বুবকা বলল, “তা ঠিক। আসলে স্ক্রিপ্ট শুনে শুনে সব কিছুই আজকাল স্ক্রিপ্টেড মনে হয়। দেখুন না আমাদের সিনেমাটা যাতে না হয় তার জন্যও কত স্ক্রিপ্ট রেডি করে রাখা ছিল। অবশ্য এখনও চেষ্টা চলছে। একটা সিনেমার তো শ্যুটিংটা বড়ো কথা না। পোস্ট প্রোডাকশনেও অনেক চেষ্টা হবে হয়তো।”
অলকা বলল, “কারা করছে সেসব?”
বুবকা হাসল, “কাছের লোকেরাই।”
অলকা কয়েক সেকেন্ড বুবকার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাছের লোকেরাই বোধহয় আঘাত দিতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাই না?”
বুবকা বলল, “এইজন্য আমি সবাইকে দূরের মানুষ করে রেখে দি।”
বুবকার ফোন বাজছিল। বুবকা দেখল মা ফোন করছে। বলল, “দেখেছেন, কাছের মানুষের কথা বলতে বলতে মা ফোন করে দিল।”
অলকা হাসল। বুবকা ফোনটা ধরল, “বলো।”
“তুমি কোথায়?”
“জানো না? তোমায় তোমার গোয়েন্দা বলেনি?”
“আমার গোয়েন্দা? কে?”
বুবকা হাসতে হাসতে বলল, “কেন? শ্রীযুক্ত তথাগত মিত্র। তিনি তো এখন অফিসের থেকে আমার আর বৈভবীর মধ্যেই বেশি ইন্টারেস্ট খুঁজে পাচ্ছেন।”
“বাজে কথা বোলো না বুবকা। তোমার দাদা তোমাকে যথেষ্ট কেয়ার করে। তুমি যদি তোমার ইন্টারেস্টে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখো তাহলে আমাদের কী করার আছে? যাই হোক, কোথায় আছ এখন?”
“বোলপুরে। শ্যুটে এসেছি।”
“হুঁ। দীপ্তর সিনেমায়?”
“হ্যাঁ।”
“আমাদের কেয়ারটেকার ঘর ঠিক করে রেখেছে তো?”
“আমি তো আমাদের বাড়িতে উঠিনি। এখানে সবার সঙ্গে রিসর্টে উঠেছি।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর বাণী বললেন, “বেশ।”
“কেন ফোন করেছ?”
“তোমাকে কি ফোন করার জন্যও কারণ লাগবে এখন?”
“কারণ ছাড়া তো ফোন করো না।”
“তিন দিন ধরে বাড়ি আসনি। বাবা মায়েরও তো জানতে ইচ্ছা করে ছেলে কোথায় আছে, কী করছে, সেটা বোঝো?”
“বললাম তো আমি এখন বোলপুরে আছি। আর তোমাদের জেনেও ভালো লাগবে, এখানে বৈভবী আসেনি।”
ফোনটা কেটে গেল। বুবকা সেটার দিকে তাকিয়ে বলল, “কত চিন্তা এদের।”
অলকা একটু দূরে চলে গেছিল। বুবকা ডাকল, “আপনি কি রিসর্টে যাচ্ছেন?”
অলকা বলল, “না না, আপনি ফোন করছিলেন তাই আপনাকে একটু স্পেস দিলাম।”
বুবকা বলল, “স্পেস দিলেন! না না, আমার স্পেসের কোনও দরকার নেই। আমি ট্রান্সপারেন্ট। একবার দেখলেই সব বুঝে যাবেন।”
অলকা বলল, “আমার এই জায়গাটা বেশ ভালো লাগছে। অদ্ভুত একটা শান্তি আছে। আমার আর কলকাতায় ফিরতে ইচ্ছা করছে না।”
বুবকা বলল, “আমার উলটোটা। কলকাতা ছাড়া আমার আর কিছু ভালো লাগে না। কেন জানি না, কলকাতার ওপর আমার অদ্ভুত একটা টান কাজ করে। অন্য কোথাও গেলেও সবসময় মনে হয় কখন ফিরি কখন ফিরি। সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার। ছোটোবেলায় যখন কোথাও বেড়াতে যেতাম, বাবা মাকে অস্থির করে দিতাম বাড়ি যাব বলে। সে এক সময় ছিল। আমাদের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। বাবার প্রাইভেট চাকরি, মা পার্টটাইম প্রফেসর। অথচ সেই সময়টাই যেন ভালো ছিল।”
অলকা বলল, “আপনি কিন্তু এখন স্ক্রিপ্ট ছাড়া ভালো কথা বলছেন, আপনি যে এরকম কথা বলতে পারেন সেটাই ভাবতে পারিনি কোনও দিন। আপনাকে দেখে বরাবরই বড়োলোকের বখাটে ছেলে মনে হয়েছে।”
বুবকা বলল, “আমি তো তাই। সে ব্যাপারে আপনার কোনও সন্দেহ আছে নাকি? আমার তো নেই। মানুষ যা বলে সেটাই চোখ বুজে বিশ্বাস করবেন। ঠকতে হবে না।”
অলকা বলল, “তাহলে তো আমার ব্যাপারেও কেউ খুব একটা ভালো কথা বলে না। সেগুলো কি আপনিও ভাবেন?”
বুবকা বলল, “রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস আর ক্যারেকটার সম্পর্কে? একটু মুখ খারাপ করছি কিছু মনে করবেন না, সত্যি বলতে কী, আমার তাতে বাল ছেঁড়া যায়। আমার সম্পর্ক, আমার থেকে বারো বছরের বড়ো বৈভবীকে নিয়ে লোকে কী বলল না বলল, তাতে আমার সত্যি কিছু যায় আসে না।”
অলকা বলল, “আমার প্রথম প্রথম যায় আসত। তারপর দীপ্ত শেখাল, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত বলে যাও, তুমি প্রস, তুমি প্রস, তুমি প্রস, দেখবে একসময় আর সেটা মনে হবে না। আমার কিন্তু সত্যি আজকাল আর কিছু মনে হয় না।”
বুবকা কয়েক সেকেন্ড অলকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি সত্যি বলেন এটা?”
অলকা হাসল, “সত্যি। রোজ বলি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে, মেকআপ রুমে একা থাকলে, রাতে ঘুমাতে যাবার সময়। ভালো লাগে বলার পর আজকাল। বিশ্বাস করুন।”
২১
চাঁদ উঠেছে। বুবকা প্রোডাকশন থেকে একটা গাড়ি নিয়ে বোলপুর থেকে একটা স্কচের বোতল নিয়ে এসে খোয়াইয়ের তীরে গাড়ির সামনের সিটেই বোতল খুলে বসেছে। অলকাও তার সঙ্গে আছে।
অরিত্র একটু গাঁইগুঁই করছিল। বুবকা বলে দিয়েছে সকালে উঠতে কোনও সমস্যা হবে না। দু পেগ মতো চুপচাপই খেল তারা। খানিকক্ষণ পরে বুবকা বলল, “এই এখানে যে আমরা মদ খাচ্ছি, আমাদের কিন্তু একটা দায়িত্ব আছে।”
অলকার হালকা লাগছিল ভিতরটা। সে বলল, “কী দায়িত্ব বলুন তো?”
বুবকা বলল, “জায়গাটা নোংরা করলে চলবে না। এই বনের ভিতরে এই চাঁদ যেমন সুন্দর, জায়গাটাকেও তেমন সুন্দর রাখা উচিত।”
অলকা বলল, “মানুষ তো সুন্দর জিনিসকেই নোংরা করতে চায় সবার আগে।”
বুবকা বলল, “যেমন?”
অলকা বলল, “সম্পর্কগুলো। কত তাড়াতাড়ি আমরা সেগুলো নষ্ট করে ফেলি।”
বুবকা মুগ্ধ হয়ে চাঁদ দেখছিল, অন্যমনস্ক হয়ে বলল, “সম্পর্ক? মানে?”
অলকা বলল, “সম্পর্ক মানে মানুষে মানুষের সম্পর্ক।”
বুবকার সংবিৎ ফিরল, “ওহ, সরি সরি। হ্যাঁ। নষ্ট করি তো। আমি যেমন নষ্ট করে ফেললাম। বাবা মার সঙ্গে সম্পর্কটাই। কী করব বলুন? কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট হয়ে যাচ্ছিল তো! আপনি কার সঙ্গে নষ্ট করলেন সম্পর্ক?”
অলকা হেসে বলল, “আমি তো নষ্ট মেয়েই। অপয়াও। বিয়ে করার পরই বরের চাকরি চলে গেল।”
বুবকা বলল, “ছাড়ুন তো, ওসব ফালতু কথা। কিছু হলেই মেয়েদের দোষ। আমার এক পিসি আছে, দেখি তো, পেটে গ্যাস হলেও মুখ চুন করে বলবে নিশ্চয়ই ওই অপয়া বউটা দুপুরে ভাত খাবার সময় নজর দিয়েছে তাই গ্যাস হয়ে গেছে।”
অলকা বলল, “মেয়েরাই তো অপয়া। ছেলেরা অপয়া হয় নাকি?”
বুবকা বলল, “হয় না আবার? আমাদের পাড়ায় এক দাদু আছে। ওঁর মুখ দেখে সকালে বেরিয়েছেন কি আপনি মরেছেন। মরেই গেছেন। কেউ বাঁচাতে পারবে না, এত অপয়া।”
অলকার ফোন বাজছিল। বুবকা বলল, “ফোনটা ধরুন।”
অলকার সঙ্গে একটা হ্যান্ডব্যাগ ছিল। সেটার ভিতর থেকে ফোনটা সশব্দে নিজের অস্তিত্ব জাহির করছিল। ফোনটা বের করে অলকা দেখল দীপ্ত ফোন করছে। ফোনটা ধরল সে, “হ্যাঁ বলো।”
“তুমি কোথায়?” দীপ্তর গলা থমথমে।
অলকা বলল, “কেন বলো তো?”
“অরিত্র ফোন করেছিল। তুমি বুবকার সঙ্গে বেরিয়েছ?”
“হ্যাঁ। কী করব একা একা?”
“ওরে খানকি, তোকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছি আমি। আর যেই নতুন কচি ছেলে দেখলি মাথা চিবোতে চলে গেলি? কোন হোটেলে, কবার হল?” হিসহিস করে উঠল দীপ্তর গলা।
অলকা হাসল, “বাহ, তোমাদের গলাগুলো কী সুন্দর সব এক হয়ে যায়।”
“কী বলতে চাইছিস?”
“আমার বর, তুমি, কত সুন্দর তোমরা একভাবে ভাবতে পারো সেটাই বলছি।”
দীপ্ত সামলাল নিজেকে, “শোনো, আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বলছি। কাল ভোরবেলা শ্যুট। কেন রাতে বেরিয়েছ? তোমার ভালো ঘুম দরকার বেবি।”
অলকা বলল, “তুমি অভিনয় করো না কেন? করতে পারতে। অনেককে হারিয়ে দেবে, বিলিভ মি।”
দীপ্ত বলল, “আমি তোমার কথা ভেবেই তো অস্থির থাকি সারাদিন। আচ্ছা, তুমি রিসর্টে ফিরে যাও আর আধঘণ্টার মধ্যে।”
অলকা ঠান্ডা গলায় বলল, “আমার সময় হলে আমি যাব। তোমার কাছে যদি আমি ইম্পরট্যান্ট হতাম তাহলে কলকাতায় কাজের অজুহাত দেখিয়ে থেকে যেতে না, নিজেও আসতে।”
দীপ্ত বলল, “তুমি এই কথা বলছ? আচ্ছা তুমি জানো না এই সিনেমাটায় আমি কেন টাকা ঢালছি? শুধু তোমার জন্য, ভুলে যাচ্ছ?”
অলকা বলল, “ওহ, আমার জন্য শুধু? বাণী মিত্রর ফ্যামিলি ভাঙা-টাঙার কোনও ব্যাপার নেই বলো?”
দীপ্ত কঠিন গলায় বলল, “তোমার সামনে বুবকা আছে?”
অলকা বলল, “না, দূরে আছে।”
দীপ্ত বলল, “ওর সামনে এসব কথা কেন বলছ? জানো না এর ফলাফল কী হতে পারে? তোমার থেকে অনেক ম্যাচিওরড বিহেভিয়ার এক্সপেক্ট করি আমি।”
অলকা বলল, “আচ্ছা। তুমি চিন্তা কোরো না। অনেক ম্যাচিওরড বিহেভিয়ারই করব আমি। আর শোনো, বুবকার সঙ্গে আমি শুইনি।”
দীপ্ত বলল, “ওহ, আবার উলটো কথা।”
অলকা বলল, “তুমিই তো শুরু করেছিলে তাই না?”
দীপ্ত বলল, “আচ্ছা। তুমি অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল যেয়ো, তাহলেই হবে। বাই।”
ফোনটা কেটে গেল। বুবকা বনের মধ্যে হাঁটছিল। অলকা ডাকল, “আমাকে আর-একটা বানিয়ে দেবেন?”
বুবকা এসে বলল, “দীপ্তদা ফোন করেছিল?”
অলকা বলল, “হ্যাঁ, জিজ্ঞেস করল আমার সঙ্গে কতবার শুয়েছেন?”
বুবকা অবাক হয়ে বলল, “সিরিয়াসলি?”
অলকা হাসল, “না না ইয়ার্কি মারছি।”
বুবকা বলল, “বলা যায় না, বলেছে হয়তো, প্রেমিকরা রাগের মাথায় যা ইচ্ছা বলতে পারে।”
অলকা বলল, “হ্যাঁ, প্রেমিকদের কোনও দোষ নেই তো, তারা নির্দ্বিধায় প্রেমিকার চরিত্রকে কাঠগড়ায় তুলতে পারে। প্রেমিকরা তো ঈশ্বরের অপর নাম। তাদের কোনও দোষ থাকবে কেন?”
বুবকা ঘড়ি দেখল, “সাড়ে এগারোটা বাজে। ফিরবেন?”
অলকা বলল, “আমি পারলে এখানেই থেকে যেতাম।”
বুবকা বলল, “পুলিশের গাড়ি টহল দেওয়ার কথা বলেছিল একজন। বেকার ঝামেলায় জড়ানো ভালো হবে না বোধহয়। ফিরি চলুন।”
অলকা বলল, “অগত্যা। চলুন।”
বুবকা গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল।
অলকা বলল, “আপনি আপনার প্রেমিকাকে খুব ভালোবাসেন? তাকে প্রস বলেন?”
বুবকার মাথা ঝিম ঝিম করছিল নেশায়, অলকার প্রশ্ন শুনে একটু ভেবে নিয়ে বলল, “এখনও অবধি বলিনি।”
অলকা বলল, “বলবেন কোনও দিন বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে?”
বুবকা বলল, “জানি না।”
অলকা বলল, “ছোটোবেলায় এক স্যারের কাছে শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথের ছোটো ছেলে মারা যাবার পর রবীন্দ্রনাথ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে গানটা লিখেছিলেন। (তথ্যটা ভুল। শমীর মৃত্যু ২৪ নভেম্বর, ১৯০৭। প্রায় ২৫ বছর পর মীরা দেবীর ছেলের মৃত্যুর পর চিঠিতে লেখেন সেদিন ট্রেন থেকে জ্যোৎস্না দেখার কথা। সেই সূত্রে এই গানটি ঘিরে মিথ প্রচলিত হয়ে গেছে। এই গানটি লেখা হয়েছিল ১৯১৪ সালে, ২২ চৈত্র, ১৩২০ বঙ্গাব্দ। ) ছেলে মারা যাবার পর ওঁর মনে হয়েছিল আমার দুঃখে তো এই জ্যোৎস্নার কোনও পরিবর্তন হবে না। আর বাকি প্রকৃতির তো কিছুই হবে না। এখন চারদিক দেখে আমার সেটাই মনে হচ্ছে। এত ভালো পরিবেশ, আমার দুঃখে একটুও কান্না নেই কারও দেখুন।”
বুবকা বলল, “আপনি গানটা জানলে করতে পারেন তো।”
অলকা বলল, “আমি গান জানি না।”
বুবকা খোলা গলায় গান ধরল গাড়ি চালাতে চালাতে।
গানের মাঝপথে গিয়ে সে বাধা পেল। ফোন আসছে। সে তখনও লালমাটিতেই ছিল। গাড়িটা দাঁড় করাল। তথাগত। একটা খিস্তি মেরে ফোনটা ধরল সে, “কী বে, এখনও কাঠি করে যাচ্ছিস? বল এত রাতে কী ছিঁড়তে ফোন করেছিস।”
“বুবকা একটা খারাপ নিউজ আছে।”
“ভালো নিউজ দেওয়ার জন্য তো ফোন করিসনি। কী হয়েছে?”
“বৈভবী…”
“বৈভবী কী?”
“রাজীব আগরওয়ালের সঙ্গে মন্দারমণি যাচ্ছিল, বম্বে রোডে গাড়িটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, দুজনেই স্পট ডেড।”
বুবকা ফোনটা কেটে বাইরের দিকে তাকাল।
