জ্যোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে…
দ্বিতীয় পর্ব ১ ।। রিমি।।
সকাল দশটা নাগাদ এনজেপি স্টেশনে পৌঁছল তারা। রিমি অনির্বাণের কানে কানে বলল, “আগে বিয়েটা করে নিলে হত না?”
অনির্বাণ রিমির কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, “বিয়ে তো করে নিয়েছি কবেই সোনা, আমরা তো মানসিকভাবে বিবাহিতই। আবার বিয়ে করার কী দরকার?”
রিমির স্বপ্নের মতো লাগছিল সবকিছু।
দূরে একটা আবছায়ার মতো পাহাড় দেখা যাচ্ছে। অনির্বাণ বলল, “তোমার বাবাকে জানাওনি তো?”
রিমি বলল, “তোমাকে বললাম না বাবা বাইরে গেছে? আর মা তো জানে বন্ধুদের সঙ্গে পুরী যাচ্ছি। তুমি বোলো কখন বাবাকে ফোন করব, তখনই জানাব।”
অনির্বাণ বলল, “সিকিমে পৌঁছে জানিয়ো। জানি না, শুনলে কী ভাববে তোমাদের বাড়ির লোক।”
রিমির মুখটা শুকিয়ে গেল, “বাবা কোনও দিন মানবে না। খুব ঝামেলা হবে।”
অনির্বাণ হাসার চেষ্টা করল, “চিন্তা কোরো না, কিছু তো করারও থাকবে না।”
রিমি বলল, “জানি না কী হবে, আমার খুব ভয় লাগছে।”
অনির্বাণ রিমির হাত ধরল, “কিচ্ছু হবে না, আমি আছি তো।”
পেলিং যাবার গাড়ি শুরুতে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক কষ্টে একটা সুমো পাওয়া গেল। রিমির একটা কিটব্যাগ আর অনির্বাণের একটা স্যুটকেস। পিছনের সিটে সেগুলো রেখে পাশাপাশি বসল তারা। ভালোই গরম আছে। অনির্বাণ ড্রাইভারকে বলল, একটা মন্দিরে দাঁড়াতে।
ঘণ্টাখানেক পর তারা সেবক কালীবাড়ি পৌঁছে দেখল ভীষণ ভিড়। অনির্বাণ একটা দোকান থেকে সিঁদুর কিনে রিমির সিঁথিতে পরিয়ে দিল।
রিমি অবাক হয়ে বলল, “এভাবেই?”
অনির্বাণ বলল, “আর কী দরকার বলো? মন্ত্রের কি সত্যি কোনও দরকার আছে? মাকে প্রণাম করি চলো। তারপর বেরিয়ে যাই। অনেকটা রাস্তা শুনলে না? এখানে অপেক্ষা করলে পৌঁছোতে রাত হয়ে যাবে।”
তারা দুজনে প্রতিমা প্রণাম সেরে বেরিয়ে এল। গাড়িটা যখন পেলিং-এর রাস্তা ধরল তখন দুপুর একটা। রিমির ভীষণ লজ্জা লাগছিল। তার সঙ্গে একরাশ ভালো লাগা আর খারাপ লাগা। ছোটোবেলা থেকে তার স্বপ্ন ছিল খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে। এভাবে লুকিয়ে বিয়ের কথা ভাবেনি কোনও দিন। কিন্তু কিছু করারও ছিল না।
তার বাবা এত তাড়াতাড়ি কিছুতেই তার বিয়ে দিত না। অনির্বাণের সঙ্গে ফেসবুকে ছমাস হল আলাপ। সেখান থেকে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে কলেজের ফাঁকে দেখা, সেখানেই প্রেম। কথা থেকে কথা, রাত জাগা থেকে একসময় প্রেমটা শরীরে প্রবেশ করল।
দুজনেই বুঝতে পারছিল তাদের শরীর পরস্পরকে চাইছে। অনির্বাণ একসময় প্রস্তাবটা দেয়। রিমি আর দ্বিতীয়বার ভাবেনি। একটা অদ্ভুত টান আছে অনির্বাণের মধ্যে। সে টানকে অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব না।
“হোটেলে সন্দেহ করবে না তো?”
ড্রাইভারকে আড়চোখে দেখে অনির্বাণকে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল রিমি। রাস্তার পাশ দিয়ে তিস্তা তাদের সঙ্গে চলছে। অনির্বাণ বলল, “আমার আই কার্ড আছে তো। সব নিয়ে এসেছি। অত সন্দেহ করে না এখানে। তা ছাড়া এক পরিচিতর হোটেল আছে পেলিং-এ। চিন্তা কোরো না।”
রিমি বলল, “তারা জানলে বাজে ব্যাপার না?”
অনির্বাণ বলল, “কীসের বাজে ব্যাপার সোনা? আজ থেকে তো আমরা স্বামী স্ত্রী। লোকে জানলে জানবে! তুমি কি ভয় পাচ্ছ নাকি এখনও?”
রিমি মাথা নাড়ল, “আমি অত ভাবছি না। আসলে ভাবতে পারছি না।”
অনির্বাণ ড্রাইভারের চোখ এড়িয়ে কামিজের ভিতর থেকে রিমির কোমরে আদর করতে করতে বলল, “তোমাকে আর কিছু ভাবতে হবে না সোনা, সব ভাবনা আমার আজ থেকে।”
রিমির ভালো লাগছিল অনির্বাণের স্পর্শ। সে চুপ করে বসে রইল।
রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ। কোনও কোনও জায়গায় রাস্তাই নেই। কোনওমতে জেসিবি দিয়ে মাটি কেটে রাখা। তারা যখন পেলিং পৌঁছল তখন রাত নটা। অনির্বাণ তার পরিচিত হোটেলের ঠিকানা দিয়ে দিয়েছিল ড্রাইভারকে। রিসেপশনে অনির্বাণই নাম ধাম লিখল।
রিমি ফোন অফ করে দিয়েছিল।
রুমে পৌঁছে দরজা বন্ধ করে তারা আর কোনও দিকে তাকাল না। রিমি ডুবে যাচ্ছিল অনির্বাণের শরীরে। অদ্ভুত এক ভালো লাগা জয় করে নিচ্ছিল তাকে।
শীত ছিল। তবু শীত লাগছিল না তাদের। শরীর আবিষ্কারের খেলায় দুজনে মগ্ন হয়ে থাকল সারারাত।
পরদিন রিমির ঘুম ভাঙল সকাল এগারোটায়। জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়ছে।
মুগ্ধ চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখল সে বেশ খানিকক্ষণ। এই তো চেয়েছিল সে। তার স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে স্বপ্নের পাহাড়ে আসবে কোনও দিন।
অনির্বাণ ঘরে ছিল না। বাথরুমেও নেই। রিমি ভাবল হয়তো ব্রেকফাস্ট আনতে গেছে।
সে ফোন অন করে অনির্বাণের মোবাইলে ফোন করল।
ফোন সুইচড অফ বলছিল।
প্রায় তিন ঘণ্টা পরে ঘরেই চুপচাপ বসে রইল সে। এর মধ্যে বাড়ি থেকে তিরিশের বেশি মিসড কল এসে গেছে।
আড়াইটা নাগাদ রুমে কেউ নক করছিল। রিমি তড়িঘড়ি দরজা খুলল।
তিন-চারজন পুরুষ তাকে ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে ছিটকিনি তুলে দিল।
২ ।।তথাগত।।
“কোরাপশন করতে ধক লাগে জানেন তো? সবার দ্বারা কোরাপশন হয় না। বুকের পাটা দরকার দুর্নীতি করতে। আর কোরাপশন মানে কি শুধু টাকার লেনদেন নাকি? ভাবলে ভুল হবে। সুযোগ সুবিধা নেওয়াও কিন্তু কোরাপশনের মধ্যে পড়ে। এই যে আমি আমার দু-চারটে ছেলে মাঝে মাঝে আপনাদের ইউনিটে ঢুকিয়ে দি, এটাও কোরাপশনের মধ্যে পড়ে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন তো, কত সুবিধা হয় ছেলেগুলোর।”
