো এখন বৈভবী নেই।”
প্রীতিকা বলল, “আগরওয়ালের সঙ্গে বৈভবী কোথায় যাচ্ছিল?”
তথাগত বলল, “কোথায় আর যাবে, জানোই তো, মন্দারমণিতে। বুবকা ছাড়া সবাই বুঝতে পেরেছে বৈভবী ওখানে আগরওয়ালের সঙ্গে কী করতে গেছিল। নষ্ট মেয়েছেলে একটা। বুবকাকে ইউজ করে যাচ্ছিল।”
প্রীতিকা বলল, “বুবকা কেন, অনেকেই বিশ্বাস করে না সেদিন বৈভবী অন্য কিছু করতে গেছিল।”
তথাগত বলল, “তুমি কিছুই জানো না। তুমি কি জানো এককালে বৈভবী এসকর্ট সার্ভিসে ছিল?”
প্রীতিকা বিস্ফারিত চোখে তথাগতর দিকে তাকাল।
তথাগত বলল, “ওভাবে তাকিয়ো না। ইন্ডাস্ট্রির হাতেগোনা কয়েকটা লোক জানে। এটা পরে যাচাই করে নিতে পারো।”
প্রীতিকা বলল, “হতে পারে। আর্লি লাইফে স্ট্রাগল করার সময়। সেটার সঙ্গে পরের লাইফ গুলিয়ে না দিলেই ভালো হয়। বাই দ্য ওয়ে, ও যখন এসকর্ট ছিল, তোমার সঙ্গে কি ওর দেখা হয়েছিল?”
তথাগত রাগি চোখে প্রীতিকার দিকে তাকাল।
প্রীতিকা হেসে ফেলল, “ওহ, ইয়ার্কিও বোঝো না।”
তথাগত বলল, “এসব ব্যাপারে ইয়ার্কি আমার ভালো লাগছে না। এমনিতেও আমি একটা জিনিস ঠিক করেছি।”
প্রীতিকা বলল, “কী?”
তথাগত বলল, “আমি মাকে পরিষ্কার বলে দেব, বুবকার সঙ্গে আমি কোনওমতেই কাজ করতে পারব না। ও সিরিয়ালের জায়গাটা দেখুক, আমি নাহয় সিনেমাটা দেখি।”
প্রীতিকা বলল, “গুড আইডিয়া। মা-ও হয়তো মেনে নেবে এটা।”
তথাগত বলল, “মেনে নিলে ভালো। নইলে আমি প্যাভিলিয়নে ফিরে যাব। বুবকার সঙ্গে কাজ করা আমার সঙ্গে সম্ভব না। কাল জানো সঙ্গে করে একটা মালকে নিয়ে এসেছে, মালটা মা আড়াল হতেই ফ্লোরে বসে জয়েন্ট বানানো শুরু করে দিয়েছে। জাস্ট ভাবো দৃশ্যটা।”
প্রীতিকা হেসে দিল, “এতে রেগে যাওয়ার কী আছে?”
তথাগত বলল, “রাগব না? অত সিনিয়র আর্টিস্টরা সবাই ছিলেন। পরে শুনলাম ওই মালটাই নাকি দীপ্ত রায়ের কেপ্টের এক্স হাজব্যান্ড।”
প্রীতিকা মনে করার চেষ্টা করল, “দীপ্ত রায়ের কেপ্ট? ওকে চিনি মনে হয়। গয়না কেনার সময় দেখা হয়েছিল। অসাধারণ স্কিন ভদ্রমহিলার। ভেবেছিলাম জিজ্ঞেস করব মুখে কী মাখে।”
তথাগত মুখ বিকৃত করল, “কী আর মাখবে, দীপ্ত রায়ের ওটা মাখে। জঘন্য মেয়েছেলে।”
প্রীতিকা বলল, “বাহ, তোমার তো ভাষার অনেক উন্নতি হয়েছে দেখছি। এর থেকে তো অফিসে কাজ করাটাই ভালো ছিল মনে হচ্ছে এখন।”
তথাগত লজ্জা পেল, “সরি। রাগের মাথায় বেরিয়ে গেল। তুমি জানো না, দীপ্ত রায় একটা স্কাউন্ড্রেল।”
প্রীতিকা বলল, “তুমি প্রেশার চেক করাও। তোমার লক্ষণ আমার ভালো ঠেকছে না। কথায় কথায় রিঅ্যাক্ট করছ আজকাল। চলো, বোর্ডিং-এর হুকুম এসে গেছে। আমার টেনশন টাইম স্টার্টস।”
১৫
একটা ফাঁকা বাড়ি। পাহাড়ি রাস্তার মাঝখানে। শহর থেকে অনেক দূরে।
আর একটা ছোটো বাসে তিনটে ফ্যামিলি চলছে দূর কোনও শহরে। পাহাড়ের রাস্তায় বাসটা খারাপ হয়ে গেল। ড্রাইভার বলল, কিচ্ছু করার নেই। সকাল না হলে কিছু করা যাবে না।
বাসের মেয়েদের টয়লেট পেয়েছে। পুরুষেরা নেমে খানিকটা হেঁটে বাড়িটার কাছে পৌঁছল। দেখল বাড়িতে কেউ নেই, কিন্তু খুব কম পাওয়ারের কতগুলো আলো জ্বলছে। দরজাটা ধাক্কা মারতেই খুলে গেল। মেয়েদের ডাকা হল। সবাই মিলে বাড়িটায় ঢুকল।
বাড়িতে একটাই ঘর। সংলগ্ন টয়লেট আছে। একটা সাইনবোর্ডে বড়ো করে লেখা
“ট্রুথ হাউস। এই বাড়িতে মিথ্যা কথা বলেছেন তো মরেছেন।”
আসুন এবার বাড়িতে কারা কারা ঢুকল দেখে নি,
তিনটে ফ্যামিলি।
ফ্যামিলি ১– তিনজন
অমিত সরকার, বয়স ৫২, সরকারি চাকরি, এককালে নাটক করতেন।
বিদিশা সরকার, ওঁর ওয়াইফ, বয়স ৪৭, হাউজওয়াইফ।
রিমঝিম সরকার, বয়স ১৯, ফার্স্ট ইয়ার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী।
ফ্যামিলি ২– দুজন
অনন্ত পাল, বয়স ৬২, রিটায়ার্ড কলেজ প্রিন্সিপাল।
সুলগ্না পাল, বয়স ৫৫, এক গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস
ফ্যামিলি ৩– দুজন হানিমুন কাপল
রাহুল পাত্র, বয়স ২৭, আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে
অমৃতা পাত্র, বয়স ২২, আপাতত কিছু করে না, কম্পিটিটিভ একজামে বসছে।
সাইনবোর্ডটা দেখে রাহুল হাসতে লাগল। অমৃতা বলল, “ওয়াও, ট্রুথ হাউজ। আমাদের সবাইকে সত্যি কথা বলতে হবে। নইলে মরতে হবে। এটা জাস্ট দারুণ তো।”
সুলগ্না অত্যন্ত ব্যক্তিত্বময়ী, অমৃতার আগাপাশতলা দেখে বললেন, “২০১৭-য় এসে এইসবে বিশ্বাস করে নাকি কেউ?”
রিমঝিম বলল, “কেন আন্টি, হতেই তো পারে।”
অনন্তবাবু ঘরের এক কোণে মেঝেতেই বসে পড়লেন। বললেন, “মশা না জ্বালালেই হল। একটা রাত তো, ঠিক কাটিয়ে দেব। শীত তেমন নেই আজ।”
অমিত অনন্তবাবুর পাশে বসলেন। “যা বলেছেন।”
