অলকা বলল, “করে নেব। তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
দীপ্ত বলল, “আমাকে এখনই সল্টলেক যেতে হবে। একটা মিটিং আছে। তুমি কখন বেরোবে?”
অলকা বলল, “বিকেলে।”
দীপ্ত এসে অলকাকে জড়িয়ে কানে কানে বলল, “দ্যাট গার্ল ইজ গুড, বাট নট অ্যাজ গুড অ্যাজ ইউ। ইউ আর দ্য বেস্ট।”
অলকা দীপ্তকে ছাড়িয়ে নিল না। সে বলল, “জানি। আই অ্যাম দ্য বেস্ট প্রস ইন দ্য ইন্ডাস্ট্রি। তাই না?”
দীপ্ত অলকাকে ছেড়ে দিল। বলল, “একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। ক্লিনিক ঠিক হয়ে গেছে। ডাক্তারও। মেডিসিনে অ্যাবর্ট করা যায় নাকি প্রথমে দেখা যাবে। নইলে ছোট্ট একটা প্রসেস। একটু কষ্ট হবে। একদিনে ফিট হয়ে যাবে।”
অলকা দীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা। বোলো কবে যেতে হবে। কত সহজ সবকিছু, বলো?”
দীপ্ত অলকার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, “এলাম। তুমি যখন শ্যুটে বেরোবে সে সময়টা রিমি ফ্ল্যাটেই থাকবে। তালা দিয়ে যাবার দরকার নেই।”
দীপ্ত বেরিয়ে গেল।
অলকা ঘর থেকে বেরোল। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করল। একটু ইতস্তত করে দীপ্তর বেডরুমে ঢুকল।
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ঘরটাকে হিমশীতল করে রেখেছে। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে চাদর মুড়ি দিয়ে। মাঝে মাঝে শিউরে শিউরে উঠছে। অলকা এসির তাপমাত্রা বাড়াল। মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল। তাকে দেখে প্রথম কথা বলল, “তোমাকে না আমি চিনি। সিরিয়ালে দেখেছি।”
অলকা হাসল, “রাতে ঘুম হয়নি?”
রিমি উঠে বসে আবিষ্কার করল সে কিছু পরে নেই। অলকা দেখল মেঝেতে মেয়েটার সব পোশাক পড়ে আছে। সে কুড়িয়ে নিয়ে মেয়েটাকে দিল। রিমি কোনওমতে ঊর্ধ্বাঙ্গ ঢেকে বলল, “শেষরাতের দিকে ঘুমাতে পারলাম।”
অলকা বলল, “তুমি ঘুমের ঘোরে শিউরে উঠছিলে কেন?”
রিমি অবাক হয়ে বলল, “শিউরে উঠছিলাম?”
অলকা বলল, “হ্যাঁ।”
রিমি জানলার বাইরে তাকাল, “একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। একটা ঘরে আমাকে জোর করে তিন-চারজন ঢুকিয়ে দিল… স্বপ্ন না অবশ্য, এখন ওই সব কিছুই স্বপ্নে ফিরে আসে রোজ।”
অলকা বলল, “কী হয়েছিল তোমার?”
রিমি অনির্বাণের ঘটনাটা জানাল। অলকা বলল, “তোমার বাড়ি কলকাতাতেই?”
রিমি মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”
অলকা বলল, “বাড়ি গেছিলে?”
রিমি বলল, “হ্যাঁ। অনেক কষ্টে ফিরেছিলাম। মা কিছুতেই ঘরে ঢুকতে দিল না।”
অলকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “মেয়েদের কোনও বাড়ি নেই। বাড়ি হয় না। তোমাকে কি রোজই কারও না কারও সঙ্গে শুতে হয়?”
রিমি হাসল, “এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনাকেও শুতে হয়?”
অলকা রিমির দিকে তাকাল। রিমির মুখটা কেমন সহজ সরল। সে বলল, “এখনও হয়নি। হবে হয়তো। ওই যে বললাম না, মেয়েদের কোনও ঘর হয় না।”
রিমি বলল, “তুমি এখানে থাকো?”
অলকা বলল, “আপাতত।”
রিমি বলল, “আমাকে রুবেলদা বলেছে ইনি নাকি বিরাট ক্ষমতাবান লোক। ইনি কি কোনও নেতা?”
অলকা হাসল, “ক্ষমতাবান হবার জন্য সবসময় নেতা হবার দরকার পড়ে না। অনেকে অনেকভাবেই ক্ষমতাবান হতে পারে। রুবেলদা কে?”
রিমি বলল, “দালাল। এই ভদ্রলোক যেখানে গেছিলেন আমি সেখানে ছিলাম। ওখান থেকেই আমাকে নাকি ওঁকে গিফট করা হয়। কতদিন কলকাতায় থাকতে হয় কে জানে। আমার কলকাতায় থাকতে ভালো লাগে না। এখানে থাকলেই শুধু বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে। কতবার হয়েছে বারবার বাড়ির সামনে দিয়ে ট্যাক্সি করে গেছি কিন্তু গাড়ি থেকে নামতে পারিনি।”
অলকা বলল, “বাড়ি গিয়ে কী করবে?”
রিমি বলল, “ছোটোবেলায় যখন কোথাও বেড়াতে যেতাম, প্রথম প্রথম ভীষণ উৎসাহ নিয়ে যেতাম। তারপর যত দিন এগোতে থাকত, বাড়ির জন্য ভীষণ মনখারাপ শুরু হত। শুধু ভাবতাম কখন গিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছোতে পারব। এখন সেই ঘরটাই নেই।”
অলকা বলল, “ছেলেটার সঙ্গে কোনও দিন দেখা হয়েছিল?”
রিমি বলল, “হ্যাঁ। দার্জিলিং গেছি এক অবাঙালি ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ষাটের ওপর বয়স। মদ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি একা একা ঘুরছি, হঠাৎ ম্যালে দেখা। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। তারপর যা একটা দৌড় দিল, আমি কোনও দিন ভুলব না।”
রিমি হাসতে শুরু করল। হাসতে হাসতেই কেঁদে দিল।
অলকা রিমির কাছে গিয়ে ওর হাত ধরল, “চলো খেয়ে নেবে। কেঁদো না। যার তার জন্য চোখের জল নষ্ট করতে নেই।”
৯
বাণী অফিসে এসে ফ্লোরে যাবার জন্য বেরোচ্ছিলেন। তথাগত এসে বলল, “একটু কথা আছে।”
বাণী বললেন, “চলো। ফ্লোরে যেতে যেতে শোনা যাক।”
তথাগত বলল, “এখানে বলে নিই।”
বাণী দেখলেন তথাগতর মুখ থমথমে। বললেন, “কী হল? আবার কিছু হয়েছে নাকি? বুবকার খোঁজ পেয়েছ?”
তথাগত বলল, “না, বুবকা রিলেটেড না।”
বাণী বললেন, “বুবকার খোঁজ পেয়েছ?”
তথাগত মুখ কুঁচকাল, “হ্যাঁ, কোন এক বস্তিতে মদ খেয়ে পড়ে আছে।”
বাণী বললেন, “ওকে বাড়ি আনার কী ব্যবস্থা করেছ?”
তথাগত বলল, “কীভাবে বাড়ি আনব ওকে? এখন একটু ডিস্টার্বড আছে। আবার নেশা কাটলেই চলে আসবে!”
বাণী বললেন, “ওর কাছে টাকা আছে তো?”
তথাগত অবাক হয়ে বলল, “টাকা দিয়ে কী করবে ওকে? যত টাকা দেবে মদ খেয়ে উড়িয়ে দেবে।”
বাণী ঠান্ডা গলায় বললেন, “উড়াক, ওর যেন টাকার সমস্যা না হয়।”
তথাগত বলল, “কী যে বলো আমি বুঝতে পারি না মাঝে মাঝে।”
বাণী বললেন, “বুঝতে হবে না। তোমার কথা হয়ে গেছে? আর কিছু বলবে?”
