প্রীতিকা ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল।
তথাগত অর্ডার দিচ্ছিল। ওয়েটার চলে যেতে বলল, “ভুলে গেছি।”
প্রীতিকা বলল, “সবই ভুলে যাচ্ছ বোধহয়। তারপর, চাকরি ছাড়ার পর কেমন লাগছে মিস্টার মিত্র?”
তথাগত মুখ বিকৃত করল, “জঘন্য। মনে হচ্ছে বিরাট একটা ভুল করে ফেললাম, মার পাশে থাকার মতো এখানে অনেক লোক আছে। ক্রাউড বাড়ানো ছাড়া কিছুই করলাম না মনে হচ্ছে।”
প্রীতিকা একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বলল, “তরুণ দাস?”
তথাগত অবাক হল, “তুমি কী করে জানো?”
প্রীতিকা বলল, “শুনেছি অনেক কিছু।”
তথাগত বলল, “শুনেছ মানে? কী শুনেছ?”
প্রীতিকা বলল, “তোমার শুনতে ভালো লাগবে না, কী দরকার শুনে? বাদ দাও।”
তথাগত বলল, “কেন ভালো লাগবে না? আর ভালো না লাগার মতো কী থাকতে পারে যেটা আমি জানি না?”
প্রীতিকা বলল, “নাহ। তোমার শুনে কাজ নেই। একটা স্কচ নাও তো।”
তথাগত বলল, “আমি কিচ্ছু নেব না যতক্ষণ তুমি যেটা বলতে চেয়েছিলে বলবে।”
প্রীতিকা বলল, “বুবকার প্রতি তোমার মা হঠাৎ এত সফট হয়ে পড়লেন কেন?”
তথাগতর চোয়াল শক্ত হল, “জানি না।”
প্রীতিকা বলল, “বুবকার ধারণা তুমি আর মা মিলে বৈভবীর অ্যাক্সিডেন্টটা করিয়েছ।”
তথাগত প্রীতিকার দিকে তাকাল, “তোমাকে বুবকা বলেছে?” সে স্কচ অর্ডার করল।
প্রীতিকা বলল, “সরাসরি কিছু বলেনি। যা বোঝার বুঝে গেছি অবশ্য।”
তথাগত বলল, “মা হঠাৎ করে বুবকাকে এত অ্যাটেনশন দিচ্ছেন কি সেটা বুঝেই?”
প্রীতিকা কাঁধ ঝাঁকাল, “আমি কী জানি! কাল তো কোন বস্তি থেকে নিয়ে এলেন। আজ সকালে দেখলাম বুবকার ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময় পুরো দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন। আমি একটা জিনিস অবশ্য বুঝলাম।”
তথাগত বলল, “কী?”
প্রীতিকা হাসল, “তোমার মা তোমার থেকে বুবকাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন।”
তথাগত গম্ভীর হল, “জানি।”
প্রীতিকা বলল, “জানো যখন, তখন চাকরিটা ছাড়লে কেন?”
তথাগত বলল, “এখনও যেতে পারি। সেই কন্ট্যাক্টস আমার আছে। ইন ফ্যাক্ট আমার আগের কোম্পানির বস কালকেও বললেন আমার জন্য কোম্পানির দরজা সবসময় খোলা, ভাবো জাস্ট, এই রিসেশনের সময়েও। আর এরা আমায় এমনভাবে ট্রিট করে যেন আমি একটা কচি খোকা!”
প্রীতিকা বলল, “তুমি বোঝো কী করবে। আমি কিছু বলব না। আমার কথা যখন শোনোনি আগে, এখনও কিছু বলব না।”
স্কচ এসে গেছিল। তথাগত প্রীতিকার গ্লাসে সোডা ঢেলে দিল, “আমারও মনে হচ্ছে সেটা। শুধু একটা কথা ভেবেই থেকে যাচ্ছি। এখন গেলে কিন্তু শুনতে হবে পালিয়ে গেলাম।”
প্রীতিকা গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকল কিছুক্ষণ। বলল, “উফ, কতদিন পর। এখন বুঝতে পারছি আই নিডেড ইট ব্যাডলি।”
তথাগত বলল, “বাড়িতে বললেই পারতে, এনে দিতাম।”
প্রীতিকা ঠোঁট উলটাল, “থাক। ওটা তো শান্তির ধাম। ইমেজ রক্ষার দায় কী, তুম ক্যা জানো রমেশবাবু?”
তথাগত বলল, “রাখো তোমার ইমেজ। মা যেন জানে না তুমি ড্রিংক করো।”
প্রীতিকা বলল, “জানুন না। কিন্তু ঘরে ওই কিছু না জানা ভোলাভালা অবতারই রাখব আমি। ওতে অনেক সুবিধা আছে। তুমি বুঝবে না। তোমার মার অনেকগুলো কনজারভেটিভ ভিউজ আছে। ওটা হার্ট হলে ক্ষতিটা আমারই।”
তথাগত বলল, “তা হবে। আমি অত বুঝি না। শুধু এটুকু বুঝি ভেলভেট পিকচারসে আমি না থাকলেও কারও কিছু যায় আসে না। দ্যাট ওল্ড শিট তরুণ দাস!”
প্রীতিকা বলল, “কী বলেছে সে?”
তথাগত বলল, “কী বলবে? এমন একটা হাবভাব করে ঘুরে বেড়ায় যেন ও-ই সব! আর মা-ও তো…”
প্রীতিকা বলল, “হুঁ।”
তথাগত বলল, “কী বলছিলে যেন তখন এই মালটার ব্যাপারে?”
প্রীতিকা বলল, “নিতে পারবে না।”
তথাগত মুখ বিকৃত করল, “ধুস, খামোখা সাসপেন্স না রেখে বলো তো। না নেবার কী আছে? আমরা কি বাচ্চা নাকি?”
প্রীতিকা কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল, “ইন্ডাস্ট্রিতে রিউমার আছে বাণী মিত্র আর তরুণ দাসের মধ্যে একটা এক্সট্রাম্যারিট্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে অ্যান্ড ইটস ওপেন সিক্রেট।”
তথাগত গম্ভীর মুখে প্রীতিকার দিকে তাকিয়ে থাকল।
প্রীতিকা বলল, “দেখলে, এইজন্য তোমাকে বলতে চাইনি।”
তথাগত বলল, “তুমি তো ইন্ডাস্ট্রির লোক নও। দেন? এটা কি তোমার ওয়াইল্ড গেস?”
প্রীতিকা বলল, “তোমার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তুমি জানতে?”
তথাগত বলল, “প্লিজ লিভ ইট। বিরক্ত লাগছে আমার।”
খাবার এসে গেছিল। ওয়েটার সার্ভ করে চলে গেলে প্রীতিকা বলল, “তোমাকে আর-একটা খবর দি।”
তথাগত বলল, “কী?”
প্রীতিকা বলল, “বুবকা ভেলভেট পিকচারসের আপকামিং মেগায় লিড রোল করবে।”
তথাগত বলল, “আড়ি পেতে শুনেছ?”
প্রীতিকা মোবাইলটা বের করতে করতে বলল, “আজকাল আড়ি পাতার দরকার পড়ে না। তোমার তো এইসব নেটওয়ার্ক ভালো ছিল। আজকাল কি সব ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে? ড্রাইভারকে হাতে রাখতে হয় এইজন্য। বাই দ্য ওয়ে, ফ্লোর সামলাতেও সেই বুবকারই শরণাপন্ন হয়েছেন তোমার মা।”
তথাগত প্রীতিকার দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল।
১২
দুপুর সাড়ে এগারোটা।
দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের একপাশে বুবকার গাড়ি দাঁড়িয়ে। পাশের সিটে শুভ বসে বোতলে মদ মিক্স করছে।
বুবকা বলল, “এই গাছগুলোর থেকে কেমন একটা সাউন্ড হচ্ছে না?”
শুভ বাইরের দিকে তাকাল। রাস্তার পাশের গাছগুলো থেকে সত্যিই একটা শব্দ আসছে।
