৮
।। তথাগত।।
“তোমার মা আজ একগাদা গয়না কিনে দিলেন”, প্রীতিকা স্কচে চুমুক দিতে দিতে বলল।
এক রেস্তোরাঁয় ডিনার করতে এসেছে তারা।
তথাগত বলল, “ভালো তো। বাণী মিত্রর বউমা হচ্ছ। তোমারই তো মার্কেট এখন।”
প্রীতিকা বলল, “তোমার প্রেজেন্টেশন কেমন ছিল আজ?”
তথাগত প্রীতিকার প্লেটটা দেখে মুখটা বিকৃত করল, “এইসব ডিশ খাও কী করে তুমি? এত ডায়েট করে কী হবে?”
প্রীতিকা বলল, “তুমিও খাও। স্পাইসি ফুড অ্যাভয়েড করো। গুড ফর ইউ।”
তথাগত বলল, “ধুস,একটু মশলা না হলে ভালো লাগে নাকি কিছু?”
প্রীতিকা বলল, “তুমি সাবকনশাসে বুবকাকে হিংসা করো না?”
তথাগত অবাক হল, “এর মধ্যে বুবকা এল কোত্থেকে?”
প্রীতিকা বলল, “আমি ভাবছিলাম। এই যে তোমার ঘড়ি ধরে চলা কর্পোরেট লাইফ, কোনও অ্যাডেড স্পাইস নেই, একটা ঠিকঠাক সংসারী মেয়েকে বিয়ে করবে, অফিস করবে, বাড়ি ফিরবে, এসব তুমি ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারো না, না?”
তথাগত বলল, “আমার ঠিক কোন ব্যাপারটা দেখে তুমি এই কনক্লুশনে এলে, কাইন্ডলি একটু বলবে?”
প্রীতিকা হাসল, “জানি না, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়। তুমি আর তোমার বাবা খুব ম্যাড়ম্যাড়ে লাইফ লিড করো।”
তথাগত বলল, “বুবকার লাইফ তোমার কোন দিক থেকে ঈর্ষণীয় মনে হয়? এমন কোনও নেশা নেই যেটা ও করে না, একদিন পর পর হয় বাবার কাছে নয় আমার কাছে হাতে পায়ে ধরে টাকা নিয়ে যায়, একটা হোরের সঙ্গে শোয়, সিরিয়াসলি! তোমার কী দেখে মনে হয় আমি ওকে হিংসা করি?”
প্রীতিকা বলল, “অনেক দিক আছে। ওর আনপ্রেডিক্টেবল লাইফস্টাইলটাই তো তুমি হিংসা করো। করো না?”
তথাগতর চোয়াল শক্ত হল, “না, করি না। ইন ফ্যাক্ট আমি আজকাল অন্য কিছু নিয়ে ভাবি।”
প্রীতিকা বলল, “কী ভাবো?”
তথাগত বলল, “আজকাল আমি চাকরি ছেড়ে দেবার কথা ভাবি।”
প্রীতিকা বলল, “সত্যি?”
তথাগত বলল, “হ্যাঁ, সত্যি। আজকাল মা বড়ো একা হয়ে যাচ্ছে। খুব স্ট্রেস যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি। কম স্ট্রাগল তো করেনি। এবার মার পাশে দাঁড়াতে হবে।”
প্রীতিকা বলল, “তোমার মাকে বলেছ?”
তথাগত বলল, “ইন ফ্যাক্ট মা-ই আমাকে অন্যভাবে কথাটা বলার চেষ্টা করেছে। আমি বুঝি সেটা।”
প্রীতিকা বলল, “আমি আর-একটা স্কচ নেব।”
তথাগত বলল, “বাড়ি যাবে না নাকি?”
প্রীতিকা বলল, “কিছু হবে না। ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।”
তথাগত বলল, “না, আর খেতে হবে না।”
প্রীতিকা বলল, “তুমি চাকরি ছেড়ো না।”
তথাগত বলল, “মানে?”
প্রীতিকা হাসল, “তোমার দ্বারা হবে না। তুমি ঝুঁকি নিতে পারবে না।”
তথাগত বলল, “স্কচ খেতে দিচ্ছি না দেখে তুমি এই কনক্লুশনে চলে এলে?”
প্রীতিকা বলল, “ঠিক তা না। এটা বোঝা যায়।”
তথাগত বলল, “আর কী কী বুঝতে পারো?”
প্রীতিকা বলল, “বাদ দাও। আচ্ছা, আজ বুবকাকে কোনও টাকা দেওয়ার কথা ছিল তোমার? তারপর দাওনি?”
তথাগত অবাক হয়ে বলল, “কে বলল তোমায়?”
প্রীতিকা বলল, “বুবকাই বলেছে।”
তথাগত বলল, “বুবকা তোমার নম্বর পেল কোত্থেকে?”
প্রীতিকা কাঁধ ঝাঁকাল, “তার আমি কী জানি? তোমার থেকেই পেয়েছে হয়তো!”
তথাগত বলল, “আমি তো ওকে কোনও নম্বর দিইনি! শিট! আমার মোবাইলে এরপর থেকে পাসওয়ার্ড দিতে হবে।”
প্রীতিকা বলল, “কেন টাকা দাওনি ওকে? বাসে ট্রাভেল করতে হয়েছে নাকি?”
তথাগত রাগে ফুঁসছিল। বলল, “আমার টাকাটা বেশি হয়ে যায়নি প্রীতিকা। মনে রেখো, আমি মার থেকে একটা টাকাও নিই না। ওর ফান্ডিং আমি করতে পারব না।”
প্রীতিকা বলল, “তুমি প্রথমে বলেছিলে দেবে?”
তথাগত বলল, “হ্যাঁ। তারপরেই মনে হল টাকাটা আবার কোথাও মদ খেয়ে উড়িয়ে দেবে। তখনই ঠিক করি টাকাটা দেব না।”
প্রীতিকা বলল, “তোমাকে দেখে তো এতটা টাফ মনে হয়নি। দিস ইজ গুড। এবার মনে হচ্ছে তুমি প্রোডাকশন হাউসে খুব একটা মিসফিট হবে না।”
তথাগতর রাগ পড়েনি তখনও, “আমি তো ভাবতেই পারছি না ও তোমাকে ফোন করে দেবে। দিস ইজ টু মাচ ইয়ার। টু মাচ। এবার বাড়িতে কথা বলতে হবে।”
প্রীতিকা একটু থেমে বলল, “আরও একটা কথা বলল, জানতাম না সেটা।”
তথাগত বলল, “কী?”
প্রীতিকা বলল, “ইউ অ্যান্ড বৈভবী! ওয়ান্স আপন আ টাইম। রিয়েলি?”
তথাগত আগুন চোখে প্রীতিকার দিকে তাকিয়ে রইল।
৯
।। বুবকা।।
“গুরু, মুরগির গলার যে চর্বিটা থাকে, ওটা ঝাল ঝাল করে রেঁধে বাংলা দিয়ে খেয়েছ কখনও?”
জয়েন্টটা বানাতে বানাতে পিকলু বলল কথাটা।
বুবকা বলল, “যা পারিস খাওয়া। নেশাটা হয় যেন। কী বালের জয়েন্ট বানালি, কিছুই হচ্ছে না!”
পিকলু খিক খিক করে হেসে বলল, “তুমি গুরু নীলকণ্ঠ হয়ে গেছ। তোমার আর কোনও নেশাতেই কিছু হবে না।”
বুবকা বলল, “তাহলে সে জিনিস বানা যে জিনিসে কিছু হবে! সকাল থেকে বহুত ঝাঁট জ্বলে আছে ভাই। ভালো কিছু দে।” পিকলু জয়েন্টটা বানিয়ে বুবকার হাতে দিয়ে বলল, “তুমি একটু ওয়েট করো বস। বাংলাটা নিয়ে আসি। শেফালি, তাড়াতাড়ি করো না।”
শেফালি ঝামটা দিল, “তুমিই রান্না করো তাহলে।”
শেফালি পিকলুর বউ। একটা ঝাল ঝাল মাংসের গন্ধ ম ম করছে পিকলুর বস্তির বাড়িতে। ঘরটা অবশ্য ছোটো হলেও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পিকলুর সঙ্গে বুবকার কীভাবে আলাপ হয়েছিল সেটা বুবকাও ভুলে গেছে, তবে মাঝে মাঝে খুব মেজাজ খিঁচড়ে থাকলে আর পকেটে কম টাকা থাকলে বুবকা পিকলুর কাছে চলে আসে। খুব কম পুঁজিতে নেশাটা তুঙ্গে তুলে দিতে পিকলুর জুড়ি মেলা ভার।
জয়েন্টটা টানতে টানতে টিভি দেখছিল বুবকা। শেফালি সিরিয়াল চালিয়ে রান্না করছে। ওর শব্দ শুনলেই সিরিয়াল দেখা হয়ে যায়। বুবকা বলল, “ওই বউদি, অন্য চ্যানেল দাও না।”
শেফালি রান্নাঘর থেকে কড়া গলায় বলল, “তাহলে কিন্তু রান্না করব না আর।”
বুবকা বলল, “আচ্ছা আচ্ছা। করো করো। কী যে দ্যাখো এগুলো! ওই যে মেয়েটা দেখছ না সতী সাবিত্রী সেজে বেড়াচ্ছে, সামনে দেখলে দৌড়ে পালাতে!”
শেফালি বলল, “আমার ও দেখে কী হবে? সময় তো কেটে যায় এটা দেখে দেখে।”
বুবকা বলল, “হ্যাঁ, ওইজন্যই তো তোমাদের টুপি পরিয়ে সব বড়োলোক হয়ে গেল।”
ফোনটা বাজছিল। বুবকা ফোন ধরল, “কে বে? আমার যুধিষ্ঠির দাদাটা নাকি?”
তথাগত থমথমে গলায় বলল, “কী বলেছিস তুই প্রীতিকাকে?”
বুবকা বলল, “এখন কটা বাজে?”
তথাগত বলল, “কেন, ঘড়ি নেই?”
বুবকা বলল, “বল না।”
তথাগত বলল, “সাড়ে নটা। কেন?”
বুবকা বলল, “সত্যি মাইরি। কপাল করে একটা বউ পেয়েছিস বটে। সারাদিন কেটে গেল, তোকে এখন বলল? উফ… তোর বউকেই সতী সাবিত্রীর পার্টে নিতে বলব এবার মাকে।”
তথাগত বলল, “ফালতু কথা বন্ধ কর বুবকা। এইসব কী বলেছিস তুই প্রীতিকাকে? আমার সঙ্গে বৈভবীর রিলেশন ছিল?”
বুবকা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, “কেন, ছিল না?”
তথাগত বলল, “কবে ছিল গান্ডু?”
বুবকা হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, “এই যে, এই যে, ভালো ছেলের মুখ দিয়ে খিস্তি বেরিয়ে গেছে। শোন শোন দাদা, তুই সকালে আমাকে মুরগি করলি। তোর জন্য আমাকে বাসে বাসে ঘুরতে হল। আমিও হালকা করে তোকে টেনশন দিলাম। স্কোর ১-১। ঠিক আছে না? কী বলিস?”
তথাগত বলল, “তুই ইমিডিয়েটলি প্রীতিকার সঙ্গে কথা বল। ওকে বল তুই ইয়ার্কি মেরেছিস।”
বুবকা বলল, “বলব তো। নিশ্চয়ই বলব। দাদার সংসার ভালো থাকবে, কে না চায় বল? আইএমপিএস-টা করে দে, এখনই বলে দিচ্ছি।”
তথাগত বলল, “শোন, তোকে কিছু বলতে হবে না। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, আমার থেকে কোনও দিন তুই একটা টাকাও পাবি না। মাথায় রাখিস এটা।”
পিকলু এসে গেছিল। সঙ্গে মাংসের চাটও। বুবকা সেদিকে তাকিয়ে বলল, “অসাধারণ। এই না হলে জীবন!”
তথাগত বলল, “কী অসাধারণ?”
বুবকা বলল, “ঝাল ঝাল মুরগির গলা আর কচকচির ঝাল খেয়েছিস কোনও দিন দাদা বস্তির ঘরে? সঙ্গে বাংলা? কী বালের জীবন কাটাস বল তো?”
তথাগত ফোনটা কেটে দিল।
বুবকা বলল, “ভাই পিকলু, বাঁড়া আর কিছুতে নেশা হত না, এবার কিছু না খেলেও নেশা হয়ে যাবে। ঢাল ঢাল।”
