মল্লিক ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে কথাগুলো বলল। মল্লিকের পাঁচ আঙুলে পাঁচটা আংটি। গলায় মোটা সোনার চেন। কথার মধ্যে একটা অদ্ভুত অবজ্ঞা কাজ করে। তথাগতর বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু শুনতে হচ্ছিল। এর এক অঙ্গুলিহেলনে শ্যুটিং যে-কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইউনিয়নবাজির চূড়ান্ত হয়, অযোগ্য লোকের জন্যও টাকা গুনতে হয়, কিন্তু কিচ্ছু করার থাকে না।
সে হাসি হাসি মুখ করে বসে ছিল। মল্লিক বলল, “আমরা ইউনিয়নে আলোচনা করেছি বুঝলেন মিত্রদা, এবার আপনাকে একটু অ্যাডজাস্ট করতেই হবে। এত কম টাকায় কী করে ছেলেগুলো কাজ করবে সেটা তো বুঝতে হবে।”
তথাগত বলল, “আপনাকে তো আমাদের দিকটাও দেখতে হবে দাদা। ম্যান পাওয়ার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। আনস্কিলড। আপনারা বলেছেন বলেই নিয়েছি। এবার কীভাবে সব কিছু সামলানো যায় বলুন তো? একটা সমঝোতায় তো এলে ভালো হয়, তাই না?”
মল্লিক মোবাইলটা বের করে খুট খুট করতে করতে বলল, “কীরকম সমঝোতা চাইছেন একটু বলুন।”
তথাগত বলল, “যে রেটটা আপনারা বলছেন সেটা দেওয়া যে ইম্পসিবল সেটা বুঝতে পারছেন তো?”
মল্লিক তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাদের তিনটে সিরিয়ালই এখন বেস্ট যাচ্ছে। টাকা তো কম পাচ্ছেন না।”
তথাগত অনেক কষ্টে রাগ চাপতে চাপতে বলল, “সেটা তো আপনিও জানেন এই রেটিং প্রতি উইকে চেঞ্জ হয়। তা ছাড়া বাকি প্রোডাকশনগুলোও তো আমাদের রেটই দিচ্ছে এখন।”
মল্লিক বলল, “ম্যাডামের সব কাজই কি আপনি দেখছেন এখন?”
হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ ওঠায় তথাগত খানিকটা থতোমতো খেল, “হ্যাঁ, তা বলতে পারেন।”
মল্লিক চোখ ছোটো ছোটো করে বলল, “আপনার নামে বাজারে অনেক কিছু শুনি মিত্রদা।”
তথাগত একটু হাসার চেষ্টা করল, “সে তো আপনার নামেও কম কিছু শুনি না। তাতে কি কাজ আটকে থাকে বলুন?”
মল্লিক বলল, “বলুন বলুন কী শোনেন?”
তথাগত বলল, “সেসব কি বলা যায়?”
মল্লিক বলল, “বলুন না, শুনি। খারাপ লাগে না। কোনটা বলতে চাইছিলেন? আমি মেয়েছেলের দালালি করি?”
তথাগত বলল, “আপনি কি রেগে যাচ্ছেন?”
মল্লিক হাসল, “দূর মশাই, এই কথায় রাগার কী হল? মেয়েছেলের দালালি পৃথিবীর সবথেকে পুরোনো ব্যবসা জানেন না? করলে তো একটা ঐতিহ্য ফলো করি! এতে রেগে যাবার কী আছে?”
তথাগত বলল, “টপিকটা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে।”
মল্লিক বলল, “কিচ্ছু চেঞ্জ হচ্ছে না। সব কথাই টপিকে হচ্ছে। আচ্ছা এবার আসল কথাটা বলি। শুনুন মিত্রদা, ম্যাডাম তো এখনও প্রোডাকশনের মাথায় আছেন। তা কথা যা বলার সেটা যদি আপনার সঙ্গে বলতে হয়, বুঝতেই পারছেন আমারও, হ্যাঁ হ্যাঁ হতে পারি আমি ছোটো নেতা, কিন্তু আমারও তো সম্মান বলে একটা ব্যাপার আছে।”
তথাগতর চোয়াল শক্ত হল, “মানে মার সঙ্গে ছাড়া আপনি আর কারও সঙ্গে কথা বলবেন না?”
মল্লিক বলল, “আপনি রাগ করছেন মিত্রদা। এইসব লাইনে আপনি কেন এলেন? ভালোই তো ছিলেন।”
তথাগত উঠল, “আমি এলাম। মাকে বলছি আপনাকে ফোন করতে।”
মল্লিক বলল, “আপনার ভাই এখন কোথায় মিত্রদা?”
তথাগত মল্লিকের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “জানি না।”
মল্লিক বলল, “বৈভবী ম্যাডাম মানুষটা ভালো ছিলেন মিত্রদা। ওটা অ্যাক্সিডেন্ট না খুন সেটা জানতে পারলেন?”
তথাগতর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। সে বলল, “সেটা পুলিশ দেখছে। আমি এ ব্যাপারে কী বলি বলুন?”
মল্লিক হাসল, “ওই যে আপনাকে বললাম না শুরুতে। কোরাপশন অনেকরকম হয়। আচ্ছা, আপনি আসুন। ম্যাডামকে ফোন করতে বলবেন।”
তথাগত বেরিয়ে এল। মাথাটা রাগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছিল মল্লিককে জুতোপেটা করে। দু টাকার বিদ্যে নেই পেটে, কোনওমতে নেতাগিরি করতে পেরে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে।
ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল। দেখল প্রীতিকার দুটো মিসড কল। কল ব্যাক করল।
“ফোন ধরছিলে না কেন?” প্রীতিকার গলা ঠান্ডা।
তথাগত বলল, “তোমাকে বলেছিলাম না একটা মিটিং আছে, ইউনিয়ন লিডার এটসেট্রা।”
প্রীতিকা বলল, “ওহ ভুলে গেছিলাম, মিটল সব কিছু?”
তথাগত বলল, “না, মেটেনি। বলো কেন ফোন করছিলে?”
প্রীতিকা বলল, “তোমার ভাই এসেছে।”
তথাগত সচকিত হল, “কখন?”
প্রীতিকা বলল, “ঘণ্টাখানেক হল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একবার ডেকেছি, ভেতর থেকেই চেঁচিয়ে বলেছে ডু নট ডিস্টার্ব।”
তথাগত বিরক্ত গলায় বলল, “ওকে ডাকতে গেলে কেন? ডাকার কী দরকার ছিল?”
প্রীতিকা থমথমে গলায় বলল, “জানি, ভুল হয়ে গেছে। আর ডাকব না।”
ফোনটা কেটে গেল।
তথাগতর ইচ্ছা হচ্ছিল ফোনটা ছুড়ে মারে। দিনটা ভীষণ খারাপ যাচ্ছে সকাল থেকে। একটা কাজও ঠিকঠাক হচ্ছে না।
৩
মাঝে মাঝে অলকা ভাবে দুটো বাড়ির জীবন কতটা আলাদা হতে পারে। শুভর কাছে থাকাকালীন শ্যাম্পু থেকে সাবান, ফিনাইল থেকে কাপড় কাচার সাবান, সব কিছু কেনার সময় হাজার হিসেবনিকেশ মাথায় রাখতে হত। শুভকে টাকা দিয়ে যেত লিস্ট করে। শুভ সেখান থেকে কিনে আনত।
পাড়ার দোকানে মাসকাবারি ব্যবস্থা ছিল একসময়। অলকা হিসেব করে দেখেছিল মাসের শেষে টাকা দিলে আদতে তাদেরই ক্ষতি হয়।
তারপর থেকে নগদে কেনা শুরু করে। অবশ্য একটা সময় টাকার যখন টানাটানি ছিল তখন পাড়ার দোকানই বাঁচিয়েছে তাদের। ধারে চাল ডাল ডিম আনা যেত।
