১৫
।। বুবকা।।
দুপুর বারোটা বাজে। বুবকা বৈভবীর বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করে এসে দেখল বৈভবীর বাড়ির দরজায় তালা।
ফোন করল বৈভবীকে, ফোন রিং হয়ে গেল। বৈভবী ফোন ধরল না। বুবকা কিছুক্ষণ বৈভবীর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। কয়েক মিনিট পরে বৈভবীর নাম্বারে বেশ কয়েকবার ফোন করে গেল। প্রত্যেকবারই পুরো রিং হয়ে গেল।
বুবকা বিড়বিড় করল, “কোথায় গেল, কোথায় চলে গেল!”
সে গাড়িতে গিয়ে বসল। আরও তিনবার বৈভবীকে ট্রাই করে না পেয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
কিছুক্ষণ এদিক সেদিক গাড়ি চালিয়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে দ্বিতীয় হুগলি সেতু হয়ে সাঁতরাগাছি হয়ে দিল্লি রোড ধরল। তার মাথা কাজ করছিল না। ফাঁকা রাস্তা, গাড়ির স্পিড ধীরে ধীরে বাড়াতে লাগল বুবকা। ঘণ্টা দু-একের মধ্যে শক্তিগড়ের কাছাকাছি যখন সে চলে এল তখন তার ফোনটা বেজে উঠল, বুবকা গাড়িটা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের বাঁদিকে রেখে ফোনটা ধরল, বৈভবী। “কী হল, এতবার মিসড কল? কী ব্যাপার?”
বুবকা বলল, “কোথায় ছিলে তুমি? কোন চুলোয় গেছিলে?”
বৈভবী বলল, “আরে একটা স্ক্রিপ্ট শুনতে এসেছিলাম আগরওয়ালের এখানে। ফোনটা সাইলেন্ট ছিল বাবু।”
বুবকা বলল, “রাজীব আগরওয়াল? ওই শুয়োর প্রোডিউসারটা, যার নামে দিনে তিনটে করে অ্যাকট্রেস হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ ওঠে?”
বৈভবী কড়া গলায় বলল, “লোকের নামে না জেনে শুনে যা ইচ্ছা তাই বলতে শিখিয়েছেন বুঝি তোমায় বাণী মিত্র?”
বুবকা বলল, “বাণী মিত্র কোত্থেকে এল এখানে?”
বৈভবী বলল, “গায়ে লাগল?”
বুবকা বলল, “তুমি আমাকে বলোনি কেন যে তুমি রাজীব আগরওয়ালের ওখানে গেছ?”
বৈভবী বলল, “আমায় কে খাওয়াবে বুবকা? আমায় তো অভিনয় করেই খেতে হবে।”
বুবকা চেঁচিয়ে উঠল গাড়ির ভিতরে, “আমি খাওয়াব। কত টাকা লাগবে তোমার?”
বৈভবী বলল, “বাণী মিত্রের টাকায় আমাকে খেতে হবে? এত খারাপ সময় এসেছে বুঝি?”
বুবকা বলল, “বাণী মিত্রের টাকায় খাওয়াব কেন? আমি রোজগার করে খাওয়াব তোমায়।”
বৈভবী বলল, “কীভাবে রোজগার করবে?”
বুবকা বলল, “সেটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি শুধু ওই শুয়োরটার ওখানে যাবে না।”
বৈভবী ক্লান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, আর যাব না। চলে আস এবার। আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
বুবকা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “কোথায় বলো তো আমি এখন?”
বৈভবী বলল, “কোথায়? বাড়ি চলে গেছ?”
বুবকা বলল, “আমি এখন শক্তিগড়ে। তুমি ফোন না করলে ঠিক করেছিলাম যেদিকে চোখ যায় চলে যাব।”
বৈভবী অবাক হয়ে বলল, “শক্তিগড়ে! সে কী! ফিরে এসো তাড়াতাড়ি। এ আবার কী পাগলামি শুরু করলে তুমি?”
বুবকা বলল, “তুমি এরকম করো আমার সঙ্গে। আমি সত্যিই কোনও দিন কোথাও একটা চলে যাব। আমাকে কোথাও খুঁজে পাবে না।”
বৈভবী বলল, “চলে এসো, প্লিজ, আমি আর এরকম করব না, বিশ্বাস করো।”
বুবকা বলল, “ওকে, লাঞ্চ করেছ?”
বৈভবী বলল, “না, রান্না করে গেছি।”
বুবকা বলল, “কী রান্না করেছ?”
বৈভবী বলল, “ভাত আর মাছ। আর কিছু না।”
বুবকা বলল, “ওকে, বাড়ি যাও, আমি আসছি।”
বৈভবী বলল, “আর শোনো, প্লিজ, এরকম পাগলামি আর কোনও দিন কোরো না বুবকা। কথা দাও।”
বুবকা বলল, “তুমিও কোনও দিন আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না, বলো। আমিও আর কোনও দিন এরকম করব না।”
বৈভবী হাসল, “আচ্ছা, বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে কী সমস্যায় পড়লাম বলো তো?”
বুবকা বলল, “বাড়ি যাও বাড়ি যাও। আমি আসছি। বেশিক্ষণ লাগবে না।”
বৈভবী বলল, “এসো। পাগল কোথাকার!”
১৬
।। তথাগত।।
অফিসের কার পার্কিংয়ের দিকে এগোচ্ছিল এই সময় তথাগতর ফোনটা বেজে উঠল, সে দেখল মা ফোন করছে, ফোনটা তুলল, “বলো মা।”
“তুমি কোথায়? অফিসে এখনও?”
“হ্যাঁ। কেন বলো তো?”
“বেরোবে কখন?”
“এই তো গাড়িতে উঠব। কেন বলো তো?”
“বাড়িতে এসো, কথা আছে।”
“স্টুডিও যাওনি?”
“যাব। তোমার সঙ্গে কথা বলে তারপরে।”
“আচ্ছা। আসছি।”
বাড়ি পৌঁছোতে বেশিক্ষণ লাগল না তার। সেক্টর ফাইভ থেকে তাদের বাড়ি বেশিক্ষণের না। ড্রয়িং রুমে পৌঁছে দেখল মা সোফাতে থমথমে মুখে বসে আছে।
সে বলল, “ফ্রেশ হয়ে নি?”
বাণী মিত্র বললেন, “বসো। আমি কথা বলে বেরোব।”
তথাগত বলল, “এনিথিং সিরিয়াস? প্রীতিকার ব্যাপারে?”
বাণী মিত্র বললেন, “না। বুবকার ব্যাপারে।”
তথাগত সোফায় বসে বলল, “বুবকার ব্যাপারে আমি কী করতে পারি মা? তুমি তো জানোই ও আমার কথা শোনে না কিছুই।”
বাণী মিত্র বললেন, “তুমি ওকে মাঝে মাঝে ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দাও। সে সময়টা তো কিছুটা কথা বলো।”
তথাগত বলল, “দিতাম। রিসেন্টলি সেটাও বন্ধ করে দেওয়ায় খুব অসভ্যতা করেছে। প্রীতিকার ফোন নাম্বার জোগাড় করে আমার নামে উলটোপালটা বলেছে।”
বাণী মিত্র বললেন, “তবু। আমার মনে হয় আমাদের বাড়িতে বুবকা কিছুটা হলেও তোমার কথা শুনতে পারে।”
তথাগত বলল, “ওকে। বলো কী ব্যাপার।”
বাণী বললেন, “বুবকা দীপ্ত রায়ের প্রোডাকশনে সিনেমা করছে।”
তথাগত বলল, “করুক না, কী প্রবলেম তাতে?”
বাণী কয়েক সেকেন্ড তথাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রবলেম কী? যদি সিনেমাটা ছেড়ে দেয় তখন তো এই দীপ্ত রায়ই বলবে আমরা সাবোতাজ করেছি। ওর তো পুরোটাই উইন উইন সিচুয়েশন হয়ে গেল। সিনেমাটা না হলেও ওর লাভ, হলেও ওর লাভ।”
তথাগত কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর বলল, “তুমি কী চাইছ?”
বাণী মিত্র বললেন, “সিনেমাটাতে বৈভবীও আছে।”
তথাগত বলল, “ওহ। ওর জন্যই ও সিনেমাটা করছে তার মানে।”
বাণী মিত্র বললেন, “হ্যাঁ। রেজারেকশন অফ বৈভবী মুখার্জি। বেশ গালভরা ব্যাপারটা।”
তথাগত বলল, “হোক না রেজারেকশন। তাতেও সমস্যা কী?”
বাণী মিত্র এবার রাগলেন, বললেন, “তোমার মাথাটা কি এইসব চাকরি করে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে? বুবকা ওর থেকে একটা বারো বছরের বড়ো মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে, ওর জন্য নিজের কেরিয়র পর্যন্ত নষ্ট করে দিয়েছে, তুমি এখন বলছ সমস্যা কী! যেটুকু সোশ্যাল প্রেস্টিজ ছিল, এর পরে কি সেটাও থাকবে?”
তথাগত বলল, “বুঝেছি। আমাকে কী করতে হবে?”
বাণী মিত্র বললেন, “শেষ চেষ্টা।”
তথাগত হাসল, বলল, “আমার তো বৈভবীকে মার্ডার করা ছাড়া আর কোনও সলিউশন মাথায় আসছে না।”
বাণী মিত্র বললেন, “ওসব ভাববে না। আমিও ভাবি না। ভায়োলেন্স কোনও কিছুর সলিউশন না। এমন কিছু ভাবো যেটা বৈভবীর থেকে বুবকাকে আলাদা করে দেবে।”
তথাগত বলল, “ভাবছি। আপাতত মাথা কাজ করছে না মা। অফিস থেকে ফিরলে আমার মাথা কাজ করে না। কাল ভোরে উঠে ভাবব।”
বাণী মিত্র বললেন, “ভাবো। তবে বেশি ভেবো না। সময় কম। বাই দ্য ওয়ে, প্রীতিকার গয়নাগুলো কেমন লেগেছে কিছু বলল?”
তথাগত বলল, “হ্যাঁ, ভীষণ ভালো লেগেছে। কেন তোমাকে মেসেজ করেনি?”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ করেছে। আচ্ছা আমি তবে এবার উঠি।”
তথাগত বলল, “এই কথাগুলো তো ফোনেও বলা যেত মা।”
বাণী বললেন, “না যেত না। কিছু কিছু কথার আলাদা গুরুত্ব থাকে।”
তথাগত বলল, “আচ্ছা।”
বাণী বেরোলে তথাগত ফোনটা বের করে ইদ্রিশকে ফোন করল। ইদ্রিশ একবার রিং হতেই ফোন তুলে নিল, “বলুন দাদা, কী খবর?”
তথাগত বলল, “আমার একটা ইনফরমেশন চাই ইদ্রিশ। দিতে পারবে?”
ওপাশ থেকে ইদ্রিশের হাসি হাসি গলার স্বর ভেসে এল, “চেষ্টা করব দাদা। বলুন।”
তথাগত বলল, “দীপ্ত রায়ের সিনেমায় বুবকা অভিনয় করছে, বৈভবীর সঙ্গে?”
“হ্যাঁ দাদা, আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল আপনি এই প্রশ্নটা করতে ফোন করবেন।”
তথাগত বলল, “কথাটা সত্যি?”
“হ্যাঁ দাদা। ত্রিকোণ প্রেমের গল্প। সাউথের রিমেক।”
তথাগত থমকাল, “ত্রিকোণ প্রেম? আর-একজন হিরো কে?”
ইদ্রিশ হাসল, “না না, দুজন হিরো না দাদা, একজন হিরো দুজন হিরোইনের সিনেমা। বুবকাদা আর বৈভবী ম্যাডাম ছাড়াও এক নতুন মেয়েকে দীপ্ত রায় ইন্ট্রোডিউস করাচ্ছেন এবং এ ব্যাপারে দীপ্ত রায় ভীষণ সিরিয়াস। মেয়েটা অবশ্য একেবারে নতুন না, সিরিয়াল করেছে দু-একটা। অলকানন্দা নাম। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে মেয়েটা দীপ্ত রায়ের কেপ্ট।”
তথাগত বলল, “আচ্ছা। থ্যাংকস ফর দ্য ইনফরমেশন।”
ফোনটা রেখে মাকে ফোন করল সে। বাণী ফোনটা ধরে বললেন, “বল।”
তথাগত বলল, “মা, বুবকার সিনেমা বন্ধ হলে দীপ্ত রায়ের একেবারে যে উইন উইন সিচুয়েশন তা না। খানিকটা লস হলেও হতে পারে।”
বাণী বললেন, “কীরকম?”
তথাগত বলল, “সিনেমায় বুবকা ছাড়াও আর-একটা মেয়ে আছে, যাকে ইন্ট্রোডিউস করানোর জন্য দীপ্ত রায় ভীষণ ডেসপারেট। সিনেমাটা না হলে দীপ্ত রায়ের খুব একটা লাভ হবে না। বরং ক্ষতিই হবে।”
বাণী বললেন, “মেয়েটার নাম কী অলকানন্দা?”
তথাগত বলল, “ঠিক বলেছ, কী করে বুঝলে?”
বাণী মিত্র ঠান্ডা গলায় বললেন, “দেখেছি আমি ওকে। নাম আর চেহারা আমি সহজে ভুলি না। তোমরা জানো তো!”
