ঠোঁট কামড়ে কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভাবল।
তারপর ফোনটা পকেটে রেখে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ট্রান্সফারটা করল না।
৬
।। বাণী মিত্র।।
প্রীতিকাকে বেশ পছন্দ বাণীর। তবে মুখে সেটা বোঝান না।
বনেদি বাড়ির মেয়ে। মুখটাও ভারী মিষ্টি। বাবাইয়ের পছন্দ আছে।
প্রথমে যে গয়নাগুলো কিনবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তার থেকেও বেশ কয়েকটা বেশি কিনে ফেললেন। প্রীতিকা অবাক হয়ে বলেছিল, “এত কিনে কী হবে?”
বাণী প্রীতিকার দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, “একদম চুপ থাকবি। কোনও কথা বলবি না।”
প্রীতিকা বলল, “আন্টি, আমি এমনিতেই গয়না পরি না, তুমি তো আমাকে সিরিয়ালের বউ বানিয়ে দিচ্ছ।”
বাণী বললেন, “সবই থাকবে রে মা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরবি। বড়োরা যখন কিছু দেয় তখন মানা করতে নেই।”
প্রীতিকা আর কিছু বলল না। বাণী নিজের জন্যও একটা নেকলেস নিলেন। বহুদিন গয়না কেনা হয় না। অথচ একটা সময় ছিল যখন রীতিমতো টাকা জমিয়ে গয়না কিনতেন।
টাকা হাতে এল যখন, তখন আর গয়না কেনার সময় হল না। প্রোডাকশন হাউস, অফিস, স্টুডিও আর বাড়ি যাতায়াতটাই জীবন হয়ে গেল।
মন দিয়ে নেকলেস দেখছিলেন, এমন সময় শুনতে পেলেন, “আরে ম্যাডাম, কী খবর?”
বাণী মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। দীপ্ত, সঙ্গের মেয়েটাকে চিনলেন না।
বললেন, “ওহ, তুমি? কেমন আছ?”
দীপ্ত বলল, “কেমন থাকতে পারি বলুন আমরা?”
বাণী হাসলেন, “ঠিকই। তবে তুমি নিশ্চয়ই ভালো আছ। এই উইকের টপ টিআরপি পেয়েছ।”
দীপ্ত পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, “সবই এঁর কৃপা ম্যাডাম।”
মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বাণী বললেন, “ওকে তো ঠিক চিনলাম না?”
দীপ্ত ভীষণ সুপুরুষ। ছ ফুট লম্বা। সানগ্লাসটাকে নিয়ে খেলা করতে করতে বলল, “ও হল আমার ব্যানার্জি বাড়ির ছেলের দ্বিতীয় বউ।”
বাণী মেয়েটির দিকে তাকালেন। কপালে সিঁদুর। মুখটার মধ্যে একটা আলগা লজ্জা মিশে আছে। একটা কানাঘুষো শুনছিলেন বটে দীপ্তর ব্যাপারে সম্প্রতি, এই তাহলে সেই?
মেয়েটিকে বললেন, “তোমার নাম কী?”
মেয়েটা বলল, “অলকানন্দা মুখার্জি।”
বাণী হাসলেন, “মন দিয়ে কাজ করো। এই ইন্ডাস্ট্রিতে সুস্থ থাকাটা সবথেকে দরকার। সেটা মাথায় রেখো।”
অলকা মাথা নাড়ল। দীপ্ত বলল, “ও খুব হার্ডওয়ার্কিং। ইচ্ছা আছে আর-একটা সিরিয়ালে ওকে লিডে নেবার। লেটস সি। উনি কে ম্যাডাম? ওঁকে কি ইন্ট্রোডিউস করছেন নতুন কোনও সিরিয়ালে?”
প্রীতিকা চুপ করে তাদের কথা শুনছিল। দীপের কথা শুনে হেসে ফেলল। বাণীও হাসলেন, বললেন, “উনি আমার ফ্যামিলিতে ইন্ট্রোডিউসড হচ্ছেন। আমার বড়ো ছেলের উড বি।”
দীপ্ত হো হো করে হাসল। বলল, “সরি সরি ম্যাম। আচ্ছা আমার একটা অভিযোগ আছে।”
বাণী বললেন, “কী ব্যাপারে বলো তো?”
দীপ্ত বলল, “বুবকার মতো একজন এত ট্যালেন্টেড ছেলে হারিয়ে যাচ্ছে। এটা জাস্ট মেনে নিতে পারি না।”
বাণী গম্ভীর হলেন, “আমি আর ওর ব্যাপারে কী বলব?”
দীপ্ত বলল, “অ্যাকচুয়ালি আমার একটা ইচ্ছা ছিল। একটা সিনেমার কথা ভাবছিলাম। বুবকার কথা ভেবেওছিলাম, ওকে তো ফোনেই পাওয়া যায় না আজকাল।”
বাণী বললেন, “তুমি যে ভেবেছ এটাই অনেক। ওকে এক্সপেক্ট করে কিছু কোরো না। আমার আর ওর ওপর কোনও এক্সপেক্টেশন নেই।”
৭
।। বুবকা।।
“তুমি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলে না?”
বৈভবী রান্না করছিল। বুবকা রান্নাঘরে একটা চেয়ারে বসে শশায় কামড় দিতে দিতে বৈভবীকে জিজ্ঞেস করল।
বৈভবী বলল, “হ্যাঁ, ডেবিউতেই।”
বুবকা বলল, “মার সঙ্গে তোমার আসল বাওয়ালটা কী নিয়ে হয়েছিল?”
বৈভবী বলল, “সেসব তুমি জেনে কী করবে?”
বুবকা বলল, “বলো না, শুনতে ভালো লাগে। জ্ঞান বাড়ে।”
বৈভবী বলল, “ফার্স্টের মেগাটা সুপার হিট হবার পর তোমার মার সেকেন্ড সিরিয়াল। লিড ছিলাম আমি। টানা শিফটে কাজ করিয়ে যেতেন। একদিন শরীর খারাপ হল। আমাকে বলে দিলেন আমি নাকি মিথ্যা কথা বলছি। আমি এত রেগে গেছিলাম আর শ্যুটিং-এই যাইনি। তারপর তোমার মা-ই যা দায়িত্ব নেওয়ার নিয়ে নিলেন আমার, কেরিয়রটা শেষ করে দিলেন।”
বুবকা বলল, “বাল শেষ করল।”
বৈভবী বলল, “সকাল সকাল খিস্তি দিতে ভালো লাগে তোমার?”
বুবকার শশা খাওয়া হয়ে গেছিল। সেটা ফেলে বলল, “খিস্তি তো দিতেই হবে। মানুষের শরীর খারাপ হবে না?”
বৈভবী বলল, “তোমার মায়েরও কিছু করার ছিল না বুবকা। মরিয়া হয়ে গেছিলেন তিনি। আমি শুধু ওই মিথ্যেবাদী তকমাটা সহ্য করতে পারিনি। মিথ্যে কথাটা আমার ধাতে নেই। টানা আঠেরো ঘণ্টা কাজ করার পর শরীর খারাপ হতেই পারে এটা ওঁর বোঝা উচিত ছিল।”
বুবকা বলল, “তুমি মার হয়ে কথা বলছ কেন?”
বৈভবী বলল, “বাস্তবটা বলছি।”
বুবকা বলল, “দীপ্ত রায়ের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করোনি কেন?”
বৈভবী বলল, “আমি লোকের পায়ে গিয়ে পড়তে পারি না বলে। তেল মারাটা আমার ধাতে নেই বলে।”
বুবকা বলল, “দীপ্ত রায় তোমাকে অফার দিলে যাবে?”
বৈভবী বুবকার দিকে তাকাল। বলল, “যাব। কেন যাব না?”
বুবকা বলল, “আমার দাদাটাও একটা শুয়োরের বাচ্চা জানো তো?”
বৈভবী বলল, “হঠাৎ এই কথা?”
বুবকা বলল, “মালটাকে বললাম টাকা নেই, কিছু টাকা পাঠা। ঠিক পাঠাল না। ওদিকে একটা গুড বয় গুড বয় ইমেজ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
বৈভবী বলল, “তোমারও তো ওই ইমেজটাই রাখা উচিত ছিল। বখে গেলে মাঝপথে। আমার পাল্লায় পড়ে।”
বুবকা উঠে বৈভবীকে জড়িয়ে ধরল, “তোমাকে নিয়ে আমি জাহান্নামেও চলে যাব। তাতে যে যা খুশি বলুক কিচ্ছু যায় আসে না।”
বৈভবী ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “রান্না করার সময় এসব করতে নেই। যাও, দূরে গিয়ে বসো।”
বুবকা আবার চেয়ারটায় গিয়ে বসল। তারপর বলল, “আজ ভাবলাম তোমাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাই।”
বৈভবী বলল, “আমি হয়তো দুপুরে একবার বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
বুবকা বলল, “কী করতে?”
বৈভবী বলল, “অনেকদিন দেখা হয় না। ভদ্রলোক একা একা কী করছে কে জানে।”
বুবকা বলল, “নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখতে পারো না?”
বৈভবী বলল, “নাহ, বাবা বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। তা ছাড়া তুমি কী করবে তখন?”
বুবকা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “তাও ঠিক। আমি কী করব? তুমি আমার কথা ভাবো? সত্যি?”
বৈভবী হেসে বলল, “না, ভাবি না তো। কোনদিন দাদার মতো একটা লক্ষী মেয়েকে বিয়ে করে সংসারী হবে। আমি জানি তো।”
বুবকা বলল, “ধুস। কী যে বলো!”
বৈভবী বলল, “অভিনয়টা ছেড়ো না বুবকা। ভুল করছ।”
বুবকা বলল, “অত খাটনি পোষায় না বিশ্বাস করো। মেগার ওই বালের ইলাস্টিকের মতো টেনে নিয়ে যাওয়া গল্পের জন্য খাটতে পোষায় না আমার। ওরা ওইসব বালছাল নিজেরা বানাক, নিজেরাই দেখুক। কারা দ্যাখে এসব? একটা লোকের গাদা গাদা বউ। সে গল্পের না আছে কোনও মাথা না আছে কোনও মুন্ডু! মানুষকে টুপি পরিয়ে যাচ্ছে বাণী মিত্র দীপ্ত রায়রা আর মানুষ সে টুপি পরছে।”
বৈভবী বলল, “শুধু একদিক দেখলে হবে বুবকাবাবু? অন্যদিক দেখবে না? কত লোকের পেটের ভাত আসছে এটা থেকে সেটা দেখবে না? ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তো ধুঁকছে। রিমেক করে করে কমার্শিয়াল ইন্ডাস্ট্রিটা খিল্লি হয়ে গেছে। টিভি সিরিয়াল যে একা হাতে ইন্ডাস্ট্রিটা ধরে রেখেছে সেটা দেখবে না?”
বুবকা বলল, “ফাক সিরিয়াল, ফাক ইন্ডাস্ট্রি। বিশ্বাস করো, মেগাতে আমি কোনও চ্যালেঞ্জই খুঁজে পেতাম না। মা ওই একই গল্প চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক সিরিয়ালে। গ্রামের মেয়ে, শহরের ছেলে, গ্রামের মেয়েকে শহরে নিয়ে এল, একটা ফ্যামিলি এস্টাব্লিশ করল। ফ্যামিলির লোক কাঠি করল, আর মেয়েটা সেই কাঠি সামলে লড়াই করে যাচ্ছে। এই হল গল্পের স্ট্রাকচার। এবার এটাকেই উলটে পালটে যেটাকে চালানো হচ্ছে, সেটা আর যাই হোক কোনও আর্টের মধ্যে পড়ে না।”
বৈভবী হাসল, বলল, “বুঝবে না। মানুষের পেট চালাতে আর্ট দরকার নেই। খাবার দরকার।”
বুবকা বলল, “আমার বুঝতে হবেও না। আমি আর ওয়েট করতে পারব না। যা রান্না হয়েছে দাও, গাড়িটা রেখে যাচ্ছি। বাসে বাড়ি যাব আজ। তারপর দাদার কীভাবে মারতে হয় সেটা দেখছি।”
