১২
সকালে ঘুম ভাঙার পর ডাইনিং টেবিলে এসে বাণী দেখলেন বুবকা একা একা ব্রেকফাস্ট করছে। বুবকার সামনে বসলেন।
বললেন, “কোথায় থাকো তুমি?”
বুবকা মার দিকে তাকাল একবার। তারপর আবার খাবারে মনোযোগ দিয়ে বলল, “কাজ থাকে।”
বাণী বললেন, “কী কাজ থাকে?”
বুবকা বলল, “এই তো, শ্যুট শুরু হবে। কী যেন নাম সিনেমাটার! ওহ, এখনও তো সিনেমার নাম ঠিক হয়নি। হলে বলব তোমায়।”
বাণী বললেন, “কার সিনেমা?”
বুবকা বলল, “ওই তো দীপ্ত রায় প্রোডাকশনের। ডিরেক্টর অরিত্র মুখার্জি।”
“স্ক্রিপ্ট পড়েছ?”
বুবকা বাণীর দিকে তাকাল, “স্ক্রিপ্ট পড়ে কী হবে? কাজ দেয় না কেউ, পেলাম, এই অনেক।”
বাণী বললেন, “কাজ দেয় না, না মাঝপথে তুমি পালিয়ে যাও?”
বুবকা বলল, “আমার টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস আছে কিছু। তোমাদের ওখানে অনেক জ্যাঠামশাই। আমার পোষায় না।”
রান্নার মেয়েটা চলে এসেছিল। বাণী তাকে ইশারায় রান্নাঘরে যেতে বললেন। বুবকার দিকে তাকালেন, “তুমি স্ক্রিপ্ট না পড়ে কাজ করছ, এটাও তোমার টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে ছিল?”
বুবকা বলল, “অরিত্র মুখার্জি তো বড়ো ডিরেক্টর। ও খারাপ বানায় নাকি?”
“তোমার সামনে অনেক সুযোগ ছিল বুবকা, উলটোপালটা সিনেমায় অভিনয় না করলেই পারতে।”
“তো কী করব? প্যানপ্যানানি সিরিয়ালে অ্যাক্টিং করে যাব? কোনও চ্যালেঞ্জ আছে ওতে?”
“ওতে চ্যালেঞ্জ আছে নাকি জানি না, তবে এই খাবারটা ওই প্যানপ্যানানি সিরিয়াল থেকেই আসে এটা মাথায় রেখো।”
বুবকা একটু থমকাল। তারপর আবার খাওয়া শুরু করল, “সিরিয়ালে সমস্যা না। তোমার হাউসের ওই জ্যাঠামশাইগুলো আমাকে মানে না।”
“বিকজ দে আর ইওর সিনিয়রস। অ্যান্ড দে ডিজার্ভ ইওর রেসপেক্ট। তুমি কী মনে করো? আমি একা একা ভেলভেট পিকচারস তৈরি করেছি? ওরা সবাই না থাকলে আমরা এ জায়গায় কোনও দিন আসতে পারতাম না।”
“জানি তো। সেজন্যই তো চুপচাপ সরে পড়েছি।”
“সেটা একমাত্র কারণ?”
“না, সেটা একমাত্র কারণ কেন হতে যাবে? বৈভবীও কারণ। তুমি বৈভবীকে সহ্য করতে পারো না, তুমি ওকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে দিয়েছ। আমি কেন সেখানে থাকতে যাব যেখানে বৈভবী ব্ল্যাকলিস্টেড?”
বাণী বুবকার দিকে তাকালেন। ছেলেটা সরাসরি কথা বলে চিরকালই। বৈভবীর কথাটাও কেমন অনায়াসে বলে দিল।
বুবকার খাওয়া হয়ে গেছিল। কথাটা বলে শক্ত চোখ মুখ করে বাণীর দিকে তাকিয়ে থাকল।
বাণী বললেন, “বৈভবী তোমার থেকে ঠিক কত বছরের বড়ো জানো?”
বুবকা বলল, “হবে বারো তেরো।”
বাণী বললেন, “এই ডিফারেন্সটা তোমার নর্মাল মনে হয়?”
বুবকা বলল, “কেন? ও ছেলে আর আমি মেয়ে হলে তো তোমাদের কাছে ডিফারেন্সটা নর্মালই মনে হত!”
বাণী বললেন, “তোমার নর্মাল মনে হয়?”
“অফকোর্স মনে হয়।”
“তুমি যে সিনেমাটা করছ অরিত্রর,ওখানে নিশ্চয়ই ওরা বৈভবীকেও কাস্ট করেছে?”
বুবকা কিছুক্ষণ মার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী করে জানলে?”
বাণী বললেন “গেস করলাম। করেছে?”
বুবকা বলল, “হ্যাঁ করেছে।”
বাণী বললেন “তোমার হিরোইন?”
বুবকা বলল, “না, হিরোইন না, অলকা না কাকে একজন হিরোইন করছে দীপ্ত রায়।”
“বৈভবীকে কেন হিরোইন করছে না? কেন ওর কাছে তোমাদের সম্পর্কটা নর্মাল লাগছে না?”
বুবকা টেবিল থেকে উঠে পড়ল, “তুমি এসব যুক্তি দিয়ে বৈভবীর সঙ্গে আমার ব্রেক আপ করাতে চাইছ।”
বাণী হাসলেন, “তোমাকে কোনও দিন কোনও কিছুতে বাধা দিয়েছি? যা ইচ্ছা তাই তো করে বেড়াচ্ছ? একবারও বলেছি এটা আমার পছন্দ না?”
বুবকা বলল, “না বললেও বোঝা যায়।”
বাণী বললেন, “অ্যাডভান্স নিয়েছ দীপ্তর থেকে?”
বুবকা বলল, “নিইনি।”
বাণী বললেন, “তোমাকে যদি বলি তোমাকে আর বৈভবীকে নিয়ে সিনেমা করব আমরা, তুমি দীপ্তকে না করে দেবে?”
বুবকা খানিকক্ষণ মার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “ট্র্যাপ! তাই তো?”
বাণী গম্ভীর হলেন, “তুমি ভুলে যাচ্ছ বুবকা তুমি আমার ছেলে, কেন ট্র্যাপ দিতে হবে?”
বুবকা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “তুমি যখন আমায় তুমি তুমি করে বলো তখন তুমি আমার ওপর রেগে থাকো। এখন তো রেগে রেগেই কথাগুলো বলছ। এই কথাটাও সেভাবেই বলছ নিশ্চয়ই।”
বাণী বললেন, “তোমাকে আমার বোধহয় আর কোনোদিনও তুই করে বলা হবে না। যাই হোক, যেটা বললাম সেটার উত্তর দাও।”
বুবকা বলল, “আমি এই কাজটা একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। তা ছাড়া সবসময় নিজের হাউসে কাজ করাটার মধ্যে কোনও চ্যালেঞ্জ নেই। আমি এখন এই কাজটা সিরিয়াসলি করতে চাই।”
বাণী বললেন, “তুমি যদি সিরিয়াসলি কাজটা করতে তাহলে আমার থেকে খুশি আর কেউ হত না। কিন্তু তুমি সেটা করবে না। তুমি ঠিক সিনেমাটার মাঝবরাবর গিয়ে নতুন কোনও সমস্যা তৈরি করবে। নামটা আমার খারাপ হবে।”
বুবকা বলল, “তোমার কেন খারাপ হবে?”
বাণী বললেন, “সেটা তোমার বোঝার ক্ষমতা থাকলে এখানে সেখানে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াতে না।”
বুবকা কাঁধ ঝাঁকাল, “গ্রেট। আচ্ছা বাই।”
বলে বাণীর উত্তরের অপেক্ষা না করে বুবকা বেরিয়ে গেল। বাণী কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে থেকে দীপ্তকে ফোন করলেন। ফোনটা বেজে গেল, দীপ্ত ফোন তুলল না।
