তথাগত বলল, “আমি তো বুবকাকে নিয়ে কিছু বলতে ডাকিনি তোমায়।”
বাণী বললেন, “তবে? কী ব্যাপারে ডাকলে?”
তথাগত বলল, “দীপ্তানুজকে চেনো তো! যাকে রিক্রুট করা হল।”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ। কী হল ওর?”
তথাগত বলল, “ও একটা দারুণ আইডিয়া দিয়েছিল।”
বাণী বললেন, “ভালো তো তরুণকে শোনাও।”
তথাগত বলল, “সেটা বলতেই তো গেলাম। আমার মনে হয় ওঁকে এবার রিপ্লেস করার সময় হয়ে এসেছে।”
বাণী বললেন, “কাকে? দীপ্তানুজকে?”
তথাগত একটু ইতস্তত করে বলল, “না। তরুণ কাকাকে।”
বাণী কয়েক সেকেন্ড তথাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ তুমি কী বলছ? এই সময়ের সবথেকে সফল মেগা ডিরেক্টরকে রিপ্লেস করার কথা বলছ? তুমি কি ভেবেছ ওঁর কাজের অভাব হবে? দীপ্ত রায় তো লুফে নেবে।”
তথাগত অধৈর্য গলায় বলল, “নিক না লুফে। লুফে নিক। কী হবে? সেই তো একই বোরিং সিরিয়াল আর একইভাবে সব চালিয়ে যাচ্ছে। কোনও ক্রিয়েটিভিটি নেই, কিচ্ছু নেই। দ্যাখো না, আমি তো ভেবেই রেখেছি, একদম ফ্রেশ ব্লাড নিয়ে আসব।”
বাণী ঠান্ডা গলায় বললেন, “তুমি আগে প্রসেসটা বোঝার চেষ্টা করো। শুরুতেই সব চেঞ্জ করার কথা ভেবো না।”
তথাগত বলল, “আর কদিন লাগবে বুঝতে? ছমাস হল তো!”
বাণী বললেন, “ষোলো বছরে আমি এখনও বুঝে উঠতে পারলাম না আর তুমি ছমাসেই শিখে যাবে?”
তথাগত বলল, “কেন পারব না? আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ-ও করেছি। তোমাদের আগে ধরতে পারব এটাই তো ন্যাচারাল, তাই না?”
বাণী কয়েক সেকেন্ড তথাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাহ। তা নিজে থেকে একটা কিছু সেট আপ করার চেষ্টা করলেই তো পারতে। একটা অলরেডি এস্টাব্লিশড এস্টাব্লিশমেন্টকে এদিক সেদিক করার জন্য তো ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যানেজমেন্ট না পড়লেও হয়।”
তথাগত বলল, “তুমি বুঝতে পারছ না, তরুণকাকা খুব কনজারভেটিভ মাইন্ডেড লোক। ওঁকে দিয়ে হবে না।”
বাণী বললেন, “আমি সব বুঝতে পারছি। এতদিন ওঁকে দিয়েই তো হয়ে এসেছে। আমি কতটা দেখি? আজ ভেলভেট পিকচারস যে জায়গায় এসেছে তা উনি ছিলেন বলেই। জায়গাটা ধরে রাখতে শেখো।”
তথাগতর জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল। সে আর কিছু বলছিল না।
বাণী বললেন, “তোমার কথা বলা শেষ হয়েছে?”
তথাগত মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”
বাণী বললেন, “আগে সবকিছু শেখো। স্ক্রিপ্ট রাইটিং থেকে লাইট, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত যা যা লাগে। তারপর পরের ধাপ ভাবো। তোমার থেকে আমি অনেক ঠান্ডা মাথা এক্সপেক্ট করেছিলাম। তুমি যে কাজগুলো এখন করছ সেগুলো তো বুবকা করত। তুমি হঠাৎ করে ওর মতো বিহেভ করছ কেন? ফিলিং আনকমফরটেবল? এখন কি চাকরি ছাড়ার জন্য মনখারাপ লাগছে? যাই হোক, যা করবে ভেবে করবে। ঠান্ডা মাথায় করবে। আমি এলাম।”
বাণী বেরোলেন।
তথাগত গম্ভীর মুখে বসে রইল।
১০
“খুব মাথা ধরেছে, কী করা যায়?”
“গেলো আরও। গিলে যাও।”
“কী করব? অভ্যাস হয়ে গেছে কেমন একটা। তোমাকে আদর করাটাও যেমন একটা অভ্যাস।”
“বুঝেছি, বুঝেছি। এসো। এখানে শোও। মাথা টিপে দিচ্ছি।”
“এটাই তো চেয়েছিলাম। এর জন্যই মনে হয় আরও আরও মদ খেয়ে তোমার কাছে আসি।”
“বেশি শয়তানি করলে কিন্তু মাথার জায়গায় গলাটা টিপে দেব, বুঝলে?”
“তাই দাও। তোমার হাতে মৃত্যুও সুন্দর।”
“পাগল।”
কে একজন ডাকছে। বুবকার ঘুম ভেঙে গেল।
চোখ খুলে বুঝল এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল।
শেফালি তাকে ডাকছিল।
সে বিরক্ত গলায় বলল, “ডাকাডাকি শুরু করলে কেন হঠাৎ করে? কী হল?”
শেফালি বলল, “কে এসেছে দ্যাখো।”
শেফালির গলা সন্ত্রস্ত।
বুবকা উঠল। বলল, “কে এসেছে? এই ঘরে নিয়ে এসো।”
শেফালি বলল, “বাইরে যাও।”
বুবকা বলল, “আরে আনো তো। কিচ্ছু হবে না।”
শেফালি বাইরে গেল। কিছুক্ষণ পরে বাণী ঢুকলেন। বাণীর পিছনে ইদ্রিশ দাঁড়িয়ে। বুবকা অবাক হয়ে বলল, “যাব্বাবা। তুমি এখানে কেন এলে?”
বাণী পিকলুর ঘরটা দেখছিলেন। খাটের একদিকে শুভ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। বুবকা উঠে বসে আছে। ঘরের এক কোণে ফাঁকা মদের বোতল। ঘরময় সিগারেট, মদ আর মাংসের গন্ধ। বাণী সবটা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুবকাকে বললেন, “তোমাকে নিতে এলাম।”
বুবকা বলল, “সে তো একটা ফোন করলেই হত। এখানে আসার কী দরকার ছিল?”
বাণী বললেন, “দেখতে এলাম বাড়ি না গিয়ে তুমি কোথায় কোথায় পড়ে থাকো।”
বুবকা ঘড়ি দেখল। রাত দুটো বাজতে দশ মিনিট বাকি। বলল, “স্টুডিও থেকে এলে?”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ।”
বুবকা বলল, “এ জায়গার সন্ধান তোমায় কে দিল? দাদার খোচর?”
ইদ্রিশ কথাটা শুনে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
বাণী সেদিকে না তাকিয়েই বললেন, “ধরে নাও তাই।”
বুবকা বলল, “বাহ। সকাল বিকেল আমাকেই নজর রেখে চলেছে সব। নিজেকে ভিআইপি মনে হচ্ছে তো।”
বাণী বললেন, “এখানেই সব কথা বলবে? তুমি কি চাও এখানে আমি বেশিক্ষণ থাকি? বাড়ি চলো।”
বুবকা বলল, “আমি কোথায় থাকি দেখতে যখন এসেছ তখন থাকতে সমস্যা কী?”
বাণী বললেন, “কোনও সমস্যা নেই। তুমি ভুলে গেছ আমরা একসময় কোথায় কীভাবে থাকতাম?”
বুবকা বলল, “কেন ভুলব? আমার তো মনে হয় তোমরাই সব ভুলে গেছ।”
বাণী বললেন, “আমার স্মৃতিশক্তি অতটা খারাপ না বুবকা। তুমি বরং সেটা মনে করে দেখো।”
বুবকা বলল, “তুমি কি সেই বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছ?”
বাণী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সেই বাড়িতে যদি যাওয়া যেত তাহলে হয়তো আমিও সেখানেই ফিরে যেতাম।”
বুবকা উঠল, “চলো, বাড়িই যাই। নিতে এসেছ এটাই বিরাট ব্যাপার।”
বুবকা খাট থেকে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। বাণী এগিয়ে এসে বুবকাকে ধরলেন।
বুবকা বাধা দিল, “ধরতে হবে না। পড়তে পড়তে ওঠার অভ্যাস হয়ে গেছে কাউকে ছাড়াই।”
পিকলু এসে গেছিল, বাণীকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়াল। বুবকা বলল, “আসছি ভাই। পরে আবার আসব।”
বাণী পিকলুকে দেখলেন। কিছু বললেন না।
পিকলুদের বস্তি থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা রাস্তা হাঁটতে হয়। পিকলু গোটা পথ তাদের সঙ্গে এল। তারা গাড়িতে উঠলে গাড়ি স্টার্ট দিল।
বুবকা বলল, “তুমি শুধুই দেখতে এসেছিলে আমি কোথায় পড়ে থাকি?”
বাণী বললেন, “আরও একটা কারণ আছে।”
বুবকা বলল, “কী? সেটাই তো জানতে চাইছি।”
বাণী বললেন, “সিপির সঙ্গে দেখা করেছি আমি। স্পেশাল রিকোয়েস্ট করেছি বৈভবীর অ্যাক্সিডেন্টটার যেন নতুন করে ইনভেস্টিগেশন হয়।”
বুবকা বলল, “হঠাৎ? এত তৎপরতা? কেন?”
বাণী বললেন, “তুমি আমার ছেলে বলে।”
বুবকা বলল, “হঠাৎ করে বেশি কনসার্ন দেখালে বুঝতে হয় কিছু না কিছু ব্যাপার আছে, তাই না?”
বাণী বললেন, “বেশি কনসার্ন না দেখালে সমস্যাটা বাড়ছে যে, সেটা মেনে নি কী করে?”
বুবকা বলল, “এতদিন পরে তোমার হঠাৎ অ্যাক্সিডেন্টটা নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে কেন?”
বাণী বললেন, “তোমার হচ্ছে বলে।”
বুবকা বলল, “এর বিনিময়ে আমাকে কী করতে হবে?”
বাণী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “কাল থেকে অফিসে আসতে হবে। ফ্লোরের কাজ দেখতে হবে। এবং আমাদের আপকামিং মেগায় লিড রোল করতে হবে।”
বুবকা উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল।
১১
“কত দিন পর আমরা বাইরে বেরোলাম?”
