১৩
।। অলকা।।
“তোমায় যে ব্রেকটা দিচ্ছি, সেটা সম্পর্কে তোমার কোনও আইডিয়া আছে?”
এসিটা সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় চলছে। তার ঠান্ডা লাগছিল। তবু অলকা কোনও চাদর গায়ে না জড়িয়ে চুপচাপ দীপ্তর খাটে বসে ছিল।
দীপ্তর প্রশ্নের উত্তরে সে কিছু বলল না।
দীপ্ত বলল, “চুপ করে আছ কেন?”
অলকা বলল, “শুভ কিছু একটা সন্দেহ করছে।”
দীপ্ত অবাক গলায় বলল, “কে শুভ?”
অলকা দীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “শুভকেও ভুলে যাচ্ছ তুমি?”
দীপ্ত কিছুক্ষণ অবাক হয়ে অলকার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ, শিট। হ্যাঁ। তোমার ওই কী যেন বলে, অগ্নি সাক্ষী করে সাত পাক ঘুরে বিয়ে করা বর!”
অলকা বলল, “হুঁ।”
দীপ্ত বলল, “তো কী সন্দেহ করছেন তিনি?”
অলকা বলল, “আজকাল চাকরির আশায় কোন এক নেতার চামচাগিরি করে। ওখানে শুনে এসেছে আমি নাকি খুব তোমার ফ্ল্যাটে আসি।”
দীপ্ত সিগারেট ধরাল, “আস। তো? হোয়াটস দ্য বিগ ডিল?”
অলকা বলল, “তোমার কাছে এগুলো কী মনে হয়? খেলা?”
দীপ্ত বলল, “খেলার কী হল! তুমি তো বাচ্চা নও, তোমার তো নাক টিপলে দুধ বেরোয় না! তোমার কি এখন দুঃখ হচ্ছে নাকি ওই অকর্মার ঢেঁকিটার জন্য? ডিভোর্স দিয়ে দাও। তোমার এখন ব্রাইট ফিউচার। ভুলে গেলে হবে? মালটাকে ছেড়ে দিয়ে এখানে চলে আস। আমরা একসঙ্গে থাকব। সিম্পল।”
দীপ্ত জোরে জোরে সিগারেট টানতে লাগল।
অলকা বলল, “আমি পারব না, আমার বাড়ি থেকে অনেক ঝামেলা হবে।”
দীপ্ত বলল, “দূর বাল! এইজন্য রাস্তা থেকে দেশি কুত্তা তুলে ঘরে আনতে নেই।”
অলকা রাগল না, দীপ্তর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আমাদের বাড়ির ওদিকে যে লোকটা রিকশা চালাত, সে কখনও কখনও মদ খেয়ে এসে এরকম ভাষায় কথা বলে। তুমি যখন বলো, আমি তখন ভাবি খুব একটা পার্থক্য নেই তোমাদের। তুমি শুধু মদ না খেয়েও এই ভাষায় কথা বলতে পারো।”
দীপ্ত বলল, “আমায় এসব কথা বলে লাভ নেই। নাও ইউ ডিসাইড, তুমি কী করতে চাও।”
অলকা বলল, “শুভর একটা চাকরি দরকার।”
দীপ্ত অবাক গলায় বলল, “আমায় এখন ওকে চাকরি দিতে হবে?”
অলকা বলল, “ইনভলভমেন্ট দরকার। একা একা থাকলে অশান্তিটা বাড়বে, কমবে না। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। তুমি নিশ্চয়ই রাস্তার কুকুরকে বাড়ির বউ বানাবে না।”
দীপ্ত সিগারেটটা রেখে অলকাকে জড়িয়ে ধরল, “রাগ হয়েছে?”
অলকা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “না, রাগ হয়নি। তুমিই তো শিখিয়েছ প্রস-দের এসব কথায় রাগ করতে নেই।”
দীপ্ত বলল, “চাকরি আমি কোথা থেকে দেব?”
অলকা বলল, “কিছু না কিছুতে ঢুকিয়ে দাও। কাজ শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে পেরে যাবে।”
কলিং বেল বাজল। দীপ্ত বলল, “কোন শুয়োরের বাচ্চা এল আবার। তুমি বসো, আমি দেখছি।”
দীপ্তও নগ্ন ছিল। একটা স্পোর্টস ট্রাউজার পরে খালি গায়ে দরজা খুলতে গেল।
কয়েক মিনিট পরে বেডরুমে এসে গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি রেডি হয়ে ড্রয়িং রুমে যাও। তোমার বর এসেছে।”
১৪
।। অলকা।।
দীপ্ত অলকাকে কথাটা বলে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এল। শুভ দাঁড়িয়ে ছিল। দীপ্ত বলল, “বসুন, চা খাবেন?”
শুভ বলল, “অলকা কোথায়?”
দীপ্ত বলল, “শ্যুটিংয়ে যাবে তো। তৈরি হচ্ছে।”
শুভ বলল, “তৈরি হয়েই তো বেরোল!”
দীপ্ত হেসে ম্যানেজ করার চেষ্টা করল, “বাড়ির মেকআপ আর শ্যুটের মেকআপ এক হয় না তো, দুটো আলাদা।”
শুভ বলল, “বাকিরা কোথায়?”
দীপ্ত বলল, “বাকিদের হয়ে গেছে। অলকার বাকি। চা খাবেন?”
শুভ বলল, “আমি চা খাই না।”
অলকা বেডরুম থেকে ঠান্ডা গলায় ডাকল, “ওকে পাঠিয়ে দিন।”
দীপ্ত বলল, “আপনাকে ডাকছে।”
শুভ বলল, “আমাকে?”
দীপ্ত বলল, “হ্যাঁ, যান। সোজা গিয়ে ডানদিকে।”
শুভ উঠল। কোনও দিকে না তাকিয়ে দীপ্তর বেডরুমে গিয়ে ঢুকল। দীপ্তর বেডরুমটা বিরাট। একদিকে কাচের জানলা। বড়ো খাটের একদিকে ওয়ার্ডরোব। খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিল। বেডরুমে তখনও খাটের ওপর চাদর ইতস্তত ছড়ানো, অ্যাশট্রেতে দীপ্তর ফেলে যাওয়া সিগারেট পড়ে আছে। শুভ হাঁ করে সব দেখছিল। অলকা শাড়ি পরছিল। বলল, “কুঁচিটা ধরো তো।”
শুভ হাঁটু গেড়ে বসল। অলকা বলল, “এখানে এলে কেন?”
শুভ বলল, “পাঁজাদা ফোন করে বলল, তুমি এখানে আছ। কী মনে হল। চলে এলাম।”
অলকা বলল, “পাঁজাদা কে? তোমার দাদার চামচাদের একজন?”
শুভ বলল, “হ্যাঁ।”
অলকা বলল, “যে কেউ তোমাকে ফোন করবে আর তুমি সেখানে চলে যাবে?”
শুভ বলল, “কত বড়ো ফ্ল্যাট না?”
অলকা বলল, “উত্তরটা দাও আগে।”
শুভ বলল, “কত টাকা দাম হবে ফ্ল্যাটটার?”
অলকা বলল, “তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি শুভ।”
শুভ বসে অলকার শাড়ির কুঁচি ধরছিল। ওখান থেকে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে অলকার গলাটা টিপে ধরে বলল, “হ্যাঁ রে খানকি মাগি, আমাকে কী ভেবেছিস, তুই যেখানে সেখানে লাগিয়ে বেড়াবি, আমি তোর ব্রা প্যান্টি ধুয়ে বেড়াব?”
শুভর আচমকা হানায় অলকার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল, ও দুহাত দিয়ে কোনওমতে শুভকে ধাক্কা দিয়েই দীপ্তকে ডাকতে শুরু করল। শুভ অলকার ধাক্কায় একটু বেসামাল হয়ে গেছিল। এবার তীব্র রাগে অলকাকে জোরে একটা থাপ্পড় কষিয়ে চ্যাঁচ্যাতে লাগল, “তোর সাহস কত, হ্যাঁ? দীপ্ত রায়ের বেডরুমে ডেকে অওকাত দেখাতে চাইছিস? কুকুরের মতো রাস্তায় রাস্তায় শুয়ে বেরিয়ে আমার ঘরে আসবি রোজ, তোর টাকায় আমি মুতি, বুঝেছিস, মুতি?”
দীপ্ত দৌড়ে চলে এসেছিল, সে পরিস্থিতিটা আঁচ করে নিয়ে শুভকে বলল, “বেরিয়ে যান। জাস্ট গেট আউট।”
শুভ দীপ্তর মতো লম্বা চওড়া না, তবু দীপ্তর দিকে তেড়ে এল। দীপ্ত শুভর পেটে জোরে একটা লাথি কষাল। শুভ মেঝেতে শুয়ে কাতরাতে লাগল।
দীপ্ত শুভর কলার ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে বের করে দিয়ে দরজা লক করে ঘরে ফিরে এল।
অলকা মেঝেতে বসে পড়েছে। শাড়ি অবিন্যস্ত। চোখগুলি বিস্ফারিত।
দীপ্ত অলকাকে ধরে তুলে খাটে বসাতে বসাতে আশ্বস্ত করতে চাইল, “চিন্তা কোরো না, আমি আছি তো।”
অলকা বলল, “ও আমাকে কত কিছু বলে গেল।”
দীপ্ত অলকাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “কিচ্ছু হয়নি সোনা, আমি তো আছি।”
অলকা বলল, “ও আজকের আগে কোনও দিন আমার গায়ে হাত দেয়নি। ও যে কথাগুলো বলল, কোনও দিন আমি ভাবতেও পারিনি এই কথাগুলো ও আমাকে বলতে পারে।”
দীপ্ত বলল, “আমি তো এটাই চেয়েছিলাম অলকা। যা হয়েছে, ভালো হয়েছে। তুমি ভেঙে পড়ছ কেন?”
অলকা বলল, “আমি তো এটা চাইনি। আমি তো দিনের শেষে ওর কাছেই ফিরে যাচ্ছিলাম। ও কি এখনও বাইরে আছে?”
দীপ্ত অলকাকে ধরে ছিল এতক্ষণ। এবার ছেড়ে দিয়ে বলল, “জানি না।”
অলকা কোনওমতে শাড়িটা ঠিক করতে করতে উঠল। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে আবার খাটে এসে বসে বলল, “চলে গেছে।”
দীপ্ত একটা সিগারেট ধরাল, “তুমি চিন্তা কোরো না, আমি সব সামলে নিচ্ছি। ও কোন নেতার চামচাগিরি করে না, সেখান থেকেও লাথি খাবে ও। তুমি শান্ত হও।”
অলকা দীপ্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মা, বাবা, পাড়ার লোক, এদের কী বলব?”
দীপ্ত বলল, “সব কিছু আমি বলে দেব তোমায়। কাকে কী বলতে হবে। এসব নিয়ে ভেবো না এখন। কেরিয়রে কনসেনট্রেট করো। খোলা মাঠ তোমার সামনে অলকা, তোমার সিনেমা আসছে, মানুষ তোমার অভিনয় দেখবে, আজ নাহয় কাল তোমার ইন্টারভিউ বেরোবে বড়ো বড়ো পত্রিকায়, তখন কোথাকার কোন রাস্তার কুকুর শুভ, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখবে তোমার সাকসেস। এইসব দিন মনে রাখতে নেই সোনা, বিশ্বাস করো। আমায় বিশ্বাস করো।”
দীপ্ত অলকাকে জড়িয়ে ধরল।
অলকা অস্ফুটে বলতে লাগল, “আমাকে ও মারতে এসেছিল।”
