১০
।। বাণী মিত্র ।।
বাণী মিত্র অফিস থেকে বেরোলেন যখন তখন রাত তিনটে বাজে। শ্যুটিং শেষ হতে দেরি হয়ে গেছে। বাণী গাড়িতে উঠে রাঘবকে বললেন, “ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”
রাঘব বলল, “হ্যাঁ ম্যাডাম।”
বাণী বললেন, “মুখ ধুয়ে নাও।”
রাঘব গাড়ি থেকে জলের বোতল নিয়ে মুখ ধুয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। বাণী মিত্রের ফোনটা বেজে উঠল, বাণী দেখলেন শম্পা ফোন করছে, বিরক্ত হলেন, তবু ধরলেন, “বল শম্পা।”
শম্পা তাঁর সিরিয়ালের বয়স্কা অভিনেত্রী, তাঁরই বয়সি। একটু আগেই শ্যুটিং শেষে বাড়ি রওনা হয়েছেন, প্রতিদিনই রাতের দিকে স্টুডিও পাড়ার গসিপগুলো করার জন্য বাণীকে ফোন করেন। বাণীর গসিপ পছন্দ না, কিন্তু শম্পার সঙ্গে অনেক দিনের সম্পর্ক, স্ট্রাগলের সময়টা শম্পা অনেক সাহায্য করত, তাই বাণী শম্পার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে পারেন না।
“এই বাণী, আজ তো তোকে আসল কথাটাই বলা হয়নি।”
বাণী দীর্ঘশ্বাস চাপতে চাপতে বললেন, “কী হল আবার?”
শম্পা উত্তেজিত গলায় বললেন, “আমাদের রীতিশা রে, এখন কার সঙ্গে ঝুলেছে শুনেছিস?”
বাণী বললেন, “হ্যাঁ, জানি তো, অরিত্রর সঙ্গে। আজ শুনলাম তো।”
শম্পা বললেন, “বোঝ, অরিত্র তো রীতিশার বাপের বয়সি হবে!”
বাণী বিরক্ত গলায় বললেন, “অরিত্রর সিনেমা এখন আর কেউ দ্যাখে না শম্পা। ও প্রথম প্রথম দু-তিনটে সিনেমা ভালো করেছিল। ইদানীং ভীষণ খারাপ সিনেমা বানাচ্ছে। ওর রিসেন্ট সিনেমাটা দেখতে গেছিলাম আমি আর তথা। হাফটাইমের বেশি টিকতে পারিনি। এখন এইসব নিউজ করিয়ে যদি খবরে আসতে পারে আসুক না।”
শম্পা বললেন, “রীতিশার জন্য খারাপ লাগে। ট্যালেন্টেড ছিল। এসব করে কেরিয়রটা শেষ করছে।”
বাণী বললেন, “কী আর করবি। যার পাঁঠা যে যেদিক দিয়ে খুশি কাটুক।”
শম্পা বললেন, “আচ্ছা, আজ একটা খবর শুনলাম।”
বাণী বিরক্তি চেপে রাখতে পারলেন না, “আবার কী?”
শম্পা ফিসফিস করে বললেন, “বুবকা দীপ্ত রায়ের সঙ্গে কোনও সিনেমা করছে নাকি?”
বাণী অবাক হলেন, সকালে দীপ্ত কথাটা একবার বলেছিল না? এটা গসিপ হয়ে বাজারে রটল কী করে? তিনি বললেন, “কে বলেছে তোকে এটা?”
শম্পা বললেন, “আজ শ্যুটের সময়ই শুনলাম তো! কে যেন বলল একটা!”
বাণী মনে করার চেষ্টা করলেন দীপ্তর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন প্রীতিকা ছাড়া আর কেউ ছিল নাকি। মনে করতে পারলেন না। বললেন, “একটু মনে করে বল কে বলেছে।”
শম্পা বললেন, “সম্ভবত পিউপা। দীপ্তর স্টুডিওর শ্যুট শেষ করে এসেছিল আজ। ওখানেই শুনেছে মে বি।”
বাণী বললেন, “কাল পিউপাকে ধরব তো! এসব রাবিশ খবর কেন রটাচ্ছে!”
শম্পা প্রমাদ গুনলেন, “তুই এখনই রিঅ্যাক্ট করিস না, আমি একটু ভেবে তোকে কাল জানাব।”
বাণী বললেন, “আর কিছু বলেছে?”
শম্পা বললেন, “হ্যাঁ। সম্ভবত বৈভবীও থাকবে।”
বাণী বললেন, “ওহ। ঠিক আছে, আমি তো জানতেই পারব। আচ্ছা আমি এখন রাখছি রে। টায়ার্ড লাগছে।”
শম্পার উত্তরের অপেক্ষা না করে বাণী ফোনটা কেটে দিলেন। গাড়ি ই এম বাইপাস ধরেছে। রাস্তায় দু-একটা গাড়ি দেখা যাচ্ছে।
বাণী বললেন, “জল আছে রাঘব?”
রাঘব বাণীর জলের বোতলটা দিল। বাণী জল খেলেন। কয়েকদিন আগে তথাগত ফেসবুক করা শিখিয়েছে। বাণী অতটা মোবাইলের সঙ্গে সড়োগড়ো নন। কারও মেসেজের রিপ্লাই করেন না। চুপচাপ সব কিছু দেখে আবার ফোন রেখে দেন।
তথাগত আর প্রীতিকা ডিনার করতে গেছিল। কয়েকটা ছবি আপলোড করেছে প্রীতিকা। সেগুলো দেখলেন। মেসেঞ্জারে অনেকের মেসেজ এসেছে। অনেকেই একটা সুযোগের জন্য একের পর এক মেসেজ করে যায়। সবাই এখন শর্টকাট খোঁজে। আগে যে কাজটা স্টুডিওতে স্টুডিওতে ঘুরে ঘেমে নেয়ে পাওয়া যেত না, আজকাল এরা ভাবে একটা মেসেজ করেই পাওয়া যাবে। তথাগতকে বলার পরে ব্লক করা শিখিয়ে দিয়েছিল।
কয়েকজনকে ব্লক করলেন। সাজেস্টেড ফ্রেন্ডে বুবকার প্রোফাইল দেখাচ্ছে। বুবকা তাঁর ফ্রেন্ড লিস্টে নেই।
বুবকার প্রোফাইলটা খুললেন। উলটোপালটা আপডেটে ভর্তি। বাণীর সেগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল আর জি করের দিনটার কথা। এই তো সেদিন হবে। একদিন বয়সেই কী চিৎকার! সেই ছেলেটা কত বড়ো হয়ে গেল! কবে থেকে হাতের বাইরে চলে গেল বুবকা? যেদিন থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর স্ট্রাগল শুরু সেদিন থেকেই? সময় দিতে পারতেন না। বুবকার ধারণা, বাণী সবসময় তথাগতকে প্রেফার করেন।
বুবকার কভার ফটোটার দিকে চোখ পড়ল বাণীর। বৈভবীর সঙ্গে হাসি হাসি মুখে সেলফি তুলেছে। বেশ খানিকক্ষণ ফটোটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি।
এতক্ষণ মনটা নস্টালজিক হয়ে পড়ছিল।
ছবিটা আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনল বাণী মিত্রকে।
১১
।। অলকা।।
“একটা কথা বলব খচে যাবে না তো? মানে একটা জিনিস শুনলাম আর কি!”
অলকা তৈরি হচ্ছিল। শুভর কথায় বলল, “সেসব শোনা ছাড়া তোমার তো কোনও কাজও নেই এখন। কী শুনলে বলো?”
শুভর মুখটা ছোটো হয়ে গেছিল। বলল, “তোমার আর ওই দীপ্ত রায়ের ব্যাপারে। তুমি নাকি আজকাল খুব দীপ্ত রায়ের ফ্ল্যাটে যাও?”
অলকা লিপস্টিক মাখতে মাখতে বলল, “কোন শুয়োরের বাচ্চা এসব রটাচ্ছে?”
শুভ বলল, “দাদার ওখানে। একজন ঠাট্টা করে বলল। সবাই খুব হাসাহাসিও করল আমায় নিয়ে।”
অলকা বলল, “রাস্তা ঘাটে আল বাল ছাল লোক তোমার বউয়ের সম্পর্কে উলটোপালটা বলে দেবে, সেগুলো তুমি শুনে এসে ঘরে রিলে করবে?”
শুভ বলল, “আমি কী করব? আমাকে যদি এসব বলে তো?”
অলকা বলল, “প্রতিবাদ করবে! নইলে দাদার ওখানে যাওয়া ছেড়ে দেবে।”
শুভ বলল, “চাকরিটা হয়ে যাবে যে, নইলে কবে ছেড়ে দিতাম।”
অলকা বলল, “তোমার এ জন্মে চাকরি হবে না। দেখি, শাড়ির কুঁচিটা ধরো।”
শুভ উঠে অলকার শাড়ির কুঁচি ধরল। অলকা শাড়িটা ঠিক করতে করতে বলল, “তার চেয়ে স্টুডিও যেতে পারো। কিছু না কিছু কাজ থেকেই যায়।”
শুভ বলল, “আমি তো ইউনিয়নের মেম্বার না। আমাকে ওখানে কাজে নেবে কেন?”
অলকা বলল, “তাহলে এত দাদা দাদা করো কেন? দাদার দলই তো ওখানে আছে! ম্যানেজ করতে পারছ না?”
শুভ বলল, “ও হয় না। আমি ঠিক বলতে পারি না।”
অলকা বলল, “আমি কথা বলছি আজ স্টুডিওতে গিয়ে।”
শুভ বলল, “ব্যাপারটা ভালো দেখাবে? তুমি একটা যাকে বলে স্টার আর আমি ছোটোখাটো কাজ করব?”
অলকা বলল, “তাহলে কোরো না। দাদার চামচাদের কাছে বউয়ের সম্পর্কে আজেবাজে কথা শুনে কান ভর্তি করো।”
শুভ বলল, “তুমি রেগে যাও কেন বলো তো? আমি কি এসব কথায় কিছু মনে করি?”
অলকা বলল, “কে জানে তুমি কী মনে করো। কে দেখতে যাচ্ছে। আজ আবার কোথাও যাবার প্ল্যান করছ নাকি?”
শুভ বলল, “হ্যাঁ, আজ নৈহাটি যেতে পারি। তবে বিকেলের দিকে। তোমার এই কানের দুলটা দেখিনি তো আগে, দারুণ কিন্তু। ইমিটেশন নাকি?”
অলকা সতর্ক হল, “না বোধহয়, শ্যুটিংয়ে পরেছিলাম, খুলতে ভুলে গেছি।”
শুভ বলল, “ধুস! শ্যুটিংয়ের দুল পরা যায় নাকি? ওরা খুলে নেয় না?”
অলকা বলল, “আমি সিনিয়র তো এখন। অতটা কড়াকড়ি থাকে না।”
শুভ বলল, “তুমি তো সেই দিন শুরু করলে গো। তুমি আবার সিনিয়র হলে কবে?”
অলকা বিরক্ত গলায় বলল, “ফালতু পেঁচিও না তো। ফালতু প্যাঁচানো ভালো লাগে না। বললাম তো, প্রোডাকশনের জিনিস, খুলে আসব আজ।”
শুভ আর কিছু বলল না।
অলকা তৈরি হয়ে গেছিল। শুভ বলল, “আজ তো আমার বিকেলে নৈহাটি আছে, এখন বরং তোমার সঙ্গেই যাই।”
অলকা বলল, “কোথায় যাবে?”
শুভ বলল, “কেন স্টুডিও। দেখে আসি। তুমি যদি কিছু ম্যানেজ করতে পারো আজ থেকেই কাজ শুরু করে দিতে পারব।”
অলকা বলল, “কথা তো বলি আগে। কাল পরশু করে নিয়ে যাব তোমায়।”
শুভ বলল, “কেন, আজ গেলে কী হবে?”
অলকা বিরক্ত হল, “যত দিন যাচ্ছে একটা ঘট তৈরি হচ্ছ। বললাম না আজ গিয়ে কোনও লাভ নেই!”
শুভকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অলকা গাড়িতে গিয়ে উঠল।
শুভর মুখটা কেমন ছোটো হয়ে গেছে।
অলকার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
