১৯
।। বাণী মিত্র।।
তিন্নি বাপের বাড়ি এসেছে। তিন্নি অন্তঃসত্ত্বা। তিন্নির মা তিন্নির সাধ দিচ্ছে।
তিন্নির হিংসুটে বউদি তিন্নির দুধে বিষ মিশিয়ে দিয়েছে।
তিন্নি সেটা খেতে যাবে।
তখনই তিন্নির বিড়াল এসে দুধের বাটি উলটে দেবে।
…
সিনটা এই লিখেছিল রিখিয়া। সমস্যা দেখা গেল শ্যুটের সময়। ডিরেক্টর তরুণ দাস স্ক্রিপ্টটা দেখে রেগে গেছেন। রিখিয়া ফ্লোরে এসেছিল। তাকে দেখে বললেন, “এই যে ম্যাডাম, একটু রিয়েলিস্টিক ভাবলে হত না? বিড়াল পাব কোত্থেকে? তাও এরকম ট্রেইন্ড বিড়াল।”
বাণী তখন ফ্লোরে ঢুকছিলেন, তরুণকে বললেন, “বিড়াল বাদ দিয়ে দিন, তিন্নির মাকে খাইয়ে দিন দুধটা। একজন কমে যাবে, আমাদের বাজেটও রিডিউস হবে, আবার তিন্নির কান্নাকাটির ফলে শো টিআরপি-ও বাড়বে।”
রিখিয়া কাঁচুমাচু মুখে বলল, “কিন্তু দিদি, তিন্নির মাকে মারলে অসুবিধা আছে। তিন্নির মার সঙ্গে তিন্নির শ্বশুরের এককালে প্রেম ছিল। সেটা নিয়ে একটা সিন ভেবে রেখেছি।”
বাণী মিত্র বিরক্ত হয়ে বললেন, “তিন্নির মার সঙ্গে তিন্নির শ্বশুরের কবে প্রেম ছিল?”
রিখিয়া আহত গলায়, “আপনি দেখেননি দিদি? শুরুতেই তো আভাস দিয়েছিলাম।”
বাণী বললেন, “আমার মেমোরি তো এত খারাপ না। তাহলে কোনও কারণে মিস করে গেছি হয়তো। শোন, তিন্নির মাকে মেরে দে, বলছি তো, ওই ফ্ল্যাশব্যাকগুলো দিবি, খারাপ হবে না।”
রিখিয়া বলল, “দিদি, তিন্নি বাপের বাড়ি এলে সমস্যা হয়ে যাবে তো, সিরিয়ালের ব্যালান্সটা নষ্ট হয়ে যাবে না?”
বাণী একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, “তাহলে দুধ দেবার দরকার কী আছে?”
রিখিয়া বলল, “দুধের সিন তো আগের এপিসোডে শুরু হয়ে গেছে।”
বাণী বললেন, “তোর হঠাৎ বিড়ালের কথা মাথায় এল কেন? এতদিন ধরে লিখছিস, মাথাটা গেছে নাকি?”
রিখিয়া বলল, “ছেড়ে দাও, তিন্নির হাত থেকে বাটিটা পড়ে গেছে, এভাবেই দেখিয়ে দাও।”
বাণী তরুণকে বললেন, “এবার ঠিক আছে?”
তরুণ খুশি হয়ে চলে গেলেন। শ্যুট শুরু হবে একটু পরে। ফ্লোর রেডি হচ্ছে। বাণী অফিসের দিকে রওনা হলেন।
আহেলী মিত্র তিন্নির পার্টটা করছে। স্টুডিওতে ঢুকছিল। তাঁকে দেখে তটস্থ হল। বাণী মিত্র হালকা হেসে বেরিয়ে গেলেন।
তথাগত ফোন করছিল। তিনি ধরলেন, “হ্যাঁ বলো। অফিস থেকে বেরিয়েছ?”
“হ্যাঁ মা। আমি অফিসে এলাম তো।”
“অফিসে এলে মানে? বুঝলাম না।”
“মানে তোমার অফিসে এলাম।”
বাণী অবাক হলেন, “কেন, কী হল?”
তথাগত বলল, “এসো, বলছি।”
স্টুডিওর পাশেই অফিস। বেশিক্ষণ লাগল না। তথাগত বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, বাণী বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
তথাগত বলল, “তোমার অপেক্ষা করছিলাম।”
বাণী অফিসে ঢুকলেন, নিজের ঘরটা বাণী খুব যত্ন নিয়ে সাজিয়েছেন। একদিকে গল্প শোনার জন্য সোফা, তাকিয়া সব আছে। অন্য দিকে টেবিল। বাণী সোফায় বসে বললেন, “বলো, বাড়িতে না গিয়ে অফিসে এলে কেন?”
তথাগত একটু ইতস্তত করে বলল, “মা, আমি আসলে একটা জিনিস ভাবছিলাম।”
বাণী বললেন, “কী?”
তথাগত বলল, “আমি ভাবছি চাকরিটা ছেড়ে দি।”
বাণী বললেন, “তারপরে?”
তথাগত বলল, “তোমাকে জয়েন করি। আজকাল চাকরিটা ভালো লাগছে না ঠিক, তা ছাড়া হাউস বড়ো হচ্ছে, তুমি একা পড়ে যাচ্ছ।”
বাণী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “কথাটা তোমার বাবাও আমাকে বলেছে অনেকবার। আমি নিজে থেকে কিছু বলিনি কোনও দিন। ভেবেছি তুমি একটা নতুন জীবনে প্রবেশ করতে যাচ্ছ। ডিসিশনটা তুমিই নাও। আজ যখন বললে আমি অনেকদিন পর খুশি হলাম। বুবকার ওপর আমি আর কোনও আশা করি না। বাই দ্য ওয়ে, প্রীতিকাকে বলেছ এই ব্যাপারে কিছু?”
তথাগত মাথা নাড়ল, “ওকে হিন্ট দিয়েছি। ডিসিশনটা জানাইনি।”
বাণী বললেন, “ইজ শি হ্যাপি?”
তথাগত বলল, “আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি মা। তা ছাড়া ও হ্যাপি হোক বা আনহ্যাপি, ইট ডাজন্ট ম্যাটার। আমার কাছে তুমি খুশি কি না সেটাই ম্যাটার করে।”
বাণী খুশি হলেন। বললেন, “আমি এখনও বলব তুমি সাতদিন সময় নাও। ভাবো, তারপর সাতদিন পর আমায় আবার ডিসিশনটা জানাও।”
তথাগত বলল, “আমি ঠিক করে নিয়েছি মা।”
বাণী মাথা নাড়লেন, “না, তুমি তো জানোই, একদিনে আমি কোনও ডিসিশন নিই না। এটা তোমার লাইফের ডিসিশন, টেক ইওর টাইম।”
তথাগত বলল, “বেশ। তাই হোক।”
বাণী বললেন, “কী খাবে? অফিস থেকে বেরিয়ে তো খাওনি কিছু। চাইনিজ আনাই?”
তথাগত বলল, “আচ্ছা।”
বাণী বললেন, “বুবকাকে আর ফোনে পেয়েছিলে?”
তথাগত মাথা নাড়ল, “না, ও বলছিল দীপ্ত রায়ের বাড়িতে প্রি-শ্যুটিং সেলিব্রেশন আছে।”
বাণী মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবছিলেন। তথাগতর কথার উত্তর দিলেন না।
২০
।।বুবকা – অলকা।।
আউটডোর। শান্তিনিকেতনে। পরের দিন থেকে শ্যুটিং শুরু। তারা দুপুরে এসে পৌঁছেছে।
বুবকার বিরক্ত লাগছিল। বৈভবী আসেনি। দীপ্ত রায়ও। এখানে শুধু তার আর অলকার শ্যুট।
একটা রিসর্ট ভাড়া করা হয়েছে। গোটা ইউনিটটা সেখানেই আছে।
বুবকা একা একা হাঁটতে বেরিয়েছিল। বিকেল হয়েছে। আজ হাটবার না। ভিড় নেই। অনেকটা হাঁটল। খানিকক্ষণ পর বৈভবী ফোন করল, “কী খবর?”
বুবকা বলল, “ভালো লাগছে না ধুস। তুমি চলে আস।”
বৈভবী বলল, “বাচ্চাদের মতো কোরো না তো, তিন দিনের তো ব্যাপার। তারপর তো ইনডোর শুরু। তিন দিন কোনওমতে কাটিয়ে দাও।”
বুবকা বলল, “কাল ভোর সাড়ে চারটে থেকে শ্যুট শুরু বুঝলে? নইলে আজ কলকাতায় থেকে সকালে চলে এলেই হত। ”
বৈভবী নরম গলায় বলল, “সে জানি তো। আচ্ছা, আমি ফোন করে তুলে দেব?”
বুবকা বলল, “থাক। আমার ফোনে অ্যালার্ম আছে। তোমায় কষ্ট করতে হবে না।”
বৈভবী হাসল, “ধরে নাও না, তোমার কেরিয়র আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে। ধরে নাও, এটা তোমার নতুন একটা চ্যালেঞ্জ। তুমি কনসেন্ট্রেট করো। আর আজ রাতে দয়া করে বোতল খুলে বোসো না।”
বুবকা বলল, “বোর লাগছে তো।”
বৈভবী বলল, “তোমাদের শান্তিনিকেতনে বাড়ি আছে না?”
বুবকা বলল, “আছে।”
বৈভবী বলল, “সেখান থেকে ঘুরে এসো।”
বুবকা বলল, “না, ওখানে আমি যাব না।”
বৈভবী বলল, “আচ্ছা যেয়ো না। এখন কী করছ?”
বুবকা বলল, “প্রকৃতির মাঝে হেঁটে বেড়াচ্ছি।”
বৈভবী হাসল, “বাবা, রাবীন্দ্রিক ভাষা তো পুরো। আচ্ছা, তুমি হাঁটো, কোনওরকম সমস্যা হলে ফোন কোরো। তবে ভুলেও কলকাতা আসার কথা ভেবো না কিন্তু।”
বুবকা বলল, “আচ্ছা। ভাবব না। তবে পরের বার আউটডোরে তুমি না এলে আমিও নেই মনে রেখো।”
বৈভবী বলল, “আচ্ছা। রাখো এবার, পাগল কোথাকার।”
বুবকা ফোনটা রাখল। লালমাটির পথ ধরে অনেকটা হেঁটে ফেলেছিল সে। প্রথম প্রথম ভালো লাগছিল না। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল সোনাঝুরি গাছের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাবার মধ্যেও একটা নেশা ধরা ব্যাপার আছে। চারপাশে কেউ নেই। বুবকা গলা ছেড়ে গান ধরল। অনেকক্ষণ গাইবার পর বুঝল অদ্ভুত ভালো লাগছে তার। মনের মেঘটা কোথায় যেন কেটে যাচ্ছিল।
“আপনি বেশ ভালো গান।”
বুবকা চমকে তাকাল। অলকা কখন চলে এসেছে খেয়াল করেনি।
বলল, “আপনি কখন এলেন?”
অলকা বলল, “আমি অনেকক্ষণ এসেছি। গাছের আড়ালে চুপচাপ বসে ছিলাম।”
বুবকা বলল, “সে কী কেন? সবাই তো আপনাকে খুঁজবে?”
অলকা বলল, “খুঁজবে না। আমাকে কেউ খোঁজে না।”
বুবকা বলল, “কী যে বলেন! আপনি লিড অ্যাক্ট্রেস।”
অলকা বলল, “হ্যাঁ, শ্যুটিংয়ের সময় খুঁজবে হয়তো। আচ্ছা যেটা বলছিলাম, আপনি গান শিখেছেন?”
বুবকা হাসল, “হ্যাঁ, ছোটোবেলায়। খুব বেশি দিন না। আসলে চিরকালই দুরন্ত ছিলাম তো। গানের মাস্টারমশাই এলে ওঁর কাঁধে চেপে বসে থাকতাম।”
অলকা হাসল অনেকক্ষণ ধরে। বুবকা বলল, “আপনি গান জানেন?”
অলকা বলল, “না।”
বুবকা বলল, “নাচ?”
অলকা বলল, “ছোটোবেলায় শিখেছিলাম। ক্লাস সেভেনে উঠলে বাবা বলল, মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। নাচ বন্ধ। ব্যস, সেই যে বন্ধ হল আর শেখা হল না।”
বুবকা বলল, “সেটা নিয়ে চিন্তা করছেন কেন? আবার শুরু করলেই হয়।”
অলকা বলল, “স্বাধীন হলেই কি সময়টা আর ফিরে পাওয়া যায়? ক্লাস সেভেনে যে জিনিসটা সবথেকে বেশি ভালোবাসতাম, সেটা বন্ধ করে দেবার পর যে কষ্টটা হয়, সে কষ্টটা কি এখন আর উশুল হয়?”
বুবকা বলল, “বাহ, আপনি বেশ ভালো কথা বলেন তো। আপনার দেখছি স্ক্রিপ্ট রাইটার লাগে না।”
অলকা হাসল, “তা হবে। নিজের কথা বলতে স্ক্রিপ্ট রাইটার লাগে না তো।”
