দীপ্তর কাছে আসার পরে জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তার দুটো কার্ড হয়েছে। একটা ডেবিট আর একটা ক্রেডিট। যখন যা ইচ্ছা কিনে আনতে পারে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে। কিনতে কিনতে মাঝে মাঝেই অলকার শুভর মুখটা মনে পড়ে। পাড়ার দোকান থেকে কিছু আনার সময় শুভ প্রায়ই বায়না ধরত বেশি বাদামওয়ালা চানাচুরটা নিয়ে আসতে। ননীদার দোকানে কাচের বয়ামে থাকত সে চানাচুর। পাঁচ টাকায় ছোটো ঠোঙার খানিকটা ভরত। শুভ বাদাম বেছে বেছে তাকে দিত। সন্ধেবেলা মোটা মুড়ি সর্ষের তেল দিয়ে মাখা, তাতে এই চানাচুর দেওয়া।
ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাচের বয়ামে চানাচুর থাকে না। তার পরিবর্তে দামি কোম্পানির চানাচুরের প্যাকেট। অলকা খেয়ে দেখেছে দামি চানাচুরে সেই চানাচুরের স্বাদ পাওয়া যায় না।
গ্রামের দিকে আউটডোর শ্যুটিং থাকলে সে গাড়ি থামিয়ে গ্রামের দোকান থেকে বয়াম থেকে চানাচুর কিনে খায়। প্রোডাকশনে তার আলাদা সম্মান। দীপ্ত রায়ের ঘরের লোক বলে কথা। তাকে গাড়ি থেকে নামতে হয় না। ওরাই এনে দেয়।
আগের দিন শ্যুটিং ছিল না। বিরল দিনগুলোর মধ্যে একটা। মেগা সিরিয়ালে প্রায় রোজই কিছু না কিছু কাজ থেকেই যায়।
অভ্যাসমতো অনেক রাত অবধি জেগে ছিল অলকা। তবু ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল তার। বাইরে গরম হলেও ঘর এসির কল্যাণে হিমশীতল। রাতে কম্বল লাগে। আগের বাড়িতে অনেক কষ্টে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান কেনা গেছিল। তাতেও গরম কমত না। ছটফট করতে হত বিছানায় শুয়ে।
অলকা কাচের জানলা দিয়ে রাস্তা দেখছিল। অনেকেই হাঁটতে বেরিয়েছে। শহরের ঘুম ভাঙছে ধীরে ধীরে।
“না ঘুমালে ডার্ক সার্কেল সামলাতে পারবে?”
দীপ্ত ঘুমের ঘোরে কথাগুলো বলল।
অলকা বলল, “ঘুম ভেঙে গেল।”
দীপ্ত বলল, “কেন? দুঃস্বপ্ন দেখছিলে?”
অলকা বলল, “না। এমনিই।”
দীপ্ত বলল, “আজকে তোমায় কটায় বেরোতে হবে?”
অলকা বলল, “সন্ধে।”
দীপ্ত বলল, “ঘুমিয়ে পড়ো।”
অলকা বলল, “তুমি চা খাবে?”
দীপ্ত বলল, “না। তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।”
অলকা বলল, “কী?”
দীপ্ত বলল, “রাগ করবে না তো?”
অলকা বলল, “না না, রাগ করার কী হল, বলো।”
দীপ্ত বলল, “তোমাকে বলতে ভুলে গেছিলাম। আজ সন্ধ্যায় আমাকে শিলিগুড়ি যেতে হবে। কালকেই চলে আসব।”
অলকা বলল, “ওহ। তা যাবে।”
দীপ্ত বলল, “ভেবেছিলাম তোমাকে নিয়েই যাব। তারপর শ্যুটিংয়ের কথা মনে পড়ে গেল।”
অলকা বলল, “আমি গিয়েই বা কী করতাম। কী ব্যাপারে যাচ্ছ?”
দীপ্ত বলল, “একজন টাকা ঢালতে চায় একটা প্রোজেক্টে। ফিল্ম সিটি সহ আর কী সব বানাবে। ইনফ্লুয়েনশিয়াল লোক। ওখানকার বিজনেসম্যান। তার সঙ্গেই মিট করতে যাব।”
অলকা বলল, “শিলিগুড়ি আমার মামাবাড়ি। ছোটোবেলা গরমের ছুটি পড়লেই যেতাম। এখন বোধহয় আমাকে দেখলে …”
দীপ্ত উঠে বসল, “এক-দুটো বছর যেতে দাও। একটা ন্যাশনাল পাও, আর-একটু নাম যশ হোক, তারপর দেখবে শিলিগুড়ি কেন, আরও কত কত জায়গা থেকে তোমার কত মামা কাকা পিসি জন্ম নেবে। তোমাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য পাগল হয়ে যাবে। তুমি বরকে ছেড়েছ, কার সঙ্গে শুচ্ছ, এগুলো কোনও কিছুই ম্যাটার করে না, সাকসেস ম্যাটারস।”
অলকা বলল, “আমি এখনও তোমার শোয়ার পার্টনার বলো?”
দীপ্ত অলকার হাত ধরে নিজের পাশে এনে বসাল, “তোমার কী মনে হয়? এখনও এই কথাগুলো মনে হয়?”
অলকা বলল, “কী জানি, ক্রীতদাসী হয়তো। মাঝে মাঝে যেসব ভাষা বলো।”
দীপ্ত বলল, “নিজের লোকেদেরই তো এরকম ভাষা বলা যায়, সন্দেহ করা যায়। সবাইকে কি এগুলো বলা যায়?”
দীপ্তর হাত অলকার শরীরে খেলা করছিল। অলকা ছাড়িয়ে নিল না।
বলল, “তোমরা কীভাবে কল্পনা করে নাও কারও সঙ্গে কথা বললেই মেয়েরা তার সঙ্গে শুয়ে পড়বে? ভাবো কীভাবে? আমি নাহয় নষ্ট মেয়ে, বাকি মেয়েদেরও তাই ভাবো না তোমরা?”
দীপ্তর অস্বস্তি হচ্ছিল, সে কাটাতে চাইল, “সকাল সকাল এসব কথা না বললে হয় না?”
অলকা বলল, “তুমি শুনতে চাও না সকাল সকাল এসব কথা?”
দীপ্ত বলল, “না, সকাল সকাল আদরের কথা বলতে হয়, তোমার শরীরের কথা বলতে হয়।”
অলকা বলল, “শরীরের কথা বলবে? আচ্ছা! তাহলে জেনে রাখো। শরীরে একজন নতুন কেউ আসছে, এইমাত্র দেখলাম, টেস্ট পজিটিভ।”
দীপ্ত চোখ ছোটো ছোটো করে অলকার দিকে তাকিয়ে থাকল।
৪
বাণী ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে দেখলেন বুবকা চুপচাপ বসে আছে। প্রীতিকা খাবার দিচ্ছিল। তিনি বললেন, “বুবকাকেও দিস।”
বুবকা বলল, “এখন খেতে ইচ্ছা করছে না। পরে খাব।”
প্রীতিকা বললেন, “কাল রাতেও তো কিছু খেলে না।”
বুবকা বলল, “খিদে পাচ্ছে না কী করব?”
বাণী বললেন, “বউদির সঙ্গে এভাবে কথা বলে না বুবকা।”
বুবকা মাথা নিচু করে বসে ছিল। সেভাবেই বলল, “সরি।”
বাণী প্রীতিকাকে ইশারা করলেন বুবকাকে খাবার দিতে। প্রীতিকা একটা স্যান্ডউইচ দিল বুবকার সামনের প্লেটে। বুবকা স্যান্ডউইচটা ধরে বসে থাকল।
বাণী বললেন, “তোমার কি খেতে ইচ্ছা করে না? বমি ভাব নেই তো? ডাক্তার সেনকে খবর দেব?”
বুবকা বাণীর দিকে তাকিয়ে স্যান্ডউইচে একবার কামড় দিয়ে সেটাকে প্লেটে রেখে বলল, “না। দরকার নেই।”
বাণী বললেন, “কোথায় কোথায় গিয়ে থাকো, ফোন তোলো না, তোমার কোনও খোঁজ খবর পাই না। এতদিন পরে বাড়ি এলে কাল। এভাবে ঠিক কী চাইছ তুমি?”
বুবকা হাসল। অনেকক্ষণ পরে। তারপর বলল, “আমিও তো বুঝলাম না বৈভবীকে যারা মারল তারা ঠিক কী চাইল!”
বাণী প্রীতিকার দিকে তাকালেন। প্রীতিকা অন্য ঘরে চলে গেল।
বাণী গলা নামিয়ে বললেন, “তুমি একটা অ্যাক্সিডেন্টের দায় বারবার আমার ঘাড়ে কেন ফেলছ বুবকা? আমি কেন এই কাজটা করব? হতে পারে তোমার সঙ্গে ওর রিলেশনে আমাদের ফ্যামিলিতে একটা এফেক্ট পড়ত, কিন্তু তা বলে এরকম কাজ করার কি সত্যি কোনও দরকার পড়ে আমার? বারবার তুমি একটা বাইরের মেয়ের সামনে সিন ক্রিয়েট করছ…”
বুবকা বাণীকে থামিয়ে বলল, “বাইরের লোক মানে? বউদি তো ঘরেরই লোক হয়।”
বাণী বললেন, “শুধু প্রীতিকার সামনে তো তুমি এগুলো বলছ না। গোটা পৃথিবীর লোককে এসব বলে বেড়াচ্ছ। তোমার মাকে দাদাকে তুমি এই চিনেছ? আমার আজকাল ভীষণ ডিপ্রেশন আসে বুবকা, এত পরিশ্রম সব বিফলে যাচ্ছে বলে মনে হয়।”
বুবকা বলল, “কেন? তোমার বড়ো ছেলে আছে তো! একার হাতে সব সামলাচ্ছে তো।”
বাণীর সামনে বুবকা বসে ছিল। বাণী চেয়ার ছেড়ে উঠে বুবকার পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
কণ্ঠস্বর আরও নামিয়ে বললেন, “তুমিও ভালো করে জানো, আমিও ভালো করে জানি, তোমার দাদা এই লাইনের ছেলে নয়। ও পারছে না। একটা মেগা শুরু করল, ওকে আমি ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছিলাম, এখন কয়েকটা উইকেই সেটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ওর চাকরি ছাড়ার ডিসিশনটা একটা ব্লান্ডার ছিল সেটা আমার থেকে ভালো করে কেউ বুঝতে পারছে না। দীপ্তরা সব একের পর এক নতুন প্রোডাকশন নামাচ্ছে। যে তিনটে মেগা এখন আমার চলছে সেগুলোও শেষ করতে হবে। তারপর? তুমি যদি প্রোডাকশন না দ্যাখো তাহলে কে দেখবে বুবকা?”
বুবকা বাণীর দিকে তাকাল না। স্যান্ডউইচটা হাতে নিয়ে আবার এক কামড় দিয়ে প্লেটে রেখে বলল, “বৈভবীকে মারল কারা?”
বাণী বুবকার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, “তোমার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে তোমার মা মার্ডার করাতে পারে?”
বুবকা বলল, “তুমি সব নাও জানতে পারো। সব কিছু তো স্ট্রেট লাইনে হয় না। ভিতরের গল্পটা আমি যতক্ষণ না জানতে পারছি ততক্ষণ তো কাউকেই বিশ্বাস করতে পারব না।”
বাণী বললেন, “তোমাকে আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, এভাবে কেরিয়ারটাকে নষ্ট কোরো না, যতক্ষণ না তুমি কাজের মধ্যে ডুবে যাবে ততক্ষণ যত উলটোপালটা চিন্তা তোমার মাথায় খেলে যাবে।”
বুবকা হঠাৎ করে উঠে পড়ল। বাণী বললেন, “কোথায় যাচ্ছ?”
বুবকা বলল, “জানি না।”
বুবকা বেরিয়ে গেল।
বাণী মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। প্রীতিকা এসে বাণীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। বাণী হতাশ গলায় বললেন, “চলে গেল।”
প্রীতিকা বলল, “ওর বিয়ে দিয়ে দাও মা।”
বাণী অবাক চোখে প্রীতিকার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই কি পাগল হয়ে গেলি? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দেব নাকি?”
প্রীতিকা বলল, “তিন্নির সংসারেই তো দেখলাম বখাটে ছেলে বউ আসার পর ভালো হয়ে গেল।”
বাণী বিরক্ত গলায় বললেন, “তুই আবার বাংলা সিরিয়াল কবে থেকে দেখছিস?”
প্রীতিকা অপ্রস্তুত হল, বলল, “মা দ্যাখে তো। বাড়ি থাকলে না চাইতেও দেখা হয়ে যেত।”
বাণী বললেন, “সিরিয়ালের সঙ্গে জীবন মেলে নাকি! আর সেসব মান্ধাতা আমলের ধারণা। এটা ফোর নাইনটি এইটের যুগ। নিয়ে এলাম একটা মেয়েকে, তারপর দিল ঠুকে একটা। হয়ে গেল।”
প্রীতিকা বলল, “গ্রামের মেয়ে নিয়ে এসো।”
বাণী বললেন, “তুই সিরিয়াসলি সিরিয়াল দেখা বন্ধ কর। এসব মাথাতেও আনিস না এখন। বুঝতে পারছিস একে বুবকা এভাবে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়, আর-একটা মেয়ে এলে সমস্যাটা কোন জায়গায় চলে যেতে পারে?”
প্রীতিকা থতোমতো খেয়ে চুপ করে গেল।
বাণী ফোন বের করে তথাগতকে ফোন করলেন। তথাগত ফোন ধরলেই বাণী বললেন, “তুমি কোথায় এখন?”
তথাগত বলল, “ফ্লোরেই আছি। আজ তো অনেকক্ষণের কাজ, কাল তোমায় বললাম না?”
বাণী বললেন, “বুবকা আবার চলে গেছে।”
তথাগত কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল, “ওকে, দেখছি।”
বাণী বললেন, “আমি অফিস আসছি। অপেক্ষা করো।”
তথাগত বলল, “আচ্ছা।”
ফোনটা রেখে বাণী প্রীতিকাকে বললেন, “আমার আর খেতে ইচ্ছা করছে না। টিফিন করে দে। নিয়ে যাই।”
৫
অলকার যখন শ্যুট শেষ হল তখন রাত দেড়টা বাজে। গাড়িতে উঠে অলকা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে দেখল দীপ্তর দুটো মিসড কল। দুটোই সাড়ে বারোটা নাগাদ।
