১৭
।। শুভ।।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে তুমুল। শুভ রাস্তার পাশের এক বাসস্ট্যান্ডে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পেটে ব্যথা করছে। ঘাড়েও। জামাটা কলারের কাছে হালকা ছিঁড়েছে। তবে সে ব্যথাটা গায়ে লাগছে না তেমন। মাথা কাজ করছে না তার।
খানিকক্ষণ আগে তার মনে পড়েছে বাড়িতে আলমারিতে খুব বেশি হলে আড়াইশো টাকা আছে। অলকার কিছু গয়নাও আছে। সেগুলোকে বেঁচে দেবে? তাহলে হয়তো কদিন খাবার টাকা উঠে আসবে।
তারপরে কী করবে?
শুভ চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিল। যারা গাড়ির ভেতর আছে, বাড়ির ভেতর আছে, কী সুন্দর বৃষ্টি উপভোগ করছে, আর যাদের মাথার ওপরে ছাদ নেই তারা কোনওমতে বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে টিকে আছে। জীবনটাই তাই, যতক্ষণ আর্থিক নিরাপত্তা আছে ততক্ষণ সব কিছুই ভালো লাগে। পেট কীভাবে চলবে যাদের চিন্তা করতে হয় না, তারা আর সব কিছু নিয়ে চিন্তা করতে পারে। আর যাদের চলে না, তাদের পেটের চিন্তাতেই দিন কাটিয়ে দিতে হয়।
“কি রে শুভ, এখানে কী করছিস?”
শুভ মুখ ফিরিয়ে দেখল কখন পিকলু এসে দাঁড়িয়েছে।
সে বলল, “কিছু না ভাই, বাড়ি ফিরব এখন।”
পিকলু বলল, “বাড়িতে কী কাজ?”
শুভ বলল, “কোনও কাজ নেই। কেন বল তো?”
পিকলু বলল, “আমার বাড়ি চ। বাংলা খাওয়াব।”
শুভ বিমর্ষ মুখে বলল, “আজ টাকা নেই ভাই। অবস্থা খুব খারাপ।”
পিকলু বলল, “টাকা নেই তাতে কী হয়েছে? আমি আছি তো। পরে একদিন তুই খাইয়ে দিবি!”
শুভ ম্লান হাসল, “ওই পরের দিন যে কবে আসবে ভাই সেটা আমিও জানি না।”
পিকলু ইয়ার্কি মেরে বলল, “কেন বে, বউ ভেগেছে?”
শুভ কয়েক সেকেন্ড পিকলুর দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ ভাই।”
পিকলু শুভর পেটে খোঁচা মেরে বলল, “শালা তুইও আজকাল ইয়ার্কি করিস।”
শুভ বলল, “না রে ভাই, সত্যি ভেগেছে।”
পিকলু অবাক চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, “মাইরি?”
শুভ বলল, “মাইরি। দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাটে চলে গেছে মাগি।”
পিকলু নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “ছি ছি ভাই, ঘরের কথা এরকম বাইরে সবাইকে বলে বেড়াতে নেই। ঘরের বউ না?”
শুভ বলল, “বালের বউ বাঁড়া। ছেনাল খানকি মাগি। পরের সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়।”
বাসস্ট্যান্ডে কয়েকজন যুবতি দাঁড়িয়েছিল। তারা কড়া চোখে শুভর দিকে তাকাল।
পিকলু শুভকে হাত ধরে টেনে বাসস্ট্যান্ডের বাইরে নিয়ে এল, “ভাই মার খাওয়াবি নাকি রাস্তাঘাটে?”
দুজনেই ভিজছিল। শুভ বলল, “আর ভাই মার তো খেয়েই এসেছি। পেটে লাথি মেরেছে ওর নাং। বিচি ফেটে যেত আর-একটু নিচে মারলে। বাল মার খেয়ে এলাম, আর বেঁচে থেকে কী হবে? ওই খানকির ছেলেকে গাঁড় পেঁচিয়ে দুটো লাথি মারলে তো শান্তি পাওয়া যেত!”
পিকলু শুভকে সামলাচ্ছিল। বলল, “ভাই, তুই ছিলি আমাদের মধ্যে সবথেকে ঠান্ডা মাথার ছেলে। তোর এরকম মাথা গরম হলে কি ভালো লাগে বল? কোন বাড়ির ছেলে তুই সেটা দেখ। আমাদের মতো বস্তির মাল তো তুই না।”
শুভর চোখ লাল হয়ে গেছিল, সে বিড়বিড় করে বলল, “আমি বস্তিরই ছেলে ভাই। ভদ্রঘরের লোকেদের বউ বরকে নাঙের ঘরে ডেকে শাড়ির কুঁচি ধরতে বলে কোনও দিন দেখেছিস?”
পিকলু বলল, “তুই যেতে গেলি কেন? পরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেই পারতিস।”
শুভ বলল, “হাতেনাতে ধরতে গেছিলাম মাগিকে। হাতেনাতে ধরেছি। খাটের ওপর চাদর পড়ে আছে, দেখে বোঝাই যাচ্ছে কিছুক্ষণ আগে লাগিয়ে উঠেছে, আমার ঘরের বউ, আমার বাড়িতে শাখা সিঁদুর পরে অন্য লোকের সঙ্গে শুতে যায়। মেরেই ফেলতাম আজ ওকে। ওই শুয়োরের বাচ্চা চলে এল বলে বেঁচে গেল মাগি।”
পিকলুর ঘর চলে এসেছিল। পিকলু শুভকে জোর করে স্নান করিয়ে জামা কাপড় পালটিয়ে নিজের লুঙ্গি আর গেঞ্জি দিল।
পিকলুর বউ ঘরে ছিল না। খাটের তলা থেকে বাংলার বোতল বের করে গ্লাসে মদ ঢেলে দিয়ে শুভকে খাওয়াল।
শুভ খেয়ে ক্রমাগত অলকাকে গালাগালি দিয়ে যেতে লাগল।
পিকলু চুপচাপ বসে শুনতে লাগল।
দরজায় তিনটে নক হল। পিকলু শুভকে বলল, “তুই বস, কেউ এসেছে বোধ হয়।”
পিকলু বাইরে গিয়ে ইদ্রিশকে নিয়ে ঘরের ভিতরে এল।
ইদ্রিশ শুভকে দেখিয়ে বলল, “মালটা কে রে?”
পিকলু বলল, “আমার বন্ধু।”
শুভ বলল, “শুধু বন্ধু বলছিস কেন? বল আমার বউকে নিয়ে দীপ্ত রায় শোয়। সবাইকে বল।”
ইদ্রিশের কান খাড়া হল, পিকলুকে বলল, “ওর বউকে নিয়ে দীপ্ত রায় শোয়, মানে?”
শুভ বলল, “আমাকে জিজ্ঞেস কর না ভাই, আমি বলছি, ওই মাগিটাকে দেখিসনি, ওই যে কী বালের সিরিয়াল করে, মুখার্জি বাড়ির বউ, দেখেছিস তো?”
ইদ্রিশ বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখেছি তো।”
শুভ বলল, “ওই মাগিই তো আমার বউ বে। পালিয়েছে।”
পিকলু মাথা নিচু করে বসে ছিল।
ইদ্রিশ হেসে বলল, “উফ ভাই পিকলু, তোর বন্ধুর জন্য আর-এক বোতল মদ নিয়ে আয়। আনতে এসেছিলাম একটা খবর, এ তো ধমাকা লাগিয়ে দিলি ভাই।”
১৮
।।বুবকা।।
বুবকার ঘুম ভাঙাল বৈভবী। বুবকা বলল, “কী হল, এত সকালে জাগাচ্ছ কেন?”
বৈভবী থমথমে গলায় বলল, “আমরা আজ পেজ থ্রি নিউজ বুবকা।”
বুবকা উল্লসিত গলায় বলল, “বাহ, এ তো দারুণ খবর।”
বৈভবী বলল, “খবরটা পড় আগে।”
কাগজটা বুবকার খাটে দিল বৈভবী। বুবকা উঠে খবরটা পড়ল। পড়তে পড়তে উত্তেজিত হয়ে বলল, “তিলক শর্মা! কোথায় থাকে এই মালটা? এই নিউজটা করার মানে কী?”
বৈভবী ক্লান্ত গলায় বলল, “দীপ্ত রায়ের রক্ষিতা আর আমাকে একই লাইনে বসিয়ে দিল?”
বুবকা জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, “এত খবর লোকটা পেল কোত্থেকে?”
বৈভবী বলল, “তুমি মাথা ঠান্ডা করো। ইম্পালসিভ হয়ে কিছু করে বোসো না প্লিজ।”
বুবকা বলল, “মাথা ঠান্ডা করব মানে? মানেটা কী? তুমি বুঝতে পারছ ব্যাপারটা কোন দিকে গেছে?”
বৈভবী বলল, “কী করবে তাহলে?”
বুবকা ফুঁসছিল। বলল, “আমাকে ফোনটা দাও তো।”
বৈভবী বলল, “কাকে ফোন করবে?”
বুবকা বলল, “দীপ্তদাকে।”
বৈভবী বলল, “কেন?”
বুবকা বিরক্ত হল, “আহ, দাও না।”
বৈভবী ফোনটা দিল। বুবকা দীপ্তকে ফোন করল। দীপ্তও ঘুমাচ্ছিল। ফোনটা ধরে বলল, “বলো বুবকা।”
বুবকা বলল, “তোমার ফ্ল্যাটে কি কোনও ঝামেলা হয়েছে কাল? ওই মেয়েটার হাজব্যান্ডের সঙ্গে তোমার?”
দীপ্ত ঘুমের মধ্যেই অবাক গলায় বলল, “তুমি কী করে জানলে?”
বুবকা বলল, “কাগজে বেরিয়েছে তো। পেজ থ্রিতে, টাইমসে।”
দীপ্ত বলল, “ওয়েট ওয়েট। সবে তো কালই হল ঝামেলাটা। মিডিয়া জানল কী করে?”
বুবকা বলল, “সেটা আমি কী করে জানব? কিন্তু বাজে ব্যাপারটা হল এরা তোমার সঙ্গে আমার আর বৈভবীর রিলেশনটাও জড়িয়েছে। আমরা যারা সিনেমাটা করছি, তারা সবাই বিতর্কিত লোকজন, সে ব্যাপারে একটা নোংরা ইঙ্গিত আছে।”
দীপ্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বলল, “আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো। আজ পার্টি। তোমার ফেবারিট স্কচ খাওয়াব আজ।”
বুবকা অবাক হয়ে বলল, “মানে? কেন?”
দীপ্ত বলল, “কেউ আমাদের কাঠি করতে গিয়ে আমাদের প্রচার করে দিয়েছে বুবকা। বুঝতে পারছ না?”
বুবকা বলল, “লোকে আমাদের নিয়ে উলটোপালটা লিখবে সে আনন্দে মদ খাব?”
দীপ্ত বলল, “হ্যাঁ। খাবে। পেপারে একটা সিনেমার অ্যাড দিতে কত টাকা খরচ হয় সে সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে? আমরা শুরু করতে পারলাম না আর এরা ফ্রিতে আমাদের অ্যাড করে দিয়েছে। চলে এসো, দেরি কোরো না।”
ফোনে একটা শব্দ হচ্ছিল। বুবকা দেখল দাদা কল ওয়েটিং-এ আছে। সে বলল, “আমি ফোনটা রাখছি। বাড়ি থেকে ফোন করছে।” বলে দীপ্তর কথার অপেক্ষা না করেই বুবকা দাদার ফোনটা ধরল, “বল।”
তথাগতর গলা গম্ভীর, “তুই বৈভবীর ওখানে?”
বুবকা বলল, “অত সাসপেন্স রাখতে হবে না। খবরটা পড়েছি। কী বলবি বল।”
তথাগত বলল, “মা খবরটা পড়ে ফায়ার হয়ে আছে।”
বুবকা ঘড়ি দেখে অবাক গলায় বলল, “মা এত সকালে উঠল কী করে? নিশ্চয়ই কেউ কাঠি করেছে। তুই?”
তথাগত বলল, “আমি কেন হব। আমি তো বাইরের ঘরে বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি মা এসে বলছে কাগজটা কোথায়। এখন তোকে নিয়ে মা বাবার মিটিং চলছে।”
বুবকা বলল, “না মামা, মুরগি কোরো না। তোমাকে আমি আজ থেকে চিনি না। তুমি হলে সাত সেয়ানার এক সেয়ানা। আজকের হারামি তুমি? আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা তোরই সাজানো। ঠিক বলছি?”
তথাগত বলল, “তোকে তো হেল্প করতে যাওয়াটাও প্রবলেম। তোর ভালোর জন্য বলছি তুই বাড়ি চলে আয় যত তাড়াতাড়ি পারিস।”
বুবকা বলল, “আমি তো যাব না ভাই। আমার এখন একটা পার্টিতে যেতে হবে।”
তথাগত অবাক গলায় বলল, “পার্টিতে যাবি? এই সাতসকালে?”
বুবকা বলল, “হ্যাঁ। আমাদের সিনেমার প্রি-শ্যুটিং সাকসেস পার্টিতে।”
তথাগত বলল, “তুই যা করছিস সব ভেবে করছিস তো বুবকা?”
বুবকা বলল, “তুই যা যা করছিস সেটা ভেবে করছিস তো দাদা?”
ফোনটা কেটে গেল।
বুবকা হাসতে লাগল।
বৈভবী বলল, “কী হল?”
বুবকা হাসতে হাসতে বলল, “খেলতে রহো খেলতে রহো।”
